জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
১৫ আগস্ট ২০২৬, ১১:৩৮ পিএম
প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলকে বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানের পরিকল্পনা দেওয়ার জন্য ছয় মাসের আলটিমেটাম দিয়ে চ্যালেঞ্জ করেছেন— জবাবে সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে বিরোধী দলের প্রস্তাব তুলে ধরেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শীর্ষ নেতা ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ।
শনিবার (১৫ আগস্ট) রাতে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী চ্যালেঞ্জ দেওয়ার আগেই জানা দরকার ছিল যে বিদ্যুৎ সংকট সমাধানের পরিকল্পনা ইতোমধ্যে দেওয়া হয়েছে। এনসিপির আহ্বায়ক, সংসদ সদস্য ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি মেয়াদে মোট ১৫ দফা সুনির্দিষ্ট সমাধান প্রস্তাব দিয়েছেন।
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘অন্যদিকে আমি ধাপে ধাপে দেখিয়েছি কোন সিদ্ধান্তটি কোথায় ভুল হয়েছে। ভর্তুকি নীতি, ফুয়েল প্ল্যান, কন্টিনজেন্সি প্ল্যান এবং ডিজাস্টার রিকভারি প্ল্যান নিয়ে সুস্পষ্ট সমাধানধর্মী বক্তব্য রেখেছেন বিরোধীদলীয় সদস্যরা। মতামত এসেছে নাগরিক সমাজ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকেও। এসব ছাপা হয়েছে জাতীয় দৈনিকে, আলোচিত হয়েছে সেমিনারে।’
প্রধানমন্ত্রীর বড় মন্ত্রিসভা ও উপদেষ্টা পরিষদ থাকা সত্ত্বেও এসব তথ্য তাঁর কাছে না পৌঁছানোকে ‘লজ্জার কথা’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পোস্টে হাসনাত বলেন, ‘মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারী মিলিয়ে সরকারের ৬২ জন সভাসদ রয়েছেন। তাঁদের একজনও নাগরিক মতামত বা বিরোধী দলের প্রস্তাবনা পড়ে দেখেননি। গণতান্ত্রিক চর্চায় এর চেয়ে খারাপ উদাহরণ কম আছে।’
এনসিপির দেওয়া ৩০ দিনের জন্য পাঁচটি, মধ্যমেয়াদে ছয় থেকে ১৮ মাসের জন্য ছয়টি এবং দীর্ঘমেয়াদে চারটি সমাধান প্রস্তাব পড়ে দেখার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে আলোচনা করতে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বিশেষ সংসদীয় অধিবেশন ডাকার অনুরোধেও সাড়া দেওয়ার আহ্বান জানান।
সরকারের ‘ইগ্নোরেন্স’ বা উপেক্ষার সমালোচনা করে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ‘বিশালাকার টিমের সক্ষমতা, যোগ্যতা ও আন্তরিকতা’ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
প্রশাসনে ব্যাপক দলীয় পদায়নের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ছয় মাসে যে হারে দলীয় পদায়ন হয়েছে, তাতে ‘ইনস্টিটিউশনাল মেমরি’ বলে কিছু অবশিষ্ট নেই। এর ফলে ফুয়েল প্ল্যান, কন্টিনজেন্সি প্ল্যান ও ডিজাস্টার রিকভারি প্ল্যান নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
হাসনাতের অভিযোগ, ভর্তুকি কমানো হয়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা থেকে, অথচ ক্যাপাসিটি চার্জ অক্ষত রয়েছে। তার ভাষ্য, সচিবালয়ে নতুন ও অনভিজ্ঞ ব্যক্তিরা এসেছেন এবং তারা ‘লবি গ্রুপের’ পরামর্শে চলছেন।
মহেশখালী এফএসআরইউতে আগুন লাগার পর রক্ষণাবেক্ষণে কোনো ত্রুটি ছিল কি না, সেই স্বাধীন তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ না করারও সমালোচনা করেন তিনি। নাশকতা নাকি অবহেলা— সরকার নিজেই তা জানে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট সমাধানে মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসি ২০২৫ বাস্তবায়নের দাবি জানান এনসিপির এই নেতা। তিনি বলেন, সরকার ডলার ও বকেয়ার কারণে বিদ্যুৎ-জ্বালানি কেনা যাচ্ছে না বলে জানাচ্ছে এবং দেশের অধিকাংশ ভারী শিল্প বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে বন্ধ হয়ে পড়েছিল।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অনুমোদিত মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসি ২০২৫ এখনো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না কেন।’
হাসনাতের ভাষ্য, এই কাঠামোর আওতায় বেসরকারি উৎপাদক সরাসরি বড় শিল্প ভোক্তার কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারে। দুই পক্ষ বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করবে, বিইআরসি শুধু অবহিত থাকবে এবং উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে দেওয়া যাবে। এতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন হবে না। বাকি কাজ হিসেবে শুধু এসএলএ ফরম্যাট ও হুইলিং চার্জ চূড়ান্ত করা প্রয়োজন, যা কয়েক সপ্তাহের প্রশাসনিক কাজ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর চ্যালেঞ্জের জবাবে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি বলার আগেই আমরা সমাধান দিয়েছি। আপনারা সেটা পড়ার দরকার মনে করেননি কিংবা আপনার কাছে পৌঁছানো হয়নি। তথাপি, ছয় মাসের হিসাবটা আমরা মেনে নিলাম। কিন্তু ঘড়িটা বিরোধী দলের নয়, আপনার সরকারের।’
মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসি বাস্তবায়নে ছয় মাসের বেশি সময় লাগলে সেটি নীতির প্রশ্ন না থেকে সরকারের সক্ষমতার ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ‘প্রমাণিতভাবে ব্যর্থ মন্ত্রী ও অযোগ্য লোক দিয়ে কৌশলগত খাতে পরীক্ষা-নিরীক্ষাকে “আই হ্যাভ এ প্ল্যান” বলে না। এটা হচ্ছে “আই হ্যাভ নো প্ল্যান”-এর টেস্টিং।’
একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলকে আলটিমেটাম বা চ্যালেঞ্জ না দিয়ে সরকারেরই জবাবদিহি করা উচিত বলে মন্তব্য করেন হাসনাত আবদুল্লাহ।
তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘সরকার ছয় মাস ক্ষমতায়, আর দেশ এখন ইতিহাসের সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ে কেন পড়লো! এই রাষ্ট্র কেন অন্ধকারে নিমজ্জিত হলো?’
পোস্টের শেষাংশে তিনি বলেন, ‘সমাধান আমাদের হাতে আছে। কিন্তু ক্ষমতা আপনার হাতে। ছয় মাস পর জনগণ জানতে চাইবে, দুটোর মধ্যে কোনটির অভাবে দেশ অন্ধকারে ছিল।’
টিএই/এএম