জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৫৪ পিএম
জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ইতিহাস দেশের মানুষের মতো বিএনপিও নিজেদের বুকের ভেতর ধারণ করে বলে জানিয়েছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, এই ইতিহাস নিয়ে কোনো কটাক্ষ করা হলে তা শুধু রাজনৈতিক দলকে নয়, সংগ্রাম করা লাখো মানুষকেও আঘাত করে।
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে মির্জা ফখরুল এসব বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, বীর বিক্রম।
আলোচনার শুরুতেই জুলাই অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে মির্জা ফখরুল বলেন, "এই অভ্যুত্থান আমাদের বুকের ভেতর ধারণ করা ইতিহাস। এই দেশের প্রতিটি মানুষই এটাকে ধারণ করে। যখন এ নিয়ে কটাক্ষ করা হয়, তখন আমাদের কষ্ট হয়, সেই সঙ্গে কষ্ট পায় সংগ্রাম করা লাখো মানুষ।"
বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর প্রতি ইঙ্গিত করে মির্জা ফখরুল বলেন, "তারা বলছে আমাদের চেহারা বদলে গেছে। কিন্তু না—আমাদের চেহারা বদলায়নি। বরং তারাই হঠাৎ করে বদলে গেছে।" তিনি অভিযোগ করেন, ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কিছু দল ক্ষমতায় যাওয়ার ইঙ্গিত পেয়েছে মনে করে তাদের অবস্থান পাল্টে ফেলেছে।
তার ভাষায়, "তখন তারা যে বক্তব্যগুলো দিয়েছে, সেগুলো গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করেনি। বরং রাজনৈতিক অঙ্গনে দূরত্ব সৃষ্টি করেছে।" তিনি বলেন, নির্বাচনকে ‘ইঞ্জিনিয়ারিং করা হয়েছে’—এমন অভিযোগ জনগণ গ্রহণ করেনি এবং এ ধরনের বক্তব্যই রাজনৈতিক বিভাজন বাড়িয়েছে।
সংবিধান প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব বলেন, দেশের সংবিধান শুধু একটি আইনগত দলিল নয়, এটি জাতির অস্তিত্ব, আবেগ এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের রক্তের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তিনি বলেন, "সংবিধানকে ঠিক রাখার জন্য আমি চেষ্টা করেছি, আমার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দিয়েও সেটা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছি। কারণ এই সংবিধান আমাদের অস্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত।"
তবে তিনি অভিযোগ করেন, সময়ের সঙ্গে সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদ ও অধ্যায় বারবার পরিবর্তন করা হয়েছে। "এই সংবিধানকে কেটে কেটে এমন অবস্থায় আনা হয়েছে যে, একে কাঁটাছেঁড়া পাতার মতো মনে হয়,"—বলেন তিনি।
রাষ্ট্রপতির পদ নিয়ে আলোচনায় মির্জা ফখরুল বলেন, রাষ্ট্রপতি কোনো ব্যক্তি নয়, একটি প্রতিষ্ঠান। তিনি বলেন, "৫ আগস্টের পরে যদি রাষ্ট্রপতির পদ না থাকত, তাহলে রাষ্ট্রে অরাজকতা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি হতে পারত। আমরা সেই প্রতিষ্ঠানটিকে রক্ষা করেছি প্রয়োজনের তাগিদেই।"
বক্তব্যে তিনি স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ভূমিকাও তুলে ধরেন। বলেন, সেই সময় গণহত্যার প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা শুনে বহু মানুষ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন এবং সব বাধা উপেক্ষা করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন।
লন্ডনে অনুষ্ঠিত একটি রাজনৈতিক বৈঠক নিয়েও সমালোচনার জবাব দেন বিএনপি মহাসচিব। তিনি বলেন, ওই বৈঠক নিয়ে ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের অভিযোগ তোলা হয়েছে, যা "অত্যন্ত দুঃখজনক ও অগ্রহণযোগ্য।" তার দাবি, ওই বৈঠকের মাধ্যমেই নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণের ভিত্তি তৈরি হয় এবং দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে সমঝোতা হয়।
তিনি বলেন, "লন্ডন বৈঠক হয়েছিল বলেই আজ আমরা এখানে বসে আছি। ওই বৈঠকেই প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের বিষয়ে সম্মত হয়েছিলেন।"
এছাড়া বিএনপিকে সংস্কারবিরোধী হিসেবে উপস্থাপনের সমালোচনা করে মির্জা ফখরুল বলেন, "আমাদের বিরুদ্ধে বলা হচ্ছে আমরা সংস্কার চাই না। অথচ সংস্কারের জনক তো আমরাই।"
তিনি সার্বিকভাবে রাজনৈতিক সহনশীলতা, গণতান্ত্রিক চর্চা এবং সাংবিধানিক কাঠামো শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে বিভাজন ও পারস্পরিক অবিশ্বাস দূর করে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
টিএই/ক.ম