Dhaka Mail Logo

রাজনীতি

সংসদে রুমিন ফারহানার দেওয়া তথ্য বিভ্রান্তিকর: বাংলাফ্যাক্ট

নিজস্ব প্রতিবেদক

১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:০০ পিএম

জাতীয় সংসদে সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা নতুন করে একাধিক বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছেন বলে শনাক্ত করেছে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) ফ্যাক্ট চেক ও মিডিয়া রিসার্চ টিম বাংলাফ্যাক্ট।

বাংলাফ্যাক্ট এও বলছে, তিনি আগেও সংসদে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছেন।

পিআইবির ফ্যাক্ট চেক টিমটি জানায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে জাতীয় সংসদে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা দাবি করেছেন, ‘বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল।’ অথচ ২০০১ সালে দুর্নীতির র‌্যাংকিং তৈরি হয়েছিল আগের ৩ বছরের তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে, পরে ক্রমাগত বাংলাদেশের স্কোর উন্নত হয়। এছাড়া আওয়ামী আমলের ঋণখেলাপির দায় বর্তমান সরকারকে দিয়েছেন তিনি। এর আগেও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কারখানা বন্ধের তথ্যকে তিনি বর্তমান সময়কার বলে অভিহিত করেছিলেন।

সংসদে বক্তব্য দিতে গিয়ে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘প্রত্যেকটা সরকারের একটা চরিত্র থাকে। বিএনপি ক্ষমতায় আসবে আর গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট হবে না, এটা হতে পারে না। বিএনপি ক্ষমতায় আসবে আর সারের সংকট হবে না, গরিব কৃষক সার লুট করবেন না, সেটাও হতে পারে না। বিএনপি ক্ষমতায় আসবে আর দুর্নীতিতে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হবে না, সেটাও হওয়া সম্ভব না। বিএনপি ক্ষমতায় আসবে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো ঋণ খেলাপিতে সর্বোচ্চ স্থান অর্জন করবে না, সেটাও হতে পারে না। সুতরাং বিএনপি ক্ষমতায় আসা মানে ঋণ খেলাপিতে সর্বোচ্চ হওয়া।’

রুমিন ফারহানার বক্তব্যে দুটি প্রধান বিভ্রান্তিকর তথ্য চিহ্নিত

১. ২০০১ সালে ‘দুর্নীতিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন’ খেতাবের আসল প্রেক্ষাপট: বার্লিনভিত্তিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই)-এর ‘করাপশন পারসেপশন ইনডেক্স’ (সিপিআই) বা দুর্নীতি ধারণা সূচক অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর বাংলাদেশ তালিকার সর্বনিম্নে (সর্বাধিক দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ) অবস্থান করেছিল। রাজনৈতিকভাবে এটিকে প্রায়শই ২০০১-২০০৬ সালের বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের দায় হিসেবে প্রচার করা হয়।

তবে টিআই-এর সূচক তৈরির পদ্ধতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০০১ সালে বাংলাদেশ যখন প্রথমবার তালিকার তলানিতে স্থান পায়, তখন সেই সূচকটি তৈরি করা হয়েছিল পূর্ববর্তী ৩ বছরের (১৯৯৮-২০০০) দুর্নীতির তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে। এই সময়জুড়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। ফলে ২০০১ সালের প্রথম বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পেছনে মূল দায়ে ছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনকাল।

২০০১ সালের অক্টোবরে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশের স্কোর ছিল ০.৪। স্কোর যত কম, দুর্নীতি তত বেশি বোঝায়। পরে সরকারের নেওয়া নানামুখী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ফলে ২০০৫ সালে স্কোর বেড়ে ১.৭ এবং পরবর্তীতে ২.০-এ উন্নীত হয়। অর্থাৎ, বিএনপি সরকারের আমলে দুর্নীতির হার ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে। এমনকি দুর্নীতি দমনে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি মজবুত করতে বিএনপি সরকারের আমলেই ২০০৪ সালে স্বাধীন ‘দুর্নীতি দমন কমিশন’ (দুদক) গঠন করা হয়।

আরও পড়ুন: রুমিন ফারহানার বক্তব্যে উত্তপ্ত সংসদ

২. খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র আড়াল: রুমিন ফারহানা দাবি করেন যে বিএনপি ক্ষমতায় আসা মানেই ঋণ খেলাপিতে সর্বোচ্চ হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে ব্যাংকিং খাতের যে সংকট ও উচ্চ খেলাপি ঋণের চিত্র দেখা যাচ্ছে, তার উৎস বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘদিনের নীতিগত অব্যবস্থাপনা।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বারবার বিশেষ নীতিগত ছাড়, পুনঃ তফসিল এবং হিসাবগত কারসাজির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ মন্দ ও বেনামি ঋণকে কৃত্রিমভাবে ‘নিয়মিত ঋণ’ হিসেবে দেখানো হতো।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর নতুন প্রেক্ষাপটে ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান পর্যালোচনা এবং দেশি-বিদেশি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গভীর নিরীক্ষা চালানো হয়। এর ফলে এতদিন আড়ালে থাকা জালিয়াতি, নীতিগত ছাড়ের মাধ্যমে গোপন রাখা খেলাপি ঋণ ও অনিয়মের প্রকৃত চিত্র উন্মোচিত হয়। এটি কোনো নতুন সরকারের তৈরি খেলাপি নয়, বরং দীর্ঘদিনের জমানো অনিয়মের পর্দা উন্মোচন। এটি নিয়ে বাংলাফ্যাক্টের বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়েছিল।

আগেও সংসদে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেন রুমিন ফারহানা

সংসদে রুমিন ফারহানার বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম নয় বলে জানিয়েছে বাংলাফ্যাক্ট।

প্রতিষ্ঠানটি জানায়, ইতোপূর্বেও সংসদে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়েছেন রুমিন ফারহানা। তখন তিনি দাবি করেছিলেন যে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার প্রথম ছয় মাসের মধ্যে দেশে ৬২ হাজার মানুষ চাকরি হারিয়েছেন এবং ৯ শতাধিক কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।

তবে বাংলাফ্যাক্টের পূর্ববর্তী অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই তথ্যটিও সঠিক ছিল না। কারখানা বন্ধ ও চাকরি হারানোর এই ঘটনাগুলো অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের সময়ের ছিল এবং সেসময় বন্ধ হওয়া কারখানার প্রকৃত সংখ্যা ছিল ৯৫টি, ৯ শতাধিক নয়।

আরও পড়ুন: ‘রুমিন ফারহানা আপার মধ্যে শেখ হাসিনার ছায়া দেখা যায়’ 

ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে দেশ ও প্রবাস থেকে পরিচালিত বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট এবং কিছু ফেসবুক পেজ থেকে বাংলাদেশকে ঘিরে নানা ভুয়া তথ্য ছড়ানোর প্রবণতা বেড়েছে। পাশাপাশি সাম্প্রতিক নানা বিষয়ে বিএনপি ও বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে গুজব মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টা শনাক্ত করা হচ্ছে।

‘বাংলাফ্যাক্ট’ প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ পিআইবি’র ফ্যাক্টচেক, মিডিয়া রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস টিম, যারা নিয়মিত ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য যাচাই করে সত্য তুলে ধরে এবং গণমাধ্যম ও সংবাদ নিয়ে গবেষণা করে।

ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া শত শত ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে বাংলাদেশের ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠান বাংলাফ্যাক্ট। বাংলাদেশে চলমান গুজব এবং ভুয়া খবর, অপতথ্য প্রতিরোধ এবং জনগণের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়ায় দায়িত্ব পালন করছে বাংলাফ্যাক্ট।

এএম