Dhaka Mail Logo

রাজনীতি

হাসিনা ইস্যুতে ভারতের অবস্থানে পরিবর্তনের আভাস?

বিশেষ প্রতিনিধি

০২ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৩০ পিএম

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুই বছর আগে প্রতিবেশী দেশ ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেন। অন্তর্বর্তী ও বিএনপি দুই সরকারই তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। ইতোমধ্যে তিনি নিজেই ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। শুরু থেকেই দিল্লি এ বিষয়ে প্রকাশ্যে স্পষ্ট কোনো অবস্থান না নিলেও সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধ ‘প্রযোজ্য আইন ও প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি অনুযায়ী পর্যালোচনা করা হচ্ছে’ বলে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে। একই সঙ্গে ভারতে বসে শেখ হাসিনা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে পারবেন না বলে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি দেশটির সংসদীয় কমিটির আলোচনায়ও এসেছে। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে-ভারত কি শেখ হাসিনা ইস্যুতে আগের অবস্থান থেকে ধীরে ধীরে সরে আসছে, নাকি এটি কেবল সময় নেওয়ার কৌশল?

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ভারতে আশ্রয় নেন শেখ হাসিনা। গত দুই বছর ধরে তিনি সেখানেই আছেন। ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে হত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধসহ শত শত মামলা দায়ের হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে একাধিকবার তাকে প্রত্যর্পণের আবেদন জানিয়েছে। দীর্ঘ সময় দিল্লির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে খুব সীমিত প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও সম্প্রতি ভারতের বক্তব্যে কিছু নতুন শব্দ ও নতুন প্রক্রিয়া যুক্ত হওয়ায় বিষয়টি আবার আলোচনায় এসেছে।

সম্প্রতি ভারতের সংসদে উপস্থাপিত ‘ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক’ বিষয়ক প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নটি সরাসরি উঠে এসেছে। শশী থারুরের নেতৃত্বাধীন সংসদীয় কমিটি সরকারের কাছে জানতে চায়, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধের বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। জবাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, প্রযোজ্য আইন ও প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি অনুসারে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ বিষয়টি পর্যালোচনা করছে এবং সুপারিশটি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সংসদীয় কমিটি সরকারকে বিষয়টির অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত অবহিত রাখারও সুপারিশ করেছে।

কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এ ধরনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি আগের তুলনায় ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। কারণ এতদিন দিল্লি বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে খুব সংযত অবস্থান নিয়েছিল।

আরও পড়ুন

ভারতে বসে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে পারবেন না হাসিনা: মোদি সরকার

হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা নিয়ে মুখ খুলল ভারত

হংকংভিত্তিক প্রভাবশালী দৈনিক সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভারতের এই ভাষা কেবল একটি প্রশাসনিক জবাব নয়; বরং এতে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বার্তাও রয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টা এবং একই সঙ্গে শেখ হাসিনা প্রশ্নে কৌশলগত অবস্থান বজায় রাখার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজছে নয়া দিল্লি।

দিল্লির ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের অধ্যাপক অভিনব মেহরোত্রা বলেন, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ‘actively under consideration’ বা ‘পর্যালোচনাধীন’ শব্দগুচ্ছ সাধারণত তাৎক্ষণিক সম্মতি বা প্রত্যাখ্যান বোঝায় না; বরং ভবিষ্যতের জন্য দরজা খোলা রাখে। তার মতে, শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তটি আইনের পাশাপাশি রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপরও নির্ভর করবে।

ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের গবেষক অমিত রঞ্জনের মতে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ কেবল একটি আইনি মামলা নয়; এটি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অন্যতম সংবেদনশীল রাজনৈতিক ইস্যু। তাই বিষয়টির সমাধান আদালতের পাশাপাশি দুই দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনার ওপরও নির্ভর করবে।

Hasina3
আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, ছন্নছাড়া দলটির নেতাকর্মীরা। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের সামনে বর্তমানে দুটি বড় বাস্তবতা রয়েছে। একদিকে রয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা, অন্যদিকে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে ঘিরে ভারতের দীর্ঘদিনের কৌশলগত বিনিয়োগ।

গোয়ার মন্ত্রায়া ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের প্রতিষ্ঠাতা শান্থি ম্যারিয়েট ডি'সুজা মনে করেন, শেখ হাসিনা এখনো ভারতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ। তার ভাষায়, শেখ হাসিনাকে ঢাকার কাছে হস্তান্তর করা হলে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে বড় ধাক্কা লাগতে পারে। আবার বাংলাদেশ যদি ভবিষ্যতে ভারতবিরোধী অবস্থানে যায়, তাহলে শেখ হাসিনা দিল্লির জন্য একটি রাজনৈতিক লিভারেজ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারেন।

অন্যদিকে ভারতের সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে মানবিক বিবেচনায়। একই সঙ্গে ভারত সরকার তাকে কোনো রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম দেয়নি এবং ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনারও সুযোগ দেওয়া হয়নি। সংসদীয় কমিটি সরকারের এই অবস্থানকে সমর্থন জানিয়েছে।

আরও পড়ুন

শেখ হাসিনার দেশে ফেরা কতটা সম্ভব? কী বলছে বাস্তবতা

হঠাৎ হাসিনার দেশে ফেরার ডেটলাইন, নেপথ্যে কী?

ভারতের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও একই সুর পাওয়া যায়। তাদের ভাষ্য, ভারত শেখ হাসিনাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে আনেনি, আবার জোর করে দেশ ছাড়তেও বলছে না। পরিস্থিতি বিবেচনা করে তিনি নিজেই সিদ্ধান্ত নেবেন। অর্থাৎ ভারতের আনুষ্ঠানিক নীতিতে নাটকীয় পরিবর্তনের প্রমাণ এখনো নেই। তবে বিষয়টি আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রাতিষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিকভাবে বিবেচনায় এসেছে।

এদিকে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা জানান, তিনি ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান। যদিও তিনি স্বীকার করেন, দেশে ফিরলে তাকে গ্রেফতার এমনকি মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখিও হতে হতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘোষণার ফলে প্রত্যর্পণ প্রশ্নটি আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনায় উঠে এসেছে। একই সঙ্গে ভারতকেও এখন এ বিষয়ে আরও স্পষ্ট কূটনৈতিক অবস্থান নিতে হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনা ইস্যুকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্কের সম্প্রসারণ, পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি, সম্ভাব্য অর্থনৈতিক করিডর, গঙ্গা পানিচুক্তির নবায়ন এবং সীমান্ত ইস্যু—সব মিলিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। এই বাস্তবতায় দিল্লি কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পুরো আঞ্চলিক পরিস্থিতি বিবেচনা করতেই আগ্রহী।

জেবি