বোরহান উদ্দিন
০২ জুলাই ২০২৬, ১১:২৩ এএম
• জিয়া পরিবারের বিষোদ্গার ছিল নিত্যদিনের কাজ, ছাড় পেত না রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ
• পাত্তা দিতেন না সাংবাদিকদেরও
• রায়ের দিনে আদালতেই মেজাজ হারান ইনু
• কয়েদির পোশাকে কাটছে কারাজীবন
রাজনৈতিক দল হিসেবে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) একক কোনো জনভিত্তি না থাকলেও, বিগত দিনে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের আশ্রয়ে টানা কয়েক মেয়াদে সংসদ সদস্য হন হাসানুল হক ইনু। জাসদ সভাপতি ইনু বাগিয়ে নেন তথ্যমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদও। আর এই ক্ষমতার জোরেই সংসদ, সচিবালয় থেকে শুরু করে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তার দাম্ভিকতাপূর্ণ বক্তব্য ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। বিশেষ করে জিয়া পরিবারের সদস্যদের প্রতি কটূক্তি এবং বিরোধী দলগুলোকে নিয়ে লাগামহীন বক্তব্য দিয়ে প্রায়ই রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিতেন তিনি।
২০১৫ সালের এমনই এক দিনে সচিবালয়ের ব্রিফিং কক্ষে দাঁড়িয়ে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু হাত নেড়ে জোরালো গলায় বলেছিলেন, ‘খালেদা জিয়া দুর্নীতিবাজ, সাজাপ্রাপ্ত আসামি। বিষদাঁত ভেঙে দেওয়া হবে। জামায়াত-বিএনপির ঠাঁই হবে পাতালে।’ আবার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ‘সন্ত্রাসীপুত্র’ ও ‘ফেরারি আসামি’ বলেও একাধিকবার মন্তব্য করেছিলেন।
এক দশকের বেশি সময় ধরে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এভাবেই নিয়মিত আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেওয়া জাসদের এই শীর্ষ নেতা ক্ষমতার পটপরিবর্তনে এখন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড মাথায় নিয়ে তার দিন কাটছে এখন কারাপ্রকোষ্ঠে।
২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট উত্তরা থেকে গ্রেফতারের পর মঙ্গলবার (৩০ জুন) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় ইনুর সেই পুরোনো মেজাজ বা দম্ভ দেখা না গেলেও, কাঠগড়া থেকে নামার পর আদালতকক্ষেই এক অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন তিনি।
আদালত সূত্র জানায়, রায় ঘোষণা শেষে কাঠগড়া থেকে হাজতখানায় নিয়ে যাওয়ার সময় নিয়ম অনুযায়ী এক পুলিশ সদস্য ইনুর হাত ধরতে যান। এতেই ভীষণ চটে যান সাবেক এই মন্ত্রী। তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে হাত ঝটকা দিয়ে সরিয়ে উচ্চস্বরে বলেন, ‘হাত ছাড়ো! হাত ধরো কেন? আমি কি পালিয়ে যাচ্ছি?’ দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির এমন আচরণ দেখে আদালতকক্ষে উপস্থিত আইনজীবী ও সংবাদকর্মীদের অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেন। সেখানে উপস্থিত একজন আইনজীবী মন্তব্য করেন, ‘মন্ত্রী থাকাকালে যিনি সাংবাদিকদেরও পাত্তা দিতেন না, আজ সাজা হওয়ার পর পুলিশ হাত ধরাতেই তার এত ক্ষোভ!’

সাংবাদিকদের তাচ্ছিল্য ও একচ্ছত্র আধিপত্য
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে টানা পাঁচ বছর তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকাকালীন সচিবালয় কিংবা রাজনৈতিক সভা—সবখানেই একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল হাসানুল হক ইনুর। গণমাধ্যমকর্মীদের অনেকেই জানান, মন্ত্রী থাকাকালীন সাংবাদিকদের প্রশ্নকে তিনি প্রায়ই এড়িয়ে যেতেন বা তাচ্ছিল্য করতেন। কোনো জেরা বা অস্বস্তিকর প্রশ্ন করলেই ধমকের সুরে অপসাংবাদিকতা করার তকমা দিতেন ইনু।
অভিযোগ আছে, পছন্দের একটি সাংবাদিক বলয় তৈরি করলেও ভিন্নমতের সাংবাদিকদের পাত্তাই দিতেন না সাবেক এই তথ্যমন্ত্রী। তাঁর কাছ থেকে মিলত না ন্যূনতম সৌজন্যবোধ।
ইনুর তথ্যমন্ত্রী থাকাকালীন সময়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সিনিয়র সাংবাদিক এম আব্দুল্লাহ বলেন, হাসানুল হক ইনু তথ্যমন্ত্রী থাকার সময়ে আমাদের হাজার খানেক সহকর্মী টানা ১১ বছরের জন্য কর্মহীন হয়ে পড়েন। কয়েকজন সহকর্মীকে নিয়ে মন্ত্রণালয়ে তার সঙ্গে দেখা করে বন্ধ পত্রিকা খুলে দেওয়ার অনুরোধ জানালে, তিনি নানা অজুহাত বুঝিয়ে আমাদের বিদায় করেন। পাঁচজন সিনিয়র সাংবাদিককে বসতে বলার ন্যূনতম সৌজন্যও তিনি দেখাননি। তখন তিনি ধরাকে সরা জ্ঞান করতেন। তার প্রধান কাজই ছিল বেগম খালেদা জিয়া ও জিয়া পরিবারকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বক্তব্য দেওয়া। ট্রাইব্যুনালে সাজা হওয়ার পরও তার আচরণে সেই পুরোনো ঔদ্ধত্য দেখা গেছে।
রাজনৈতিক পটভূমি ও মহাজোটের সুবিধা
ছাত্ররাজনীতি থেকে উঠে আসা হাসানুল হক ইনু মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় অন্যতম ছাত্রনেতা হিসেবে ভূমিকা রাখেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে জাসদ গঠনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং দলটির সশস্ত্র শাখা গণবাহিনীর প্রধান ছিলেন। জাসদ ও গণবাহিনীর তৎকালীন ভূমিকা নিয়ে খোদ আওয়ামী লীগের ভেতরেই দীর্ঘকাল ধরে তীব্র সমালোচনা ছিল। তবে ২০০৮ সালের পর রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করে তিনি শেখ হাসিনার অন্যতম ‘বিশ্বস্ত’ জোটসঙ্গীতে পরিণত হন এবং ক্ষমতার সর্বোচ্চ সুবিধা ভোগ করেন।

৩টি অপরাধ প্রমাণিত, দিতে হবে ক্ষতিপূরণ
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ মঙ্গলবার তার বিরুদ্ধে মামলার রায় ঘোষণা করেন। ইনুর বিরুদ্ধে আনা ৮টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগের মধ্যে ৩টি আদালতে প্রমাণিত হয়েছে। প্রমাণিত অভিযোগগুলো হলো—কুষ্টিয়ার এসপিকে ফোন করে আন্দোলনকারীদের তালিকা তৈরি করে নির্যাতন করা, জামায়াত নিষিদ্ধের লক্ষ্যে ১৪-দলীয় জোটের বৈঠকে উসকানি দেওয়া এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে দমন-পীড়নের ষড়যন্ত্র করা।
প্রমাণিত ৩টি অপরাধের প্রতিটির জন্য আদালত তাকে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেন। তবে সব সাজা একসঙ্গে চলায় তাকে মোট ১০ বছর কারাভোগ করতে হবে। এর পাশাপাশি দুটি অভিযোগে ভুক্তভোগীদের মোট ২ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে সারাদেশে হত্যা ও দমন-পীড়নের অভিযোগে ৩৫টির মতো মামলা রয়েছে।

হারিয়েছেন ডিভিশন, গায়ে কয়েদির পোশাক
এদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাজা হওয়ার পর সাবেক এই মন্ত্রীকে গতকালই ঢাকা জেলার একটি কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে তাকে ঠিক কোন কারাগারে রাখা হয়েছে, তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি কারা কর্তৃপক্ষ।
তবে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের মধ্যে ‘বিশেষ কারাগারে’ তাকে রাখা হয়েছে বলে একটি সূত্রে জানা গেছে।
কারা সূত্র জানিয়েছে, সাজা ঘোষণার পর আইন অনুযায়ী হাসানুল হক ইনু তার আগের প্রথম শ্রেণির বন্দীর (ডিভিশন-১) মর্যাদা সম্পূর্ণ হারিয়েছেন। কারাগারে যাওয়ার পর রাতেই তাঁর সাধারণ পোশাক খুলে কয়েদির নির্ধারিত পোশাক পরানো হয়েছে। প্রথম রাতে সাধারণ কয়েদিদের মেন্যু অনুযায়ীই রাতের খাবার খেয়েছেন সাবেক এই তথ্যমন্ত্রী। পরবর্তীতে সাধারণ কয়েদিদের জন্য বরাদ্দকৃত সীমিত খাবার দেওয়া শুরু হয়েছে তাকে।
বিইউ/এএস