নিজস্ব প্রতিবেদক
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৪১ পিএম
গণতন্ত্রকে বিকশিত ও শক্তিশালী করতে এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করতে স্বাধীন গণমাধ্যমের কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। তিনি বলেন, গণমাধ্যমকে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার না করে সত্যনিষ্ঠ ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের জায়গা ধরে রাখতে হবে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) ৩১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন রিজভী।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, ডিআরইউর সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। বিশেষ করে ফ্যাসিবাদী শাসনামলে বিরোধী মত প্রকাশের সুযোগ যখন ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছিল, তখন ডিআরইউকে অনেক সময় আশ্রয়ের জায়গা হিসেবে দেখেছেন তারা।
এই সময় ডিআরইউর সাংবাদিকদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কও তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি। বলেন, সাংবাদিকরা তাদের সঙ্গে দিনরাত কাজ করেছেন এবং বিএনপির বক্তব্য ও কার্যক্রম সংবাদে তুলে ধরেছেন। তবে ব্যক্তিগত সম্পর্ক কখনোই সাংবাদিকদের সংবাদ পরিবেশনের নিরপেক্ষতাকে বিঘ্নিত করেনি।
রিজভী বলেন, দেশে এমন সময়ও গেছে, যখন গণতন্ত্রের ন্যূনতম মূল্যবোধগুলোও রক্ষা করা হয়নি। অতীতের মতো গত ১৭ বছরেও সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়া ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা স্তব্ধ করার নতুন সংস্করণ দেখা গেছে। অনেক সংবাদপত্র ও টেলিভিশন থাকলেও স্বাধীনভাবে কথা বলার সুযোগ সীমিত ছিল।
তিনি অভিযোগ করেন, সরকারের বাইরে কথা বলার চেষ্টা করায় অনেকে গুমের শিকার হয়েছেন, কেউ কারাগারে গেছেন। টেলিভিশন, টকশো এবং বিভিন্ন মাধ্যমে সামাজিক মাধ্যমও নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।
জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের কয়েক মাস আগেও গণমাধ্যমের পরিস্থিতি এমন ছিল যে, সরকারের সমালোচনা করা বা ভিন্নমত প্রকাশ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল বলে মন্তব্য করেন বিএনপির এই নেতা। তার ভাষ্য, হত্যা, খুন ও গুমের মতো ঘটনাও অনেক সময় সংবাদে পাওয়া যেত না; বরং সরকারের বয়ান তৈরি করে তা প্রচার করা হতো।
এ প্রসঙ্গে একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানের উদাহরণ তুলে ধরেন রিজভী। বলেন, এক কৃষিবিজ্ঞানী গবেষণায় একটি নির্দিষ্ট জাতের বড় আকারের বেগুনে ক্যানসারের কিছু উপাদান থাকার বিষয়টি পেয়েছিলেন। মানুষকে সতর্ক করার জন্য গবেষণার ফল তুলে ধরলেও তাকে টকশোতে ডেকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তিনি সরকারবিরোধী কোনো এজেন্ডার সঙ্গে যুক্ত কি না এবং তার বিরুদ্ধে তদন্ত বা মামলা হওয়া উচিত কি না। অথচ ওই ব্যক্তি কোনো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না বলে দাবি করেন রিজভী।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতার মূল দায়িত্ব হলো যাচাই-বাছাই করে সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আইনের শাসন নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও আদালত যেমন নিরপেক্ষভাবে কাজ করে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় গণমাধ্যমকেও একইভাবে নিরপেক্ষ থাকতে হয়। অপপ্রচার বা কারও বিরুদ্ধে কলঙ্ক লেপন গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং গণতন্ত্রের প্রাণশক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
সামাজিক মাধ্যমের বিস্তার নতুন সুযোগের পাশাপাশি নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে বলে মন্তব্য করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব। বলেন, প্রচলিত গণমাধ্যমে চিফ রিপোর্টার, নিউজ এডিটর ও সম্পাদক একটি সংবাদ যাচাই-বাছাই করে প্রকাশ করেন। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে এমন সম্পাদকীয় কাঠামো নেই। ফলে একজন শিক্ষিত তরুণ যেমন এটি ব্যবহার করতে পারেন, তেমনি একজন বখাটে বা সন্ত্রাসীও একই মাধ্যম ব্যবহার করতে পারেন। এ পরিস্থিতিতে সত্যনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল তথ্য নিশ্চিত করার উপায় নিয়ে সাংবাদিকদেরই ভাবতে হবে। পরে নীতিনির্ধারকরাও এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারেন।

রিজভী বলেন, কে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন, কার ছেলে বা মেয়ের সঙ্গে কার সম্পর্ক; এ ধরনের বিষয় সবসময় সংবাদ নয়। সংবাদ হলো এমন কিছু, যা ব্যতিক্রম বা জনস্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত। সাংবাদিকদের বুঝতে হবে কোনটি সংবাদ এবং কোনটি কুৎসা বা অপপ্রচার।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, গণমাধ্যমকে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার না করে সত্যনিষ্ঠ ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের জায়গা ধরে রাখতে হবে। গণমাধ্যম বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করলে সমাজে সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও অনিয়ম কমবে এবং সমাজ আরও পরিচ্ছন্ন হবে।
ডিআরইউর ৩১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সংগঠনটির সব সাংবাদিককে শুভেচ্ছা জানিয়ে রিজভী বলেন, সাংবাদিকতা একটি ঝুঁকিপূর্ণ পেশা। সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক সাংবাদিক আহত হয়েছেন, কেউ শারীরিকভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, আবার কেউ প্রাণও হারিয়েছেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা এই মহৎ পেশাকে আরও মর্যাদাপূর্ণ করতে হবে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েই দেশের গণতন্ত্রের পথচলা আরও শক্তিশালী হবে, এটাই প্রত্যাশা।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর কার্যকরী পরিষদের সদস্য এহসান মাহবুব জুবায়ের ডিআরইউর ৩১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সংগঠনের সংশ্লিষ্ট সবাইকে শুভেচ্ছা জানান। তিনি বলেন, সাংবাদিকতার অঙ্গনে বিশেষ করে রাজধানীতে ডিআরইউ একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন বাধা ও প্রতিবন্ধকতা থাকলেও সংগঠনটি কোনো দিকে না ঝুঁকে পেশাদারিত্বের দৃষ্টান্ত রাখার চেষ্টা করেছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে এ ধরনের পেশাদার ও দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন। জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে ডিআরইউ যে দায়িত্ব পালন করছে, তারা তার সঙ্গে আছেন এবং ভবিষ্যতেও পাশে থাকবেন।
ফ্যাসিবাদ বাংলাদেশে যে ক্ষতি ও ধ্বংস করেছে, তাতে দেশের প্রায় সব ক্ষেত্রই বিপর্যস্ত হয়েছে মন্তব্য করে এহসান মাহবুব জুবায়ের বলেন, সবাই মিলে বাংলাদেশকে একটি আধুনিক, প্রগতিশীল, শান্তিপূর্ণ ও মানবিক দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চান তারা। এ ক্ষেত্রে ডিআরইউর নেতৃত্ব ও সদস্যদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
ডিআরইউর ৩১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দিনভর বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত সংগঠনটি দেশের পেশাদার সাংবাদিকদের অন্যতম বৃহৎ সংগঠন হিসেবে সাংবাদিকদের পেশাগত উন্নয়ন, কল্যাণ, অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় ভূমিকা রেখে আসছে।
এমএইচ/এমআর