Dhaka Mail Logo

রাজনীতি

জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে ‘প্রাইস শক’ নয়, সমন্বয়ের দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:১৯ পিএম

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে আমদানি, পরিবহন ও জ্বালানি ব্যয় বেড়েছে। এর প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে জ্বালানি তেলের দাম একবারে না বাড়িয়ে ধাপে ধাপে ও ভারসাম্যপূর্ণভাবে সমন্বয়ের দাবি জানিয়েছে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)। দলটির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারের প্রয়োজন প্রাইস শক নয়, প্রাইস অ্যাডজাস্টমেন্ট।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বিজয়নগরে এবি পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি: জনস্বার্থ ও অর্থনীতির ওপর প্রভাব শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, কৃষি, সেচ, গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনে ডিজেলের ব্যবহার বেশি। ফলে ডিজেলের দাম বাড়ার প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, কৃষক, শ্রমিক, পরিবহন খাত ও সাধারণ ভোক্তার ওপরও এর প্রভাব পড়বে। আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতা সরকারকে মোকাবিলা করতে হবে। তবে সেই চাপ একবারে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।

তিনি বলেন, ডিজেলের দাম বাড়লে সেচ পাম্প, পাওয়ার টিলার, হারভেস্টারসহ বিভিন্ন কৃষিযন্ত্র পরিচালনার ব্যয় বাড়বে। এর ফলে কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ও বাড়তে পারে। সামনে বোরো মৌসুম হওয়ায় বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। মূল্যস্ফীতির মধ্যে জ্বালানির দাম বাড়ায় মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে।

মঞ্জু আরও বলেন, জ্বালানির দাম বাড়লে বাস ও পণ্যবাহী যানবাহনের পরিচালন ব্যয় বাড়ে। পরে সেই ব্যয়ের প্রভাব পরিবহন থেকে পাইকারি ও খুচরা বাজারে গিয়ে পড়ে। ফলে শুধু প্রতি লিটার জ্বালানির দাম কত টাকা বেড়েছে, তা দিয়ে এর প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রভাব বোঝা যাবে না। জ্বালানির দাম বাড়ার পর পরিবহন ব্যয় বাড়ে, এরপর পণ্যের দামও বাড়ে।

সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে মূল বক্তব্য দেন দলটির ছায়া সরকারবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার আব্বাস ইসলাম খান নোমান। তিনি বলেন, সরকারের হিসাবে মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে বেশি দামে জ্বালানি কিনে কম দামে বিক্রি করায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) প্রায় ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি বিপিসির ওপর ভর্তুকির চাপও বেড়েছে।

আব্বাস ইসলাম খান নোমান বলেন, বিপিসির লোকসানের চাপ বাস্তব হলেও আন্তর্জাতিক বাজারদর, পরিবহন ব্যয়, বিমা, বিনিময় হার, কর, আমদানি ব্যয়, সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যয়সহ বিপিসির প্রকৃত ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব জনগণের সামনে প্রকাশ করা প্রয়োজন। সংকটকালীন সময়ে আমদানি শুল্ক ও কর সাময়িকভাবে সমন্বয়, বিপিসির দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অপচয় ও জ্বালানি চুরি বন্ধের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

আব্বাস ইসলাম খান নোমান বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কৃষি উৎপাদন, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য রেখে জ্বালানি নীতি গ্রহণ করতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতা মেনেও জনগণের ওপর এককালীন বড় মূল্যবৃদ্ধির চাপ এড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এবি পার্টির পক্ষ থেকে কৃষি, সেচ, গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত ডিজেলের জন্য পৃথক মূল্যনীতি গ্রহণের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে একবারে বড় মূল্যবৃদ্ধির পরিবর্তে ধাপে ধাপে মূল্য সমন্বয়, আন্তর্জাতিক বাজার, পরিবহন ব্যয়, বিনিময় হার, আমদানি ব্যয় ও করের ভিত্তিতে স্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা চালু এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে তার সুফল ভোক্তাদের দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

সম্প্রতি সরকার ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে। এতে ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা থেকে ১৫৫ টাকা, পেট্রল ১৪০ টাকা থেকে ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ টাকা থেকে ১৬৫ টাকা হয়েছে। নতুন দাম ২১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে।

দলটি সংকটকালীন সময়ে আমদানি শুল্ক ও কর সাময়িকভাবে সমন্বয়, প্রকৃত কৃষক ও কৃষিযন্ত্রের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক ডিজেল সহায়তা এবং জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির সুযোগে অযৌক্তিক পরিবহন ভাড়া বাড়ানো ঠেকাতে কার্যকর ভাড়া সমন্বয় ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছে।

এ ছাড়া বিপিসির আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ, ক্রয়, পদ্ধতিগত অপচয় ও জ্বালানি চুরির বিষয়ে স্বাধীন পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষা, সীমান্তপথে জ্বালানি পাচার বন্ধে ডিজিটাল নজরদারি, সংকট মোকাবিলায় কৌশলগত জ্বালানি জরুরি তহবিল এবং নিম্নআয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা চালুর দাবি জানানো হয়।

দলটির পক্ষ থেকে দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জ্বালানি দক্ষতায় বিনিয়োগ বাড়ানোরও আহ্বান জানানো হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার যোবায়ের আহমেদ ভূঁইয়া, অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল মামুন রানা, মো. আলতাফ হোসাইন, শাহাদাতুল্লাহ টুটুল, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক আব্দুল হালিম খোকন, ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক সেলিম খানসহ কেন্দ্রীয় ও মহানগরের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

এএইচ/এআর