জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১০:০৫ পিএম
জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের বলেছেন, জামায়াতে ইসলামীর এরকম কোনো ব্যাংক নেই। আমাদের যারা এমপি আছি, ইসলামী ব্যাংকে তাঁদের কেউ পরিচালক নন, আমরা কোনো ঋণ পুনঃতফসিলও করিনি।
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনীত প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তাহের এ কথা বলেন। এর আগে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জামায়াতের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, অনেক দল আছে, তাদের নাকি ব্যাংকও আছে। বিএনপির ব্যাংক নেই।
বিষয়টির জবাব দিতে গিয়ে তাহের আরও বলেন, ইসলামী ব্যাংক ছিল একদল সৎ ও উদ্যোগী মানুষের প্রচেষ্টার ফসল। যদি বলেন ইসলামী ব্যাংক পরিচালনায় আমাদের ভূমিকা আছে, তবে আমরা তা স্বীকার করি।
এ সময় তিনি বলেন, ১৯৯১ সালে বিএনপিকে সরকার গঠনে সমর্থন দিয়ে ১৯৯৬ সালে জামায়াত আলাদা নির্বাচন করে। সেটার জন্য ওই সময় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষকে দায়ী করেন তাহের।
তিনি বলেন, এবারও সেরকম কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। এ ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকলে পরিস্থিতি খারাপ হবে। আমরা চাই, এই সংসদ ও এই সরকার সুস্থ ধারায় চলুক। বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব গণ্ডগোল হচ্ছে, সেদিকে আপনারা নজর দিন। যারাই বিশৃঙ্খলা করবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন।
দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় গঠিত অতীতের সরকারের পরিণতি সম্পর্কে বিএনপিকে সতর্ক করেছেন বিরোধীদলীয় উপনেতা। অতীতের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন, শেখ সাহেব (শেখ মুজিবুর রহমান) নিহত হয়েছিলেন। শহীদ জিয়াউর রহমানের সময়ের ঘটনাগুলো আমাদের আতঙ্কিত করে।
দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে আবদুল্লাহ মো. তাহের বলেন, উপমহাদেশে ভারতে ইন্দিরা গান্ধীর সময়ে, পাকিস্তানে বেনজির ভুট্টোর সময়ে, বাংলাদেশে শেখ সাহেবের সময়ে, তারপর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে এবং বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে আমরা অবস্থা দেখেছি। এর একটি ভয়ংকর পরিণতিও আমরা দেখেছি। সেখান থেকে শিক্ষা নিয়েই আমরা চাই, এ ধরনের কোনো অঘটন বাংলাদেশে আর কখনো না ঘটুক।
বক্তব্যের শুরুতেই আবদুল্লাহ তাহের সংসদের বর্তমান অবস্থাকে অতীতের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, আজ যারা সরকারি দলের আসনে আছেন, তাঁরা বোধহয় আওয়ামী লীগ থেকে এসেছেন। আর আমরা যারা এদিকে আছি, তাঁরা বোধহয় জামায়াত-বিএনপির সংসদ সদস্য। কারণ, আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় ছিল এবং আমরা বিরোধী দলে ছিলাম, তখন আওয়ামী লীগ যে ভাষায়, যে ভঙ্গিতে, যে চেতনায় এবং যেসব বিষয়ে জামায়াতের বিরুদ্ধে বলত ও আচরণ করত, ঠিক আজ সরকারি দলের পক্ষ থেকেও আমরা একই ধরনের আচরণ লক্ষ্য করছি।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, এই সংগ্রামে বিএনপি, জামায়াত এবং অন্যান্য দল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সমানভাবে একত্রিত ছিল। অনেক সময় গোপনে একই গাড়িতে চড়ে ঘুরে ঘুরে আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনের কর্মকৌশল ও কর্মসূচি ঠিক করা হয়েছিল।
আন্দোলনের সময়কার ঐক্যের প্রসঙ্গ তুলে তাহের বলেন, আমরা সবাই তখন বলেছি, এই সংগ্রামের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের পতনের পর যে রাজনীতি হবে, সেখানে আমরা সবাই মিলে সুশাসনের জন্য কাজ করব। এ পর্যন্ত আমরা পুরোপুরি ঐকমত্যে ছিলাম।
নির্বাচনের পর পরিস্থিতি বদলে গেছে উল্লেখ করে তিনি মন্তব্য করেন, সরকার গঠনের পরে আমরা আবার একটি ভিন্ন চিত্র দেখতে পাচ্ছি, যা এই জাতিকে হতাশ করবে।
সংসদীয় আচরণে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে জামায়াতের এই নেতা বলেন, শুধু সংসদে মুক্তি দিয়ে এটা অর্জন করা যাবে না। এ জন্য সত্যিকার অর্থেই আমাদের মনের পরিবর্তন এবং দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দরকার।
একই সঙ্গে বিরোধী দল হিসেবে দায়িত্বশীল ভূমিকার কথাও তুলে ধরে তিনি বলেন, এখানে আগে যে ঐতিহ্যগুলো ছিল—কিছু হলেই ‘মানি না’, ‘আসব না’, গণ্ডগোল করা—সেটা কিন্তু আমরা করিনি।
‘জুলাই সনদ’ প্রসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, ৩১টি রাজনৈতিক দল একত্রিত হয়ে এটি তৈরি করেছিলাম। কিন্তু পরবর্তী সময়ে কতগুলো বিষয় যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে, তারা তাদের অনুসারী করবে—এটা আমাদের আলোচনার অংশ ছিল না। সেটা ছিল জুলাই সনদের সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা।
গণভোট ইস্যুতেও দ্বিমত তুলে ধরে বিরোধীদলীয় উপনেতা বলেন, আমরা চেয়েছিলাম গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন আলাদাভাবে হোক। কিন্তু বিএনপির পক্ষ থেকে খুব জোরালোভাবে বলা হয়েছিল, গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন একসঙ্গে হতে হবে। আপনাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই আমাদের নারাজি সত্ত্বেও গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন একসঙ্গে হচ্ছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, দেশের জন্য যা কল্যাণকর, তা বাদ দিয়ে যদি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে যা ইচ্ছা তাই করতে থাকেন, তবে এ দেশ আবার পিছিয়ে যাবে।
বিএনপির নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাসের সময়ের অবস্থান নিয়েও বক্তব্য দেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ম্যাডাম (বেগম জিয়া) যখন জেলে ছিলেন, তখন জামায়াত কোনো বিবৃতি দেয়নি—এটা একেবারেই অসত্য। আমরা বারবার বিবৃতি দিয়েছি। শুধু বক্তব্যই নয়, তাঁর মুক্তির জন্য রাজপথে মিছিলও করেছি।
বিইউ/এআর