বোরহান উদ্দিন
১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০৪ পিএম
- ছাত্রত্ব নাকি ত্যাগ, দোটানায় হাইকমান্ড
- বিদায়ী সাক্ষাতের পরও দুই মাস পার, গুরুত্ব হারাচ্ছেন শীর্ষ নেতারা
- সেশনজট ও বয়সের জটিল সমীকরণ
- বাছাই হচ্ছে আমলনামা, শিগগিরই সুখবরের অপেক্ষা
‘ছাত্রদলের নতুন কমিটি চূড়ান্ত, যেকোনো সময় ঘোষণা হতে পারে’—গত কয়েক মাস ধরে বিএনপি ও ছাত্রদলের রাজনীতিতে এই আলোচনা ঘুরপাক খেলেও শেষ পর্যন্ত থমকে আছে নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি। পদপ্রত্যাশী ও সংগঠনের নেতাকর্মীরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করলেও নীতিনির্ধারকদের হিসাব-নিকাশেই আটকে আছে নতুন নেতৃত্ব।
জানা গেছে, সংগঠনের শীর্ষ পদে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব দেওয়া হবে, নাকি বিগত দিনের রাজপথের লড়াকু ও ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করা হবে—নীতিনির্ধারকদের এই দ্বিমুখী ভাবনায় ঝুলছে কমিটি। তবে দায়িত্বশীল নেতাদের দাবি, রাজপথের অভিজ্ঞতা ও তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষার একটি ভারসাম্যপূর্ণ মেলবন্ধন ঘটিয়ে খুব দ্রুতই নতুন কমিটি প্রকাশ্যে আনা হবে। অবশ্য চূড়ান্ত সবকিছুই নির্ভর করছে বিএনপির চেয়ারম্যান ও ছাত্রদলের সাংগঠনিক অভিভাবক তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের ওপর।
এদিকে ছাত্রদলের বিদায়ী শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি সাবেক ছাত্রনেতারা বলছেন, কমিটি ঘোষণায় বিলম্ব হওয়ায় সংগঠন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ছে। বিশেষ করে গত ১৪ আগস্ট সংগঠনের ‘সুপার ফাইভ’ নেতারা বিএনপি চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে বিদায়ের বার্তা দেন। সেই সাক্ষাতের দুই মাস পার হয়ে গেলেও নতুন কমিটি না হওয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা গুঞ্জন ছড়াচ্ছে। এমনকি বিদায়ী শীর্ষ নেতাদের গুরুত্বও কর্মীদের কাছে কিছুটা কমে গেছে বলে খোদ দলের নেতাকর্মীরা স্বীকার করছেন।
>> আরও পড়ুন
ছাত্রদলের সাবেক এক শীর্ষ নেতা ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘কমিটি দিতে কেন বিলম্ব হচ্ছে-এই প্রশ্ন তো আমাদেরও! যত দিন যাচ্ছে, সংগঠনের ক্ষতি হচ্ছে। বিদায়ী সাক্ষাতের পর বিদায়ী নেতারাও কর্মীদের কাছে কার্যকারিতা হারাচ্ছেন। বিষয়টি হাইকমান্ডের গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা উচিত।’
মেয়াদ উত্তীর্ণ ও নেতৃত্বের সেশনজট
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির নির্ধারিত দুই বছরের মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ৭ মাস আগে। কেবল কেন্দ্রীয় কমিটিই নয়, সংগঠনের ক্ষমতার মূল কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জেলা ইউনিটগুলোর মেয়াদও উত্তীর্ণ।
বর্তমানে নতুন নেতৃত্বের দৌড়ে এগিয়ে থাকা পদপ্রত্যাশীদের শিক্ষাবর্ষ ও বয়স বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সিংহভাগের শিক্ষাবর্ষ ২০০৮, ২০০৯, ২০১০ কিংবা ২০১১। অর্থাৎ তাদের বড় অংশেরই প্রাতিষ্ঠানিক ছাত্রত্ব শেষ হয়েছে অন্তত এক দশক আগে। বর্তমানে তাদের গড় বয়স ৩৫ বছরের কাছাকাছি।
পদপ্রত্যাশী নেতাদের ভাষ্য, বিগত সরকারের সময়ে হামলা, মামলা, জেল-জুলুম ও রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় থাকায় তারা স্বাভাবিক সময়ে পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি। তবে সংগঠনের রাজনীতিতে টিকে থাকতে এবং ছাত্রত্বের তকমা ধরে রাখতে তাদের অনেককেই সান্ধ্যকালীন কোর্স, পেশাগত ডিপ্লোমা কিংবা এমফিলে যুক্ত থাকতে হয়েছে। এই দীর্ঘমেয়াদী সেশনজট ও বয়সের সমীকরণই এখন নতুন কমিটি গঠনে প্রধান জটিলতা তৈরি করেছে।
বিদায়ী সাক্ষাতেরও দুইমাস পার রাকিব-নাছির কমিটির
ছাত্রজনতার জুলাই অভ্যুত্থানের আগে, ২০২৪ সালের ১ মার্চ রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে সভাপতি এবং নাছির উদ্দীন নাছিরকে সাধারণ সম্পাদক মনোনীত করে আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। এর সাড় তিন মাস পর, ১৫ জুন ২৬০ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটি অনুমোদন দেয় দল।
বর্তমান কমিটির মেয়াদকালেই চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্রদল রাজপথে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয় এবং শেখ হাসিনার পতন আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে ক্ষমতা পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে বিভিন্ন স্থানে নেতিবাচক খবরের কারণেও আলোচনা-সমালোচনায় আসে সংগঠনটি।
নিয়ম অনুযায়ী ২০২৬ সালের ১ মার্চ দুই বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ১৪ আগস্ট শীর্ষ পাঁচ নেতা বিএনপি চেয়ারম্যানের সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ করেন। ওই বৈঠকে তারা নতুন নেতৃত্বের জন্য গোপন ব্যালটে পছন্দের তালিকাও জমা দিয়ে আসেন। এরপর থেকেই নতুন কমিটির প্রহর গুনছেন নেতাকর্মীরা।

হাইকমান্ডের নতুন সমীকরণ ও জেন-জি নেতৃত্ব
বিএনপির নীতিনির্ধারণী সূত্র জানায়, ছাত্রদলে নিয়মতান্ত্রিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চান সংগঠনের প্রধান অভিভাবক তারেক রহমান। নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন রক্ত সঞ্চালন করাই তার লক্ষ্য।
বিশেষ করে, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা ও ছাত্ররাজনীতিতে আসা পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আস্থা ফেরাতে উদীয়মান তরুণ ও ‘জেন-জি’ প্রজন্মের মনস্তত্ত্ব বোঝে-এমন মেধাবী ও নিয়মিত ছাত্রদের হাতে নেতৃত্ব তুলে দেওয়ার পক্ষে তিনি। তবে দলের একাংশের যুক্তি, এত বড় একটি জাতীয় সংগঠনের হাল ধরতে কেবল ছাত্রত্বই যথেষ্ট নয়; রাজপথের দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের অভিজ্ঞতা ও পরিপক্বতাও সমান জরুরি। আর এই দুই পক্ষের দাবির সমন্বয় ঘটাতে গিয়েই সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগছে।

চলছে নিখুঁত আমলনামা যাচাই
বিলম্বের অন্যতম প্রধান কারণ পদপ্রত্যাশীদের অতীত আমলনামা নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখা। কেন্দ্রীয় পদে আসার দৌড়ে থাকা নেতাদের অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা, ছাত্রত্বের স্বচ্ছতা, অন্য কোনো ছাত্রসংগঠন বা বিতর্কিত গোষ্ঠীর সঙ্গে অতীতে বা বর্তমানে কোনো সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না-সবই অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
জানা গেছে, দলীয় প্রধানের নির্দেশে এই প্রক্রিয়া সমন্বয় করছেন বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল, দলের বিশেষ সম্পাদক বেলায়েত হোসেন মৃধা এবং গবেষণা কর্মকর্তা আব্দুস সাত্তার পাটোয়ারী। পাশাপাশি একাধিক নিরপেক্ষ সংস্থার মাধ্যমেও তাদের সাম্প্রতিক কার্যক্রমের খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও ডাকসুর সাবেক জিএস খায়রুল কবির খোকন ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘নতুন কমিটি গঠনের কাজ চূড়ান্ত প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। দলের অভিভাবক সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছেন, যেকোনো দিন নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা হতে পারে।’
শুরু হয়েছে সাংগঠনিক স্থবিরতা, অপেক্ষায় দিন কাটছে নেতাকর্মীদের
নেতৃত্ব নির্বাচনে বিলম্বের কারণে মাঠপর্যায়ে সংগঠন পরিচালনায় মন্থর গতি তৈরি হয়েছে। বিদায়ী নেতৃত্ব দিয়ে চলায় বিভিন্ন ক্যাম্পাস ও বড় ইউনিটগুলোতে মাঝেমধ্যেই শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনা ঘটছে, যা সমাধান করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।
ছাত্রদলের শীর্ষ পদে পদপ্রত্যাশী একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘দলের সুসময়ে নতুন নেতৃত্ব বাছাই করতে এত লম্বা সময় কেন লাগছে-তার উত্তর আসলে কারও জানা নেই। কারা মাঠে ছিল, কারা জেল-জুলুমের শিকার হয়েছে, কার সাংগঠনিক দক্ষতা কেমন-হাইকমান্ড তো সবই জানে। আমরা চাই নতুন কমিটি আসুক। দল যেন অবশ্যই যোগ্যদের হাতে নেতৃত্ব তুলে দেয়।’
ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির ঢাকা মেইলকে বলেন, ছাত্রদলের কমিটি কোথাও আটকে নেই। যাচাই-বাছাই করে কমিটি দিতে যৌক্তিক যে সময় প্রয়োজন সেই সময়ের মধ্যেই আশা করছি কমিটি ঘোষণা হবে।
তিনি বলেন, নতুন কমিটির ক্ষেত্রে সাংগঠনিক দক্ষতা, আন্দোলন সংগ্রামে ত্যাগ, নেতৃত্ব দেওয়ার কোয়ালিটি আছে সেটা দেখা খুবই জরুরি। দায়িত্বশীলরা সেসব দেখে আশা করি শিগগিরই নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করবেন।
বিইউ/এএস