জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৪১ পিএম
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী বাছাই নিয়ে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যে পাল্টাপাল্টি অবস্থান পরিষ্কার হচ্ছে। জামায়াতের ঘোষিত প্রার্থীদের মোকাবিলায় নিজেদের শক্তিশালী প্রার্থী দিতে রাজধানীর দুই সিটিতে প্রার্থী বদলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এনসিপি। এরই মধ্যে দলটির দুই হেভিওয়েট নেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে যথাক্রমে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির মেয়র প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের আমির ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি সেলিম উদ্দিন। দক্ষিণে দলটির প্রার্থী ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক আন্তর্জাতিক সম্পাদক ও ডাকসুর সাবেক ভিপি সাদিক কায়েম।
এনসিপির নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মেয়র প্রার্থী হচ্ছেন দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। আর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে প্রার্থী হচ্ছেন দলের মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। খুব শিগগির সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এ সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হতে পারে।
এনসিপির এ সিদ্ধান্তে রাজধানীর দুই সিটিতে দলটির আগের ঘোষিত প্রার্থীদের পরিবর্তন ঘটছে। গত ২৯ মার্চ স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির জরুরি সংবাদ সম্মেলনে পাঁচ সিটিতে মেয়র প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেছিল এনসিপি। তখন ঢাকা দক্ষিণে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং ঢাকা উত্তরে দলটির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীবের প্রার্থী হওয়ার কথা জানানো হয়েছিল।
তবে পরে দলের রাজনৈতিক পরিষদের বৈঠকে প্রার্থী পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ওই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আসিফ মাহমুদকে উত্তর সিটিতে এবং নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে দক্ষিণ সিটিতে প্রার্থী করার বিষয়টি প্রায় চূড়ান্ত করা হয়েছে।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সমঝোতা না হওয়ায় ঢাকার দুই সিটিতে আলাদা কৌশলে এগোচ্ছে এনসিপি। জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিবেচনায় রেখে এমন প্রার্থী বাছাই করা হয়েছে, যারা রাজধানীতে দলটির ভোট ও জনসমর্থনকে কাজে লাগিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এগিয়ে থাকতে পারবেন।
এনসিপির রাজনৈতিক পরিষদের একাধিক সদস্যের ভাষ্য, তৃণমূলের তুলনায় শহরাঞ্চলে দলটির সাংগঠনিক ও জনসমর্থন তুলনামূলক বেশি। রাজধানী ঢাকায় এ সমর্থন আরও বেশি বলে মনে করছে দলটি। এ কারণে জামায়াতের প্রার্থীদের বিপরীতে ঢাকার দুই সিটিতে পরিচিত ও প্রভাবশালী নেতাদের মাঠে নামানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রার্থী বদলের সিদ্ধান্তের সঙ্গে ভোটার এলাকা পরিবর্তনের বিষয়টিও সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার আগে আসিফ মাহমুদ ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ভোটার এলাকা পরিবর্তন করা হয়েছে। আসিফ মাহমুদ ঢাকা দক্ষিণ থেকে ঢাকা উত্তরের আফতাবনগর এলাকার ভোটার হয়েছেন। অন্যদিকে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী উত্তরা এলাকা থেকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের শাহবাগ এলাকার ভোটার হয়েছেন।
গত সোমবার এনসিপির গণমাধ্যমবিষয়ক উপকমিটি দুই নেতার ভোটার এলাকা পরিবর্তনের বিষয়টি নিশ্চিত করে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২১ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার। এর আগে তিনি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের উত্তরা এলাকার ভোটার ছিলেন।
এনসিপি জানিয়েছে, নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত ফরম-১৩ অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দুই নেতার ভোটার এলাকা স্থানান্তরের আবেদন করা হয়েছিল। যাচাই-বাছাই ও দাপ্তরিক নথিপত্র পরীক্ষা শেষে নির্বাচন কমিশন আবেদন অনুমোদন করেছে।
এদিকে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনেও এনসিপির ঘোষিত মেয়র প্রার্থী জাতীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক তারিকুল ইসলাম ভোটার এলাকা পরিবর্তন করেছেন। কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলা থেকে স্থানান্তর হয়ে তিনি কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার হয়েছেন। কুমিল্লা সিটি নির্বাচনে তারিকুল ইসলামই এনসিপির মেয়র প্রার্থী থাকছেন বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে ভোটার এলাকার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। আইন অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা বা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলে সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটার তালিকায় প্রার্থীর নাম অন্তর্ভুক্ত থাকতে হয়। অন্য এলাকার ভোটার হলে নির্ধারিত নিয়ম ও ফরম অনুসরণ করে নির্বাচন কমিশনে আবেদন করে ভোটার এলাকা স্থানান্তর করতে হয়।
জামায়াত-এনসিপির এই পাল্টাপাল্টি প্রার্থী বাছাইয়ের ফলে ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে ভোটের সমীকরণও ভিন্ন হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকা দক্ষিণে জামায়াতের সাদিক কায়েম ও এনসিপির নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী একই ধরনের ভোটারের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে ভোট ভাগাভাগির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। একইভাবে ঢাকা উত্তরে জামায়াতের সেলিম উদ্দিন ও এনসিপির আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতায়ও ভোট বিভাজনের প্রভাব পড়তে পারে।
তাদের মতে, দুই সিটিতে জামায়াত ও এনসিপির আলাদা প্রার্থী থাকলে বিরোধী ভোট বিভক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। আর সেই পরিস্থিতিতে সরকারি দলের প্রার্থী তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে চলে যেতে পারেন। ফলে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন শুধু প্রার্থী বাছাইয়ের লড়াই নয়, বরং জোট ও সমঝোতার রাজনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে।
টিএই/এএম