জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
২৯ জুন ২০২৬, ০১:৪৬ পিএম
সংসদে একে অপরকে চরিত্রহননের ‘ব্যাড কালচার’ বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, সরকারি দল ও বিরোধী দল সংসদের দুটি চাকার মতো। একটি চাকা অচল হলে পুরো সংসদই অকার্যকর হয়ে পড়বে। তাই বিভাজনের রাজনীতি নয়, পারস্পরিক সম্মান ও গঠনমূলক সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সরকারি দলের সব অভিপ্রায় বিরোধী দল চোখ বন্ধ করে মেনে নেবে না। আবার সরকার ভালো কোনো উদ্যোগ নিলে বিরোধিতার জন্যই তার বিরোধিতা করা হবে না। সরকারি দলকে বিরোধী পক্ষকে সম্মান করতে হবে, আর বিরোধী দলকেও যৌক্তিক বিষয়ে সরকারকে সহযোগিতা করার মানসিকতা রাখতে হবে।
সংসদকে একটি যানবাহনের সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, সংসদ মূলত দুটি চাকার ওপর চলে—একটি সরকারি দল, অন্যটি বিরোধী দল। যেকোনো একটি চাকা অচল হয়ে গেলে পুরো যানবাহনই অচল হয়ে পড়বে। তাই এই দুই চাকায় পিন বা পেরেক মেরে ফুটো করার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। সংসদে ‘কুচকুচ’ করে কাটার পর আবার ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানানোর যে মানসিকতা, সেই বিভাজনের যন্ত্র ফেলে দিতে হবে।
তিনি বলেন, সংসদ কোনো তোষামোদের জায়গা নয়; এটি দায়িত্ব পালনের জায়গা। জনগণের ট্যাক্সের টাকা খরচ করে সংসদে ব্যক্তিকে খুশি করতে গান, কবিতা বা স্বপ্নবিলাস করার যে সংস্কৃতি অতীতে ছিল, তা আর চলতে পারে না। ব্যক্তিকে খুশি করতে গিয়ে অন্যকে আঘাত করা এবং চরিত্র হননের যে ‘ব্যাড কালচার’ ছিল, তা পুরোপুরি বন্ধ করতে স্পিকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সরকারি দল কিংবা বিরোধী দল—সবার চিন্তাধারা এক হবে না, এটাই স্বাভাবিক। সবাই যদি একইভাবে চিন্তা করতেন, তাহলে এত দীর্ঘ আলোচনা বা বিতর্কের প্রয়োজন হতো না। জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে প্রত্যেক সদস্য নিজের বিবেক, মহান আল্লাহ এবং জনগণের কাছে দায়বদ্ধ।
বাজেট অধিবেশনকে বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই বাজেটের ওপরই আগামী এক বছরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নির্ভর করবে। তাই প্রত্যেক সদস্য দায়িত্ববোধ থেকেই আলোচনায় অংশ নিয়েছেন।
বক্তব্যে তিনি মরহুম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল আতাউল গণি ওসমানী এবং স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনকারী আ স ম আবদুর রবের অবদানের কথা স্মরণ করেন। একই সঙ্গে ৯০-এর গণআন্দোলন, ২৮ অক্টোবর, পিলখানা হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বর এবং সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে নিহত ও জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
নিজের দলকে ‘কষ্টে বোকা দল’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, একে একে দলের ১১ জন সিনিয়র নেতাকে হারিয়েছেন, এখন তিনি ১২ নম্বর হিসেবে জীবিত রয়েছেন। এছাড়া ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নিহত, আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী এবং ফ্যাসিবাদী শাসনামলে নির্যাতিত পরিবারগুলোর প্রতিও সমবেদনা জানান। পিলখানায় সেনা কর্মকর্তাদের হত্যাকাণ্ডকে জাতির জন্য গভীর আঘাত উল্লেখ করে তিনি তাদের জন্য দোয়া করেন।
এই সংসদকে ‘মজলুমের পার্লামেন্ট’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, সীমাহীন ত্যাগের বিনিময়ে গঠিত এ সংসদ এমন কোনো আচরণ করবে না, যা নির্যাতিত মানুষকে কষ্ট দেয়। বরং সংসদ দেশকে স্বপ্ন দেখাবে, ঐক্যবদ্ধ করবে এবং সামনে এগিয়ে নেওয়ার পথ দেখাবে।
বাজেটকে একটি জাতির টিকে থাকা ও সামনে এগিয়ে যাওয়ার সনদ উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, স্বল্প সময়ের মধ্যে বিধ্বস্ত অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে ২৩৪ পৃষ্ঠার বাজেট প্রণয়ন সহজ কাজ ছিল না। তবে মানুষের কোনো কাজই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। ফলে বাজেটেও কিছু ঘাটতি থাকতেই পারে।
তিনি বলেন, বিরোধী দলের দায়িত্ব হলো ‘ওয়াচডগ’ হিসেবে কাজ করা। বাজেটের মাধ্যমে কোথাও জনগণের ক্ষতি হচ্ছে কি না, কেউ ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কি না কিংবা অর্থের অপচয় হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে সতর্ক নজর রাখা বিরোধী দলের দায়িত্ব।
সরকারি দলের কেউ কেউ সমালোচনাকে স্বাগত জানিয়েছেন, আবার কেউ বিরক্তি প্রকাশ করেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই বৈচিত্রই সংসদের সৌন্দর্য। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বাজেট আলোচনায় সরকারি ও বিরোধী দলের পক্ষ থেকে আসা যৌক্তিক প্রস্তাবগুলো অর্থমন্ত্রী গ্রহণ করবেন, যাতে জনগণ বুঝতে পারে সংসদের আলোচনা কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়।
বাজেট বাস্তবায়নে কাঠামোগত সংস্কারের প্রস্তাব দিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, জুলাই-জুন অর্থবছরের কারণে বছরের শেষ দিকে বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেও তড়িঘড়ি করে উন্নয়নকাজ শেষ করতে হয়। এতে অপচয় ও অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়। এ কারণে তিনি অর্থবছর জুলাই-জুনের পরিবর্তে জানুয়ারি-ডিসেম্বর ভিত্তিক করার প্রস্তাব পুনর্ব্যক্ত করেন। তার মতে, এতে অপচয় কমবে, কাজের গতি বাড়বে এবং উন্নয়ন কার্যক্রম আরও সুশৃঙ্খলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, বাজেট সংসদে পাস হলেও এর বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ ও কর্মকর্তাদের ওপর বর্তায়। তাই জনগণের করের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবার জবাবদিহি ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি।
টিএই/এমআই