Dhaka Mail Logo

রাজনীতি

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হলে ডিসেম্বরে হরতালের হুঁশিয়ারি জেডিপির

নিজস্ব প্রতিবেদক

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৫৯ পিএম

গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে আগামী ডিসেম্বরে জুলাই সনদের পক্ষে থাকা সব রাজনৈতিক দল ও ভোটারদের সঙ্গে নিয়ে হরতালের ডাক দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জাস্টিস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি পার্টির (জেডিপি) আহ্বায়ক নাঈম আহমাদ।

একই সঙ্গে চলমান হাম ও ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ব্যর্থ হলে এসব রোগে নিহত শিশুদের লাশ নিয়ে অভিভাবকেরা রাস্তায় নেমে আসতে পারেন বলেও সতর্ক করেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) বিকেলে জাতীয় জাদুঘরের সামনে ‘জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষার আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থতা, জনবিরোধী আইন প্রণয়ন ও জনদুর্ভোগের বিরুদ্ধে’ শীর্ষক প্রতিবাদ সভায় এসব কথা বলেন তিনি

স্বাস্থ্যখাতের সংকট তুলে ধরে নাঈম আহমাদ বলেন, ‘সম্প্রতি সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেই জানিয়েছেন, দেশে সরকারি হাসপাতালে ১১ হাজার ৪৯৫টি পদ শূন্য পড়ে আছে। কিন্তু তারা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে মাত্র ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের। ফলে বোঝা যায়, সরকার ইচ্ছা করেই সরকারি চিকিৎসাখাতকে অপ্রতুল করে রাখতে চায়।’

জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর চিকিৎসক সংকটের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘বাগেরহাট ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালে ৫৯টি অনুমোদিত চিকিৎসক পদের মধ্যে কর্মরত মাত্র ২৬ জন। পিরোজপুর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে ৬২টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ১৮ জন। অর্থাৎ শহরের তুলনায় গ্রামের চিকিৎসাব্যবস্থা আরও ভয়াবহ। এছাড়া পর্যাপ্ত নার্স ও অন্যান্য কর্মচারী জেলা পর্যায়ে অনেক কম। সরকার যদি জেলা পর্যায়ের হাসপাতালেই পর্যাপ্ত চিকিৎসক দিতে না পারে, তাহলে জনগণ চিকিৎসার জন্য কোথায় যাবে?’

ভারতে চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশিদের যাওয়ার পরিসংখ্যান তুলে ধরে নাঈম আহমাদ বলেন, ‘২০২০ সালে ভারতে চিকিৎসার জন্য গিয়েছিলেন ৯৯ হাজারের কিছু বেশি বাংলাদেশি। ২০২৩ সালে সেই সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখে পৌঁছায়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় চিকিৎসা ভিসার জটিলতা তৈরি হওয়ায় ভারতে চিকিৎসা নিতে যাওয়া মানুষের সংখ্যা কমে আসলেও এখন আবার বাড়তে শুরু করেছে। অর্থাৎ, আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা শুধু একটি হাসপাতালের সমস্যা নয়; এটি বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে চলে যাওয়ারও কারণ। স্বাস্থ্যখাতে সংকট বহাল রেখে বেসরকারি ও ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের হাতে মুনাফা তুলে দেওয়ার এই সরকারি ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করতে দেওয়া যাবে না।’

হাম ও ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জেডিপির আহ্বায়ক। তিনি বলেন, ‘হাম আক্রান্ত হয়ে প্রায় এক লাখ ৪৬ হাজার মানুষ হাসপাতালে ভর্তি এবং ৯৯৯ জনের মৃত্যুর যে তথ্য সামনে এসেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। একই সময়ে ডেঙ্গুতে ৬৭ হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি এবং ২০১ জনের মৃত্যুর তথ্যও সামনে এসেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘হাম ও ডেঙ্গুতে শিশুরা মারা যেতে থাকলে একদিন অভিভাবকেরা সন্তানদের লাশ নিয়ে রাস্তায় নেমে আসতে বাধ্য হতে পারেন। সরকারকে সেই পরিস্থিতির জন্য অপেক্ষা না করে এখনই স্বাস্থ্যখাতের জরুরি সংস্কার করতে হবে।’

স্বাস্থ্য অবকাঠামোর ঘাটতি তুলে ধরে নাঈম আহমাদ বলেন, ‘৬ বছর আগে মহামারি মোকাবিলায় ৬ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। এর আওতায় ১৬টি পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট এবং ৫০টি জেলা হাসপাতালে আইসিইউ সক্ষমতা তৈরির কথা ছিল। এই প্রকল্পের বড় অংশের অর্থায়নে ছিল বিশ্বব্যাংক। দুর্নীতির কারণে তারা অর্থায়ন বন্ধ রেখেছে। কিন্তু বর্তমান সরকার উক্ত প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের বিনিয়োগ ফিরিয়ে আনা বা অনুরূপ প্রকল্প হাতে নিচ্ছে না। ফলে নাগরিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আগের চেয়েও বেড়ে চলছে।’

গণভোট বাস্তবায়ন নাগরিক ফোরামের আহ্বায়ক ফাহিম মাশরুর বলেন, ‘আমরা জাতীয় নির্বাচনে দুটো ভোট দিয়েছিলাম। একটি সংসদের জন্য, অন্যটি সংবিধান সংস্কারের গণভোট। প্রায় ৭০ শতাংশ জনগণ গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে রায় দিয়েছে। যে জনগণের ভোটে বিএনপি সংসদে গিয়ে সরকার গঠন করল, সেই জনগণের গণরায়কেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অসাংবিধানিক বলছেন। অথচ সংবিধানে স্পষ্ট বলা আছে, জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস। বিএনপির এমন আচরণই প্রকাশ্যে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা।’

সাইবার সুরক্ষা আইন প্রসঙ্গে ডিএসএ ভিক্টিমস নেটওয়ার্কের আহ্বায়ক গোলাম মাহফুজ জোয়ার্দার বলেন, ‘বাংলাদেশের সংসদ ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে সাইবার সুরক্ষা আইন পাস করে, যার উদ্দেশ্য ছিল বহুল সমালোচিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮-এর বিতর্কিত উত্তরাধিকার থেকে বেরিয়ে আসা। কিন্তু আইনটি পাসের কয়েক মাসের মধ্যে সরকার সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর প্রস্তাব উত্থাপন করেছে, যা কার্যত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সবচেয়ে দমনমূলক বিধানগুলোকে নতুন নামে ফিরিয়ে আনছে।’

তিনি বলেন, ‘প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলোর মধ্যে রয়েছে মানহানি, অপমান, বুলিং, গুজব ও অপতথ্য সংক্রান্ত নতুন অপরাধ, কনটেন্ট ব্লকিং ক্ষমতার সম্প্রসারণ, মোবাইল কোর্টের এখতিয়ার বৃদ্ধি এবং জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিল থেকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রতিনিধিত্ব বাদ দেওয়া।’

গোলাম মাহফুজ জোয়ার্দার আরও বলেন, ‘প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো যদি আইনে পরিণত হয়, তাহলে ডিএসএ এবং তার পূর্বসূরি আইনের অধীনে ঐতিহাসিকভাবে যেভাবে রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, পেশাজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল, তারাই নিপীড়নের শিকার হবে।’

তিনি প্রস্তাবিত সংশোধনী প্রত্যাহার এবং নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যমকর্মী, আইন বিশেষজ্ঞ, প্রযুক্তিবিদসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে পরামর্শ প্রক্রিয়া শুরু করার দাবি জানান।

মিরাজ শেখের নিখোঁজের ঘটনা প্রসঙ্গে জেডিপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আব্দুল আলিম বলেন, ‘গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ বাতিল করে আরও শক্তিশালী আইন পাসের ওয়াদা করে বিএনপি সরকার যে কালা-কানুন পাস করতে যাচ্ছে, তা জনগণের সঙ্গে প্রতারণা ছাড়া কিছু নয়।’

তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে’ যে কাউকে হেফাজতে নিয়ে জবাবদিহিতার আওতার বাইরে থাকার যে বিধান এই আইনে রাখা হচ্ছে, তা সুস্পষ্ট সংবিধান লঙ্ঘন।’ এ ধরনের আইন প্রণয়ন থেকে সরকারকে বিরত থাকার আহ্বান জানান তিনি।

সভায় জুলাই গণহত্যার বিচার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, সার ও জ্বালানি সংকটের সমাধান, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা, ক্যাম্পাসে সন্ত্রাসের অবসান, বন-হাওর-নদী ও জলাশয় রক্ষা, জ্বালানি ও গণপরিবহন সংকটের সমাধান এবং জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর দাবি জানান বক্তারা।

জেডিপির যুগ্ম সদস্য সচিব মাহতাব হোসেন সাব্বিরের সঞ্চালনায় প্রতিবাদ সভায় আরও বক্তব্য দেন জেডিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব নুরা জেরিন, যুগ্ম সদস্য সচিব আরিফুল হক চৌধুরী ও ইয়াসিন আরাফাত রাজ, বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের নদী, পরিবেশ, জলবায়ু ও দুর্যোগ বিষয়ক সম্পাদক ইবনুল সাঈদ রানা, জাতীয় ছাত্রমঞ্চের প্রধান সংগঠক সালমান শরীফ এবং সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব আফিফা আরনাজ এলমু প্রমুখ।

এমআর/এএম