জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
২৯ আগস্ট ২০২৬, ১১:৩৮ পিএম
গুমের শিকার ব্যক্তিদের দ্রুত উদ্ধার করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া এবং এ ধরনের অপরাধে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে শনিবার (২৯ আগস্ট) দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি এ দাবি জানান।
বিবৃতিতে জামায়াত আমির বলেন, ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। এ দিনে গুমের শিকার নিরপরাধ ব্যক্তিদের স্মরণ করার পাশাপাশি তাঁদের শোকার্ত ও প্রতীক্ষারত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান তিনি। বছরের পর বছর প্রিয়জনের সন্ধান না পেয়ে অসংখ্য পরিবার মানসিক ট্রমা ও মানবিক সংকটের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বাংলাদেশের প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিভিন্ন দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থার তথ্যানুযায়ী, শেখ হাসিনার শাসনামলে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সাত শতাধিক মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন। বিরোধী মত ও কণ্ঠরোধের উদ্দেশ্যে ‘আয়নাঘর’-এর মতো গোপন বন্দিশালা তৈরি করে সেখানে বছরের পর বছর নিরীহ মানুষের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
দীর্ঘ আট বছর গুম থাকার পর সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহিল আমান আযমী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার আরমান আহমদ বিন কাসেম ফিরে এলেও জামায়াত নেতা হাফেজ জাকির হোসাইন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিবির নেতা আল মোকাদ্দাস ও মোহাম্মদ ওলিউল্লাহ, বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী এবং সাবেক কমিশনার চৌধুরী আলমসহ বহু নিখোঁজ ব্যক্তি এখনো ফিরে আসেননি বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করেন তিনি।
গুম প্রতিরোধ ও গুমের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির বিষয়ে সরকারের প্রণীত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর প্রসঙ্গও তুলে ধরেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের পর নবগঠিত সরকার অধ্যাদেশটিকে আইনে পরিণত করতে অস্বীকৃতি জানায়। পরবর্তীতে কিছু পরিবর্তন এনে নতুন খসড়া বিল প্রণয়ন করা হলেও এতে আইনটির মূল উদ্দেশ্যই অকার্যকর করে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
নতুন খসড়া বিলে গুমের অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের ক্ষমতা পুলিশকে দেওয়ার সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গুম একটি বিশেষ ধরনের অপরাধ এবং এর জন্য বিশেষ আইনি ব্যবস্থা প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্তভার আবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতেই দেওয়া অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত।
এ ছাড়া গুম সংক্রান্ত তথ্যভাণ্ডার সরকারের অধীনে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, অনেক ক্ষেত্রে গুমের ঘটনার সঙ্গে ক্ষমতাসীন সরকারই সম্পৃক্ত থাকে। ফলে সরকারের অধীনে তথ্যভাণ্ডার কতটা নিরপেক্ষভাবে সংরক্ষিত হবে এবং জনগণের সামনে গুমের সঠিক তথ্য প্রকাশ পাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে গুম সংক্রান্ত তদন্ত ও অনুসন্ধান থেকে বাদ দেওয়ারও সমালোচনা করেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, গুমের মতো সংবেদনশীল বিষয়ের সুষ্ঠু তদন্ত ও যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার দায়িত্ব একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ মানবাধিকার সংস্থার হাতে থাকা উচিত।
বিবৃতির শেষাংশে তিনি গুম ও নিখোঁজ হওয়া সব নাগরিককে দ্রুত অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। একই সঙ্গে গুমের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ব্যক্তি ও ‘মাস্টারমাইন্ডদের’ বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান।
তিনি আরও বলেন, জনগণের মৌলিক অধিকার, আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার ও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুমকে একটি বিশেষ অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে এ ধরনের অপরাধের সঠিক অনুসন্ধান, সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত বিচারের জন্য একটি বিশেষ ও স্বাধীন আইনি কাঠামো গঠনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
টিএই/এএম