Dhaka Mail Logo

রাজনীতি

‘সবুজ সংকেত’ পেলেই ছাত্রদলের নতুন কমিটি

বোরহান উদ্দিন

১৪ আগস্ট ২০২৬, ০১:০১ পিএম

* বিদায়ী সাক্ষাতে নির্দেশনা, ব্যালটে মতামত নিলেন তারেক রহমান
* বিদায়ী বার্তা ছাত্রদল সভাপতির
* কঠিন সময়ে রাকিব-নাছিরের নেতৃত্বে যুদ্ধজয়
* শীর্ষ পদের দৌড়ে একঝাঁক ছাত্রনেতা

জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন নিয়ে রাজনীতি ও ছাত্ররাজনীতিতে ব্যাপক গুঞ্জন ও কৌতুহল সৃষ্টি হয়েছে।  যে কোনো মুহূর্তে বা শিগগিরই আসতে পারে কাঙ্ক্ষিত এই নতুন কমিটির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। সংগঠনের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারক ও শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে ইতিমধ্যেই নতুন কমিটির খসড়া ও সার্বিক রূপরেখা পৌঁছেছে। 

শীর্ষ পর্যায় থেকে ‘সবুজ সংকেত’ পেলেই নতুন নেতৃত্বের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে বলে দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে। ইতিমধ্যে বর্তমান কমিটির সুপার ফাইভ নেতা দলীয় প্রধানের সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাতও করেছেন।

বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাতে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে বিদায়ী নেতাদের সঙ্গে এক জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেন ছাত্রদলের বিদায়ী কমিটির শীর্ষ পাঁচ নেতা— সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব, সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির, সিনিয়র সহসভাপতি আবু আফসান মো. ইয়াহিয়া, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শ্যামল মালুম এবং সাংগঠনিক সম্পাদক আমান উল্লাহ আমান।

বৈঠকে বিদায়ী নেতাদের বিগত আন্দোলন-সংগ্রামের ত্যাগের ভূয়সী প্রশংসা করে নিয়ম অনুযায়ী নতুন প্রজন্মের হাতে নেতৃত্ব হস্তান্তরের সুস্পষ্ট বার্তা দেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

দলীয় প্রধান জানিয়ে দেন, নিয়ম অনুযায়ী বর্তমান কমিটির সময়সীমা ও প্রয়োজনীয়তা পূর্ণ হয়েছে; এখন মূল দলের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার এবং নতুনদের সুযোগ করে দেওয়ার সময় এসেছে।

বিদায়ী কমিটিকে দিলেন নির্দেশনা, মতামত নিলেন ব্যালটে 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা ঢাকা মেইলকে জানান, সাক্ষাৎকালে বিগত বৈষম্যবিরোধী ও সরকারবিরোধী আন্দোলনে সংগঠনটির অবদান এবং ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে পেশাদারিত্ব বজায় রাখার তাগিদ দেন বিএনপির চেয়ারম্যান।

দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির ভ্যানগার্ড হিসেবে বিবেচিত ছাত্রদল রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে তৎকালীন সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক সংস্কার ও গতিশীলতা আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বৈঠকে অংশ নেওয়া ছাত্রদলের শীর্ষ নেতাদের উদ্দেশে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাদের ত্যাগের ভূয়সী প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে সংগঠনের গতিশীলতা ধরে রাখতে নতুন প্রজন্মের হাতে নেতৃত্ব হস্তান্তরের নির্দেশ দেন।

তিনি বলেছেন, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনে তোমরা অসামান্য আন্দোলন ও সংগ্রাম করেছ। রাজপথের এই লড়াই ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তবে নিয়ম অনুযায়ী এখন ছাত্রদলে তোমাদের প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়েছে-এখন সময় এসেছে নতুনদের সুযোগ করে দেওয়ার এবং মূল দলের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার।

এদিকে বৈঠকের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক ছিল, ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্বাচনের স্বার্থে শীর্ষ নেতৃত্ব সেখানে উপস্থিত নেতাদের কাছ থেকে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে মতামত ও দলীয় মূল্যায়ন গ্রহণ করেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নেতা ঢাকা মেইলকে বলেন, চেয়ারম্যান আমাদের কাছে নতুন নেতৃত্বের পছন্দের তালিকা চেয়েছেন। গোপন ব্যালটে আমরা তা উনাকে জানিয়েছি। তিনি তা গ্রহণ করেছেন। এগুলোসহ সবকিছু যাচাই-বাছাই করে যে কোনো মুহূর্তে তিনি ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষণা করতে পারেন।

বিদায়ী সাক্ষাতের কথা তুলে ধরতে গিয়ে আরেকজন নেতা বলেন, দলীয় চেয়ারম্যান আমাদের হাসিমুখে বিদায় দিয়েছেন। আমাদের মধ্যে কোনো মান-অভিমান নেই। এত সুন্দর বিদায় এর আগে কোনো কমিটির হয়েছে কি না জানা নেই।

image_113815_1724222127

বিদায়ী বার্তা দিলেন ছাত্রদল সভাপতি

সাক্ষাৎ শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় বিদায়ের ইঙ্গিত দিয়েছেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব।

পোস্টে তিনি লিখেছেন, নিয়ম অনুযায়ী ছাত্রদলে আমাদের প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়েছে—এখন সময় এসেছে নতুনদের সুযোগ করে দেওয়ার এবং মূল দলের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার।

তার এই মন্তব্যে সংগঠনটির বর্তমান অধ্যায়ের সমাপ্তি ও নতুন কমিটি আসার বার্তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

রাকিব ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, অত্যন্ত সম্মান ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে জীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটতে চলেছে।

ছাত্রদলের নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ দেওয়ায় দলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে রাকিব দায়িত্ব পালনের সময়ে নিজের ভুলত্রুটির কথাও স্বীকার করেছেন। একইসঙ্গে ছাত্রদলের আসন্ন নতুন কমিটিকে সবাই সাদরে গ্রহণ করবেন বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।

March-For-democrachy-(20)-678bd3489f10e

কঠিন সময়ে রাকিব-নাছিরের যুদ্ধজয়

শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে ছাত্রদলের দায়িত্ব পান রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও নাছির উদ্দীন নাছির। পুরো মেয়াদেই কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাদের। শেষ পর্যন্ত হাসিনাবিরোধী জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দেন ছাত্রদলের শীর্ষ নেতারা। ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতন হয়। যাতে অগ্রভাগ ছিল ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ মার্চ তৎকালীন আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটির দায়িত্ব পান রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও নাছির উদ্দীন নাছির। পরে একই বছরের ১৫ জুন ২৬০ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়।

ছাত্রদলের খসড়া গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ দুই বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই হিসাবে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি বিদায়ী কমিটির স্বাভাবিক মেয়াদ পূর্ণ হয়। মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর থেকেই নতুন নেতৃত্বের আগমন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর তৎপরতা শুরু হয়।

rakib_nasir

বিদায়ী এই কমিটির মেয়াদে ছাত্রদলের ইতিহাসে রেকর্ডসংখ্যক সাংগঠনিক ইউনিটে নতুন কমিটি প্রদান করা হয়। পাশাপাশি তৎকালীন সরকারবিরোধী আন্দোলন এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজপথের কর্মসূচিতে সংগঠনটির ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।

সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় যারা

নতুন কমিটি গঠনের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পদপ্রত্যাশী নেতাদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে। উচ্চপর্যায়ের দলীয় আলোচনা এবং সংগঠনের মাঠপর্যায়ের হিসাব-নিকাশ অনুযায়ী, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক- এই দুটি শীর্ষ পদের জন্য বেশ কয়েকজন ছাত্রনেতার নাম জোরালোভাবে সামনে এসেছে।

নতুন কমিটির সভাপতি পদের জন্য বিভিন্ন শিক্ষাবর্ষের বেশ কয়েকজন নেতার নাম জোরালোভাবে শোনা যাচ্ছে। 

আলোচনায় রয়েছেন ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের বর্তমান সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শ্যামল মালুম (শিক্ষাবর্ষ: ২০০৭-২০০৮)।

এছাড়াও আলোচনায় রয়েছেন খোরশেদ আলম সোহেল, মঞ্জুরুল আলম রিয়াদ, রিয়াদ রহমান, সাফি ইসলাম এবং এজাজুল কবির রুয়েল (শিক্ষাবর্ষ: ২০০৮-২০০৯)।

সভাপতি পদে জোরালো আলোচনায় রয়েছেন বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক আমান উল্লাহ আমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসান, মোস্তাফিজুর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম আরিফ, ছাত্রদলের প্রচার সম্পাদক শরীফ প্রধান শুভ এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসেন (শিক্ষাবর্ষ: ২০০৯-২০১০)।

জানা গেছে, আমান উল্লাহ আমান শীর্ষ নেতৃত্বের অংশ হলেও রাজপথে ধারাবাহিক উপস্থিতি, আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয়তা এবং তরুণ নেতাকর্মীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতার কারণে তিনি নতুন কমিটিতে সভাপতি পদের অন্যতম শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সুনজরেও আছেন এই ছাত্রনেতা।

অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক পদের দৌড়েও এগিয়ে রয়েছেন একাধিক নেতা। তারা হলেন— ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তারিকুল ইসলাম তারিক, সহসভাপতি আনিসুর রহমান খন্দকার অনিক এবং মাসুম বিল্লাহ (শিক্ষাবর্ষ: ২০১০-২০১১)।

আলোচনায় রয়েছেন বর্তমান কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সালেহ মোহাম্মদ আদনান। আওয়ামী লীগের সময়ে আন্দোলনে মাঠে সক্রিয় থাকা আদনান জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও রাজপথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

এছাড়াও আলোচনায় আছেন ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাজু আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক মিনহাজ আহমেদ প্রিন্স, শামীম আখতার শুভ, গাজী সাদ্দাম হোসেন, ইব্রাহিম খলিল এবং তারেক হাসান মামুন (শিক্ষাবর্ষ: ২০১১-২০১২)।

নতুন কমিটি নিয়ে আমান উল্লাহ আমান ঢাকা মেইলকে বলেন, দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান আমাদের অভিভাবক। তার নির্দেশনায় কাজ করেছি। তিনি তার পছন্দের ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের জন্য সর্বোচ্চ ভালো সিদ্ধান্ত নেবেন—সেটা বিশ্বাস করি। তবে এতটুকু বলতে পারি, অতীতের মতো আগামী দিনেও তার যে কোনো নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে এক পাও পিছু হটবো না।

বিইউ/এআরএম