Dhaka Mail Logo

রাজনীতি

নিলোফার চৌধুরী মনির বেফাঁস মন্তব্যে বিএনপিতে অস্বস্তি!

আব্দুল হাকিম

০৩ জুলাই ২০২৬, ১০:১৩ পিএম

টেলিভিশন টকশোতে জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান এবং এর নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্কিত ও আপত্তিকর মন্তব্য করে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন বিএনপির স্বনির্ভরতা বিষয়ক সহ-সম্পাদক ও সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি। তার এই বক্তব্যে খোদ বিএনপির ভেতরেই চরম অস্বস্তি ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। জুলাই আন্দোলনের পক্ষের দলের সিংহভাগ নেতাকর্মী ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করা ছাত্রদল নেতারা মনির এই বক্তব্যকে ‘গণঅভ্যুত্থানের চেতনা পরিপন্থী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।

দলের ভেতরের একটি বড় অংশের অভিযোগ, বিগত ওয়ান-ইলেভেনের সময় সংস্কারবাদী ভূমিকা এবং পরবর্তী সময়ে কাঙ্ক্ষিত মনোনয়ন না পেয়ে নিলোফার চৌধুরী মনি দীর্ঘদিন ধরেই দলের একটি অংশের প্রতি অসন্তুষ্ট। সেই ক্ষোভ থেকেই তিনি বর্তমান পরিস্থিতিতে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে পরোক্ষভাবে পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন।

টকশোতে কী বলেছিলেন মনি?

সম্প্রতি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আইয়ে আলোচিত-সমালোচিত উপস্থাপক সোমা ইসলামের টকশোতে অংশ নিয়ে নিলোফার চৌধুরী মনি জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের গতিপ্রকৃতি, নেপথ্যের কারিগর এবং আন্দোলনের প্রেক্ষাপট নিয়ে একাধিক আপত্তিকর ও বিভ্রান্তিকর মন্তব্য করেন।

nilufa--

অনুষ্ঠানে জুলাই আন্দোলনে স্নাইপার দিয়ে গুলি চালানো এবং এর পেছনের শক্তির দিকে ইঙ্গিত করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে স্নাইপার চালিয়েছেন কারা? অনেক কিছুই আমি বলতে চেয়েও বলতে পারি না। কারণ অনেক কিছু বললে অনেকের কাপড়-চোপড় ঠিক থাকবে না। যারা আজ কথা বলে তারা কখন কোথায় কীভাবে সেনাবাহিনীর সঙ্গে দেখা করে এই কাজগুলো করেছিল, তাদের কতটা ভূমিকা ছিল?’

আন্দোলনের নেতৃত্ব নিয়ে সরাসরি সন্দেহ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘যাদের বলা হয় যে তারাই মেইন, এই আন্দোলনে কারা মেইন ছিল, কেউ জানে না। আন্দোলনে অংশ নেওয়ার সময় একজন আরেকজনকে চেনে না। পাশে হাঁটতে গেছে, আন্দোলন করতে গেছে, পাশের একজন পড়ে গেছে, মনে করছে যে নরমাল পড়েছে, আসলে সে মারা গিয়েছে। গুলিটা সামনে থেকে আসছে না পেছন থেকে, সেটাও জানে না। গুলির কোনো শব্দ হয় নাই, এটা স্নাইপারের গুলি ছিল।’

টকশোর সঞ্চালক যখন তাকে সরাসরি প্রশ্ন করেন, তার মানে এটা কি কোনো ডিজাইন বা ষড়যন্ত্র ছিল? জবাবে মনি বলেন, ‘ডিজাইন তো অবশ্যই ছিল, ষড়যন্ত্র ছিল কি না আমি বলতে পারব না।’ তিনি আরও দাবি করেন, ‘কারা মারল কেউ জানে না। সামনে কোনো পুলিশও ছিল না। পুলিশের গুলি হলে তো সামনেই হতো। হতে পারে কোনো বাসা থেকে টার্গেট করে, উপরতলা থেকে টার্গেট করে হয়তো গুলি করা হয়েছে। আমার নিজের কাছে অনেক প্রশ্নের উত্তর নাই।’

জুলাই-আগস্টের চেতনাকে অবমাননার অভিযোগ

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মতে, নিলোফার চৌধুরী মনির এই বক্তব্য হুবহু গত দুই বছর ধরে দেশে ও বিদেশে বসে থাকা আওয়ামীপন্থী অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট এবং পতিত স্বৈরাচারের দোসরদের ছড়ানো প্রোপাগান্ডার সঙ্গে মিলে যায়। জুলাই অভ্যুত্থানকে একটি ‘বিদেশি ষড়যন্ত্র’ বা ‘ভেতরের কোনো সুনির্দিষ্ট ডিজাইন’ হিসেবে প্রমাণ করার যে অপচেষ্টা আওয়ামী লীগ করে আসছে, মনির কণ্ঠে তারই প্রতিধ্বনি শোনা গেছে।

ছাত্র-জনতার বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই গণঅভ্যুত্থানকে তিনি যেভাবে ‘পরিকল্পিত নকশা’ এবং ‘পেছন থেকে চালানো স্নাইপারের গুলি’ বলে অ্যাখ্যা দিয়েছেন, তাতে সাধারণ শহীদদের আবেগ ও আত্মত্যাগের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে বলে মনে করছেন আন্দোলন সংশ্লিষ্টরা। মনির মতে, সাধারণ ছেলেমেয়েরা ইমোশন নিয়ে রাস্তায় এসেছিল, কিন্তু তাদের সেই ইমোশনের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। তার এই মন্তব্য গণঅভ্যুত্থানের ন্যায্যতাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে বলে মনে করেন জুলাইযোদ্ধারা।

ক্ষুব্ধ ছাত্রদল

নিলোফার চৌধুরী মনির এই ধৃষ্টতাপূর্ণ বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরপরই ক্ষোভে ফেটে পড়েন বিএনপির ছাত্রসংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। জুলাই আন্দোলনের সম্মুখসারির যোদ্ধা ছাত্রদল সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি দীর্ঘ পোস্টের মাধ্যমে মনির বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।

রাকিব তার পোস্টে লিখেন- প্রিয় নিলোফার চৌধুরী মনি আপা, আপনি দীর্ঘ ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলন সংগ্রামের সারথী ছিলেন। গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে আপনার অনবদ্য ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি টেলিভিশন টকশোতে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান নিয়ে আপনার অযাচিত বক্তব্যে আমরা অত্যন্ত মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ। আপনার বক্তব্য আমরা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করলাম।

তিনি মনিকে উদ্দেশ্য করে আরও বলেন, আমরা অবগত রয়েছি, আপনি জুলাইয়ের চেতনা ধারণকারী একজন দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ। তাই জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান নিয়ে বক্তব্যে আপনি আরও বেশি সংযত ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করবেন, সেটাই প্রত্যাশা করি।

তবে পরবর্তী সময়ে নিলোফার চৌধুরী মনির সঙ্গে কথা বলে আবারও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করেন রাকিব। তিনি বলেন, চ্যানেল আই’র টকশোতে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানকেন্দ্রিক কিছু অস্পষ্ট বক্তব্য নিয়ে দীর্ঘ ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন সংগ্রামের সারথি প্রিয় নিলোফার চৌধুরী মনি, এমপি আপুর সাথে কথা হয়েছে।

nilu

সংসদ সদস্য মনি আপুর বক্তব্যের সারসংক্ষেপ হলো: জুলাই আগস্টে ফ্যাসিস্ট খুনি হাসিনার আজ্ঞাবহ বাহিনী ও সন্ত্রাসীরা শত শত ছাত্র জনতাকে হত্যা করে ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। স্নাইপারের গুলি বলতে তিনি বুঝিয়েছেন ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী সন্ত্রাসীরা স্নাইপার থেকে গুলি করে ছাত্র-জনতাকে হত্যা করেছে। আর ডিজাইন বলতে তিনি বুঝিয়েছেন, ছাত্র-জনতাসহ সকল রাজনৈতিক সংগঠন ঐক্যবদ্ধভাবে ডিজাইন অনুসারেই জুলাই আগস্টের গণঅভ্যুত্থান সফল করেছেন।

রাকিব আরও লিখেন- সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি'র উপরোক্ত ব্যাখ্যায় টকশোতে তার অস্পষ্ট ও অসমাপ্ত বাক্যগুলো সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝির আর কোনো অবকাশ নেই। গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে রাজপথের আপসহীন মাননীয় সংসদ সদস্য মনি আপুর অনবদ্য ভূমিকা প্রশ্নাতীত। আগামীতেও আমাদের মাননীয় সংসদ সদস্য মনি আপু তার লড়াই সংগ্রামের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখবেন এবং জুলাই আগস্টের গণঅভ্যুত্থান নিয়ে তার আপসহীন অবস্থান সমুন্নত রাখবেন, আমরা সেই প্রত্যাশা করি।

অতীত বিতর্ক ও ‘সাবোটাজ’ করার চেষ্টা?

এটিই প্রথম নয়, নিলোফার চৌধুরী মনি এর আগেও একাধিকবার টকশো বা জনসমক্ষে এমন কিছু বক্তব্য দিয়েছেন, যা বিএনপিকে চরম রাজনৈতিক বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে। দলের নেতাকর্মীদের একাংশের ধারণা, মনি ইচ্ছাকৃতভাবে বা ‘পারপাসফুলি’ দলকে সাবোটাজ করার জন্য কিংবা সস্তা আলোচনায় থাকার জন্য নিয়মিত বিরতিতে এই ধরনের বিতর্কিত মন্তব্য করে থাকেন।

এর আগে এক টকশোতে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র জনপ্রিয় প্রয়াত নেতা শহীদ ওসমান হাদীকে ‘গিনিপিগ’ বলে মন্তব্য করে ব্যাপক আলোড়ন ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছিলেন তিনি। দলমত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের কাছে শ্রদ্ধেয় একজন নেতাকে নিয়ে তার এই বেফাঁস মন্তব্যের পর দলের ভেতরে তাকে সতর্ক করার দাবি উঠলেও রহস্যজনকভাবে তখন তার বিরুদ্ধে কোনো সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

সম্প্রতি তিনি আরেকটি টকশোতে মন্তব্য করেছিলেন যে, ‘জাকাত বা ফেতরা নেওয়ার চেয়ে চাঁদাবাজি করা ভালো’। তার এই ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধহীন কাণ্ডজ্ঞানহীন বক্তব্য সে সময় সাধারণ জনগণের মাঝে তীব্র নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে, যার দায়ভার পরোক্ষভাবে বিএনপির ওপরেই এসে পড়ে।

বিএনপিতে গভীর অস্বস্তি ও মনোনয়নের ক্ষোভ

বিএনপির ভেতরেও মনির বক্তব্য নিয়ে অসন্তোষের কথা শোনা যাচ্ছে। বিএনপির ভেতরের সূত্রগুলো বলছে, নিলোফার চৌধুরী মনির এই মারমুখি ও দলবিরোধী অবস্থানের নেপথ্যে রয়েছে তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক হতাশা। দলের জন্য দীর্ঘদিন কাজ করলেও বিগত সময়ে কাঙ্ক্ষিত মূল্যায়ন বা সংসদ সদস্য পদের মনোনয়ন না পাওয়ায় দলের বর্তমান মূলধারার নেতৃত্বের প্রতি তার প্রচ্ছন্ন ক্ষোভ রয়েছে। আর সেই ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটছে জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্ব এবং এর সাফল্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করার মাধ্যমে।

তবে দলের অনেকেই মনে করছেন, বিএনপির হেভিওয়েট কোনো কোনো নেতার অতীতের কিছু বক্তব্যকে সামনে রেখে মনির এই আচরণকে এড়িয়ে যেতে চাইছেন। কিন্তু তৃণমূলের জুলাই যোদ্ধারা এবং ছাত্রদল কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদের পক্ষে যায় এমন সমান্তরাল বক্তব্য মেনে নিতে রাজি নয়। এমন বিতর্কিত মন্তব্যে দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই বিষয়টি খতিয়ে দেখে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া কিংবা অন্তত কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার দাবি তুলেছেন কেউ কেউ। 

নিলোফার চৌধুরী মনির এই ‘হাসিনার সুর’ ধারণ করা বক্তব্যকে দেশের ছাত্র-জনতা এবং বিএনপির সাধারণ নেতাকর্মীরা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে। দল অবিলম্বে তাকে শোকজ করবে কিংবা বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোরভাবে সংযত হওয়ার জন্য সাংগঠনিক নির্দেশনা জারি করবে এমন প্রত্যাশা নেতাকর্মীদের। 

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বাহবা

নিলোফার চৌধুরী মনির এই বিভ্রান্তিকর বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তা লুফে নিয়েছে পলাতক ও আত্মগোপনে থাকা ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। গত দুই বছর ধরে জুলাই অভ্যুত্থানকে ‘ষড়যন্ত্র’ প্রমাণ করার জন্য আওয়ামী লীগ যে প্রোপাগান্ডা চালিয়ে আসছিল, বিএনপির একজন দায়িত্বশীল নেত্রীর মুখে সেই একই সুর শুনে তারা এখন মনিকে বাহবা দিচ্ছে। 

আওয়ামীপন্থী বিভিন্ন ফেসবুক পেজ, গ্রুপ, এক্স (টুইটার) অ্যাকাউন্ট এবং ছদ্মবেশী অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা মনির টকশোর ভিডিও ক্লিপটি ব্যাপকভাবে শেয়ার করে এটিকে তাদের এতদিনের ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্বের’ অকাট্য প্রমাণ হিসেবে হাজির করছে। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মনিকে বাহবা দিয়ে প্রচার করছে যে, খোদ বিএনপির সিনিয়র নেত্রীই যখন এই আন্দোলনকে ‘ষড়যন্ত্র’ এবং ‘নেপথ্যের নকশা’ বলছেন, তখন এই গণঅভ্যুত্থানের আর কোনো বৈধতা থাকে না।

nilufa--

সাংবাদিক কনক সরওয়ার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘জুলাই বিপ্লবের অন্যতম সুবিধাভোগী বর্তমান সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি আওয়ামী লীগকে পরিপুষ্ট করে বা আওয়ামী বয়ান প্রতিষ্ঠিত করতে মাঠে নেমেছেন। জুলাই বিপ্লবকে নিয়ে এক ধরনের সন্দেহ-দোলাচল সৃষ্টি করেছেন, নিজের মূর্খতাকে বা ফরমায়েশি আওয়ামী কন্ট্রাক্ট আড়াল করতে খুব ভাব নিয়ে বলেছেন ‘বাংলাদেশে পুলিশে স্নাইপার নেই!’ স্নাইপার নাকি বাইরে থেকে আসছে। অথচ ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩ নিউ এইজ পত্রিকার রিপোর্ট এবং ১২ অক্টোবর ২০২৪ নেত্র নিউজের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রমাণ করে পুলিশে স্নাইপার ছিল এবং ৭.৬২ মিলিমিটার বুলেট ও ছিল।’

ওই পোস্টে তিনি আরও লিখেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই মূর্খ ধান্দাবাজ এবং টাউট মহিলাকে দল এবং সংসদ থেকে বহিষ্কার করুন! না হয় এরাই আপনার অনেক কিছুকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলবে। আর চ্যানেল আইয়ের সাগর- সিরাজ গং আবারও কৌশলে হাসিনার পক্ষে ন্যারেটিভস তৈরিতে মাঠে নেমেছে। বিষধর সাপের বিষদাঁত ভেঙে দিতে হয়, মিষ্টি কথায় মাথায় হাত বুলালে ছোবলই খেতে হয়।’

অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট এবং বিশ্লেষক ইমতিয়াজ মির্জা লিখেছেন, নিলোফার চৌধুরী মনির টকশোতে ব্লান্ডার এই প্রথম না। ‘জাকাতের টাকার চেয়ে চাঁদাবাজি বেটার’, ‘হাদি একটা গিনিপিগ’, এইরকম কন্ট্রোভার্সিয়াল মন্তব্য উনি করেছেন। গতকাল তিনি বললেন, জুলাই আন্দোলন ছিল একটা ডিজাইন। তাও এক আওয়ামী লীগের দালাল সোমার টকশোতে বসে। আমি কোনো সমালোচনা করলেই বলা হয় বিএনপি একটা বড় পার্টি, এইখানে বিভিন্ন ধরনের লোকজন আছে। কিন্তু আমার মাথায় ঢোকে না, যে লোকটা টকশো বিএনপিপন্থী হিসেবে যাচ্ছে বিএনপির জন্য কথা বলে বলতে, যে রানিং সংসদের মহিলা আসনের এমপি, তার এই ধরনের কমন সেন্স থাকবে না। স্নাইপার থিওরি আওয়ামী লীগের তৈরি করা বয়ান, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে লীগের দালালরা এইরকম বহু সন্দেহ আর বয়ান তৈরি করেছে। বাইরের রাষ্ট্রের ডিজাইন এটাও লীগেরই ন্যারেটিভ।’

তিনি আরও লিখেন, ‘স্বাভাবিকভাবে লো-আইকিউ ছাপড়ি নিলোফার মনি এই নোট পায়নি। এটা মনির প্রবলেম না, বহু রথি-মহারথিকে জিজ্ঞেস করলে ১৭ বছরে কী আন্দোলন হয়েছে, কে করেছে আন্দোলন, কারা লেখালেখি করেছে এসব জিজ্ঞেস করলে কোনো উত্তর পাবেন না। দলীয় লেজুরবৃত্তি করে বা দলীয় প্রধানের সুনজরে থেকেই যদি পদ/ক্ষমতা পাওয়া যায় তাহলে এসব লাগবে কেন? নিলোফার মনিকে বহুবার দেখেছি অনলাইন লেখকদের লেখা প্রিন্ট করে টকশোতে পড়তে। নিলোফার চৌধুরী মনিকে আগে আওয়ামী লীগরা আনতো কারণ তাকে ব্যাশ করা সহজ। সিচুয়েশন এমন ছিল এই ধরনের উইক বিএনপি নিয়ে এসে  আওয়ামী লীগের বজ্জাতি, স্বৈরাচার, দুস্কর্মকে ভ্যালিডিটি দেওয়া। বিএনপি এখন রাষ্ট্রক্ষমতায়, কিন্তু সেই প্রজেক্ট সেই একই ব্লান্ডার চলমান।’

ইমতিয়াজ মির্জা লিখেন, ‘জুলাই-এর ব্যাপারে বিএনপির অবস্থান কী, এই ধরনের ব্যাপারগুলোকে কীভাবে হ্যান্ডেল করতে হবে, কী বলা যাবে, কী যাবে না, এসব বেসিক সেন্স মানুষ এমনতেই গ্রো করা উচিত। কিন্তু বিএনপির উচিত ছিল এই ধরনের নোট মানুষের কাছে পাঠানো। প্রেপ করা। ব্যাপার হচ্ছে, প্রেস টিম বা বিএনপি দলীয় কোনো জায়গায় এসব ব্যাপারে কোনো স্মৃতি সংরক্ষিত নাই! নিলোফার চৌধুরী মনিকে লো-আইকিউ ইডিয়ট বলে অনেক গালি দেওয়া যায়, সত্যি কথা বলতে এটা বিএনপিকে যারা চালায়, বিএনপি থিংক ট্যাংকের দোষ।’

এদিকে নিলোফার চৌধুরী মনির বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে জাস্টিস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি পার্টি (জেডিপি)। দলটির আহ্বায়ক নাঈম আহমাদ বলেন, `এটি নিলোফার চৌধুরী মনির প্রথম বিতর্কিত বক্তব্য নয়। এর আগেও তিনি জাকাতের টাকার চেয়ে চাঁদাবাজি বেটার বলে মন্তব্য করেছেন এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম সিপাহসালার শহীদ ওসমান হাদীকে গিনিপিগ বলে আখ্যায়িত করার ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন। এসব বক্তব্য প্রমাণ করে, তিনি ধারাবাহিকভাবে জুলাইয়ের চেতনা ও গণমানুষের মূল্যবোধকে অবমূল্যায়নের চেষ্টা করে আসছেন।‘

জেডিপির আহ্বায়ক আরও বলেন, ‘নিলোফার চৌধুরী মনির মতো একজন প্রকাশ্য জুলাইবিরোধী ব্যক্তিকে বিএনপি নেতৃত্ব কতটা প্রশ্রয় দেয়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। দেশের মানুষ এখন দেখার অপেক্ষায় রয়েছে—বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এমন বক্তব্যের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন কি না এবং নিলুফার চৌধুরী মনিকে দলীয় পদ-পদবি থেকে অপসারণ করেন কি না।’

জুলাই নিয়ে দেওয়া বক্তব্যের ব্যাখ্যা 

জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে দেওয়া নিজ বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়েছেন বিএনপির স্বনির্ভর বিষয়ক সম্পাদক ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি। বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) রাতে একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে নিজের কথাগুলো তুলে ধরেন নিলোফার মনি। তিনি দাবি করেছেন, তার বক্তব্য ‘কাটছাঁট করে’ গণমাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে। একইসঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ‘ডিজাইন করা আন্দোলন’ বলে কখনোই মন্তব্য করেননি বলেও জোর দাবি করেন তিনি।

নিলোফার চৌধুরী মনি বলেন, ‘আমার বক্তব্য অবশ্যই কাটছাঁট করে প্রচার করা হচ্ছে। আমি কালকে বেশ কয়েকটি টক-শো করেছি। আমি জুলাই যোদ্ধাদের পক্ষের মানুষ। আন্দোলনের সময়ও টক-শো করেছি। আমি বলেছি, পুলিশের কাছে স্নাইপার ছিল না। তাহলে এসব অস্ত্র কোথা থেকে এলো, সেটার তদন্ত হওয়া উচিত।’

মনি বলেন, ‘আমি জুলাই ডিজাইন বলেছি এই অর্থে, ষড়যন্ত্র করে আমাদের ছেলেগুলোকে হত্যা করা হয়েছে। আমি তো বলিনি, জুলাই আন্দোলন ডিজাইন করা হয়েছিল। আমার বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, আমাদের ছেলেদের বিরুদ্ধে একটি পরিকল্পনা বা ডিজাইন করা হয়েছিল।’

এএইচ/জেবি