Dhaka Mail Logo

রাজনীতি

জ্বালানি খাত বেসরকারিকরণে লুটপাটের পাঁয়তারা: এবি পার্টি

নিজস্ব প্রতিবেদক

০৮ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৪৭ পিএম

দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের পেছনে আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি ও বেসরকারিকরণের রাজনৈতিক অর্থনীতি দায়ী বলে মন্তব্য করেছে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)।

দলটির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ অভিযোগ করেছেন, ‘কুইক রেন্টালের মাধ্যমে বিদ্যুৎ খাতে যে উচ্চমূল্যের বেসরকারিকরণ ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছিল, তার আর্থিক বোঝা এখনো জনগণকে বহন করতে হচ্ছে। এর মধ্যেই জ্বালানি খাত বেসরকারিকরণের মাধ্যমে নতুন করে লুটপাটের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।’

শনিবার (৮ আগস্ট) রাজধানীর বিজয়নগরে এবি পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ‘জ্বালানি খাতে অরাজকতা ও ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল বন্ধের দাবি’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

ব্যারিস্টার ফুয়াদ বলেন, ‘বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের মূল সমস্যা কয়লা নয়, বরং আমদানিনির্ভরতা ও বেসরকারিকরণের রাজনৈতিক অর্থনীতি। দেশে আগামী ৫০ থেকে ৬০ বছর ব্যবহারের মতো কয়লা মজুত থাকার পরও পরিবেশের অজুহাতে তা ব্যবহার না করে উচ্চমূল্যের এলএনজি, আমদানিকৃত কয়লা ও তরল জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং জনগণের বিদ্যুৎ বিল বেড়েছে।’

তিনি বলেন, ‘পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে। তবে দেশের নিজস্ব জ্বালানি সম্পদ ব্যবহারের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি পরিত্যাগ করে আমদানিনির্ভর হওয়া আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। বিশ্বের অনেক শিল্পোন্নত দেশ দীর্ঘদিন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ ও শিল্পায়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়ন করেছে।’

এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘দেশের সীমিত প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় অংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা হলেও ইউরিয়া সার উৎপাদন, রপ্তানিমুখী শিল্প, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। তাই গ্যাসকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সার, শিল্প ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির কাজে ব্যবহার করতে হবে।’

কুইক রেন্টালের বোঝা এখনো জনগণের ওপর কুইক রেন্টালের নামে বিদ্যুৎ খাতে যে বেসরকারিকরণ ও উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কেনার ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছিল, তার বোঝা এখনো জনগণকে বহন করতে হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন ফুয়াদ।

তিনি বলেন, ‘উৎপাদন না করেও ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দেওয়ার কারণে রাষ্ট্রকে নিয়মিত আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। একই সঙ্গে এলএনজি বাজার ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিয়ে সরকার যদি মূল্য ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়, তাহলে তা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করবে।’

‘জ্বালানিকে পণ্য হিসেবে নয়, জাতীয় নিরাপত্তা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে এমন কোনো সিদ্ধান্ত সরকার নিতে পারে না। এবি পার্টি বেসরকারিকরণের বিপক্ষে নয়, তবে তা অবশ্যই জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে হতে হবে।’

গ্যাস সরবরাহে নিয়োজিত ছয়টি প্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিলেই ৬৩ হাজার কোটি টাকার বকেয়া বিলের সমস্যার সমাধান হবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ব্যারিস্টার ফুয়াদ।

তিনি বলেন, ‘একটি বেসরকারি কোম্পানিকে দেশের জ্বালানি তেল আমদানি ও সরবরাহের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হলে ভবিষ্যতে সরকার সেই বাজার কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে জ্বালানি খাতে একক বা অতিরিক্ত বাজার নিয়ন্ত্রণ ঠেকাতে কার্যকর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে।’

এবি পার্টি মনে করে, বিদ্যুৎ সংকট এখন শুধু উৎপাদন সক্ষমতার সংকট নয়; এটি জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনীতি, কৃষি, শিল্প, কর্মসংস্থান ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের সংকট।

দলটির পক্ষ থেকে দেশীয় কয়লা ও গ্যাসের পরিবেশসম্মত ও সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সৌর, বায়ু ও জলবিদ্যুতের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর দাবি জানানো হয়। বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ খাতে ১০ থেকে ২০ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়। চা শিল্পসহ বেসরকারি খাতের নিজস্ব বিনিয়োগে বৃহৎ পরিসরে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তাবও বিবেচনার দাবি জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে এবি পার্টির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মেজর (অব.) আবদুল ওয়াহাব মিনার, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলামসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

যেসব দাবি এবি পার্টি-

সংবাদ সম্মেলনে দলটির পক্ষ থেকে কয়েকটি দাবি তুলে ধরা হয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে—

১/ দেশীয় কয়লা ও গ্যাসের পরিবেশসম্মত ও সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করা;

২/ এলএনজি, কয়লা ও তেল আমদানির ওপর অতিনির্ভরতা কমানো;

৩/ উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি ও ক্যাপাসিটি পেমেন্ট পুনর্মূল্যায়ন;

৪/ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সব বড় চুক্তি ও ব্যয়ের স্বাধীন জাতীয় নিরীক্ষা;

৫/সৌর, বায়ু ও জলবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত বিনিয়োগ বাড়ানো;

৬/ সার, শিল্প, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের জন্য গ্যাসকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বরাদ্দ;

৭/ ভুতুড়ে ও অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল বন্ধে স্বাধীন নিরীক্ষা ও কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা;

৮/ বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি আমদানি, বিতরণ ও মিটার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।

এমআর/এএম