জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
০৫ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৪৬ পিএম
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে ইতিহাস বিকৃতি ও আন্দোলনের কৃতিত্ব দলীয়করণের অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করে অনুষ্ঠান বর্জন করেছেন জাতীয় নাগরিক কমিটির (এনসিপি) নেতা আখতার হোসেন। রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতেই দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি অভিযোগ করেন, জুলাই আন্দোলনের মূল অংশীজন ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোকে বাদ দিয়ে ইতিহাসকে নতুন করে একপেশে করার চেষ্টা চলছে।
বুধবার (৫ আগস্ট) জুলাইয়ের শহিদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অনুষ্ঠান বর্জন করেন আখতার হোসেনসহ এনসিপি নেতারা। অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত তথ্যচিত্রে গণঅভ্যুত্থানের মূল ব্যানার ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’, ৯ দফা এবং ৩ আগস্টের ঐতিহাসিক ‘এক দফা’ ঘোষণার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার প্রতিবাদে এনসিপি নেতারা সভাস্থল ত্যাগ করেন।
বক্তব্যের শুরুতেই আখতার হোসেন অনুষ্ঠানটি রাষ্ট্রীয় আয়োজনে সবার অন্তর্ভুক্তির গুরুত্ব তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘এই জুলাই আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের অংশীদার আমরা সকলেই। এটি কোনো দলীয় প্রোগ্রাম নয়, রাষ্ট্রীয় প্রোগ্রাম যা সবাইকে ধারণ করার কথা। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, আমরা আজও ইতিহাসকে সামগ্রিকভাবে ধারণ করতে ব্যর্থ হচ্ছি। যেভাবে অতীতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে একপেশেভাবে দখল করা হয়েছিল, বর্তমানেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, গণঅভ্যুত্থানে দল-মত নির্বিশেষে বিএনপি, জামায়াত, বামপন্থি, সাধারণ শিক্ষার্থী, রিকশাচালক ও প্রবাসীদের অবদান ছিল। ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে সবার অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত।’
অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত ডকুমেন্টারির সমালোচনা করে এনসিপি নেতা বলেন, ‘যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে এই লড়াই গড়ে উঠেছিল, সেই ব্যানারটির নামই আজ বাদ দেওয়া হয়েছে। আন্দোলনের গতিপথ বদলে দেওয়া ‘৯ দফা’ এবং শহীদ মিনারে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত ‘এক দফা’র মতো মূল ঘটনাগুলোকে বিমালুম ভুলে যাওয়া হয়েছে। এটি কোনো অবচেতন মনের ভুল নয়, বরং সচেতনভাবে ইতিহাস বিকৃতি ও দলীয়করণের প্রয়াস।’
যদিও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী ডায়াসে দাঁড়িয়ে এ ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং সংশোধনের আশ্বাস দেন। তবে এমন ভুলকে সাধারণ বিষয় বলে মানতে নারাজ আখতার।
তিনি বলেন, ‘আমরা যারা বয়সী তরুণ, জীবনের সমস্ত ঝুঁকি নিয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধের যে অবদান, সেটাকে আমরা বারংবার বলে গেছি; কারণ এটা ইতিহাসের অংশ। তেমনিভাবে, এই ২৪-এর অভ্যুত্থানে যারা অংশগ্রহণ করেছিলেন তিনি বিএনপির হন, তিনি জামাতের হন, তিনি বামপন্থি হন, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হন, মাদ্রাসার শিক্ষার্থী হন, রিকশাচালক হন, প্রবাসী হন যে সেকশনের মানুষেরাই হন না কেন, আমরা সবসময় তাদের স্মরণে রাখি এবং তাদের কথাটা উচ্চারণ করি। কিন্তু আজকে এখানে একটা ডকুমেন্টারি প্রদর্শিত হলো, আপনারা খেয়াল করে দেখেন, এই আন্দোলনটি যে ব্যানারে সংগঠিত হয়েছিল—'বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন'-সেই ব্যানারটির কথা এখানে উল্লেখ করা হলো না। এই আন্দোলন তো একদিনে সংগঠিত হয় নাই, এটা ছিল কোটা সংস্কারের দাবিতে একটা আন্দোলন। কিন্তু সেই আন্দোলনটার গতিপথ আপনারা যদি খেয়াল করে দেখেন, ৯ দফার মতো একটা ঐতিহাসিক ঘটনা, যেটা আন্দোলনের গতিপথকে ত্বরান্বিত করে দিয়েছিল, সেই ৯ দফা এখানে অনুপস্থিত থেকে গেল। আমরা খেয়াল করে দেখলাম ২৪-এর অভ্যুত্থানের সময়টাতে সব থেকে সাহসের যে ঘটনাটি—আনুষ্ঠানিকভাবে ৩ই আগস্ট শহীদ মিনারে যে এক দফার ঘোষণা দেওয়া হলো—সে বিষয়টাও এখানে বিমালুম ভুলে যাওয়া হলো। এটা আমাদের আহত করে। আমরা চাই এই ইতিহাস বাংলাদেশের প্রত্যেকটা মুক্তিকামী জনতার হবে।
অনুষ্ঠানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক মাহিন সরকারের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অপ্রীতিকর ঘটনার নিন্দা জানিয়ে আখতার হোসেন বলেন, কঠিন সময়ে আন্দোলন সচল রাখা মাহিন সরকার আমন্ত্রিত হয়ে এলেও ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তাকে হলরুম ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। দেশের বিভিন্ন জেলা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সরকারদলীয় নেতা-কর্মীরা এনসিপি ও অন্যান্য সংগঠনের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালিয়েছে এবং স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য করেছে।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে আখতার হোসেন রাষ্ট্রপতিকে শ্রদ্ধা ও ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাই যোদ্ধা হিসেবে মাননীয় রাষ্ট্রপতির প্রতি আমাদের গভীর সম্মান রয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এই প্রোগ্রামে অবস্থান করা আমার ও আমার সহযোদ্ধাদের পক্ষে আর সম্ভব নয়।
বিইউ/এমআই