images

রাজনীতি

হঠাৎ মুখোমুখি ছাত্রদল-শিবির, নেপথ্যে কারণ কী

ঢাকা মেইল ডেস্ক

২৬ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৪৫ পিএম

ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় ঝড়-বৃষ্টির কারণে বিদ্যমান তাপপ্রবাহ কিছুটা কমলেও রাজনৈতিক অঙ্গণের উত্তাপ যেন ক্রমেই বাড়ছে। দেশের ছাত্ররাজনীতিতে অশনি ছায়া। হঠাৎই মুখোমুখি বড় দুই ছাত্রসংগঠন ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির। তাতেই উত্তাপ চরমে। 

গত কয়েকদিন ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে হামলা, সংঘর্ষ ও অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন শাহবাগ থানার ভেতরেও সংঘর্ষে জড়ায় এই দুটি ছাত্র সংগঠন।

এসময় ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের হাতে মারধরের শিকার হন শিবির সমর্থিত ডাকসুর কয়েকজন নেতা। ওই ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন বেশ কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিকও। কিন্তু দুই ছাত্রসংগঠনের এই বিরোধের নেপথ্যে কী?

একটু পেছনে তাকালে দেখা যায়, গত মঙ্গলবার চট্টগ্রামে একটি কলেজে শিবিরকে ইঙ্গিত করে একটি গ্রাফিতিতে ছাত্রদলের ‘গুপ্ত’ শব্দ লেখা নিয়ে দুই ছাত্রসংগঠনের সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহতও হন।

2
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষের সময়ের একটি দৃশ্য। ফাইল ছবি

এর বাইরেও গত কয়েকদিনে দেশের বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল-শিবিরের মধ্যে নানা ইস্যুতে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এর ফলে দীর্ঘদিন পরে আবার অস্থির হয়ে উঠছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। উভয় সংগঠনই একে অপরের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো এবং বিভিন্ন কৌশলে ক্যাম্পাস ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ করছে।

ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব দাবি করেন, মূলত ছাত্রশিবির সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে নানা অপপ্রচার চালাচ্ছে এবং নানা কৌশলে ক্যাম্পাসগুলো নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালানোর কারণেই এই সংকট তৈরি হয়েছে।

এই অভিযোগ অস্বীকার করে শিবিরের সভাপতি নূরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, বিএনপি সরকার গঠনের পর ছাত্রদল এখন ক্যাম্পাসগুলোরও নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইছে। যে কারণে তারা শিবিরের সঙ্গে পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া করার চেষ্টা করছে।

ক্যাম্পাসগুলোর এই পরিস্থিতি নিয়ে কথার লড়াই গড়িয়েছে জাতীয় সংসদেও। 

R
ছাত্রদল সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব

রোববার (২৬ এপ্রিল) বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ সংসদে অভিযোগ করেছেন, ক্যাম্পাসগুলোতে আবারও গণরুম-গেস্টরুম কালচার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে, যে কারণে অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে ক্যাম্পাসগুলো।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন সরকার আসার পর একদল আধিপত্য ধরে রাখতে চাইছে, অন্যদল আধিপত্য ফিরে পেতে লড়াই করছে। যে কারণেই এই সংকট তৈরি হয়েছে।

আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল ছাত্রলীগ। আবাসিক হলগুলোতে ‘গণরুম ও গেস্টরুম কালচার’ প্রতিষ্ঠা করে ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ ছিল ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে।

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কৌশলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অভিযোগও সামনে এসেছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে এতদিন গোপনে থাকা কমিটিও প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। তখন জানা যায়, এতদিন ছাত্রশিবিরের অনেক নেতাকর্মী ছাত্রলীগসহ অন্যান্য দলের ভেতরে গোপনে অবস্থান নিয়ে ছিলেন।

Shibir
ঢাবিসহ পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পায় ছাত্রশিবির

এর ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অনুষ্ঠিত ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনেও শিবির সমর্থিত প্যানেল নিরঙ্কুশ জয় পাওয়ার পর ক্যাম্পাসগুলোতে অনেকটা আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিল ছাত্রশিবির।

গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের পরও ক্যাম্পাসগুলোতে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি ছাত্র রাজনীতির বলয়ে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘নির্বাচনের পর সরকারে আসছে বিএনপি। কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রধান দল ছাত্রশিবির। এখন শিবিরের বদলে ছাত্রদল প্রভাব বিস্তার করতে চাচ্ছে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে সংঘর্ষ হচ্ছে কোথাও কোথাও।’

যদিও এই দাবি খারিজ করে দিয়েছে ছাত্রদল। সংগঠনটির সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলছেন, ‘তাহলে এটা স্পষ্ট যে, ৫ আগস্টের পর শিবির ক্যাম্পাসগুলো দখল করেছে, হলগুলোও দখলে রেখেছে। অথচ শিবির বলে তাদের হলে কার্যক্রম নেই, কমিটি নেই। যদি না-ই থাকে, তাহলে ৬ আগস্ট থেকে ক্যাম্পাস আর হলগুলো কারা দখল করল। তারা সব কিছু দখলে রাখার পরও তারা সেটি স্বীকার করছে না।’

Screenshot_2026-04-26_225711
শিবিরের সেক্রেটারি সিগবাতুল্লাহ

এই প্রশ্নে শিবিরের সেক্রেটারি সিগবাতুল্লাহ বলেছেন, জুলাই বিপ্লবের পর ক্যাম্পাস ও হলগুলো থেকে যে গণরুম গেস্টরুম কালচার বিদায় করেছিল ‘সাধারণ শিক্ষার্থীরা’, সেটি ফিরিয়ে আনতে চায় বলেই এই সংকট তৈরি হয়েছে।

সাধারণ শিক্ষার্থীদের ধারণা নিয়ে প্রশ্ন

বাংলাদেশে এর আগে বিভিন্ন সময় ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গ বা সহযোগী ছাত্রসংগঠনের বিরুদ্ধে ক্যাম্পাস ও হল দখল করার নানা অভিযোগ ছিল। আবার কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্ষমতাসীন দলের বাইরে থাকা সংগঠনেরও হল দখল করার উদাহরণ আছে।

তবে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন সরকার গঠন হলেও ক্যাম্পাসগুলোতে একটি আমূল পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন বিভিন্ন ক্যাম্পাসের আবাসিক হলগুলোতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেনি।

ছাত্রদলসহ কোন কোন ছাত্র সংগঠন আগে থেকেই অভিযোগ করে আসছিল যে, ক্যাম্পাস ও হলগুলোতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পেছন থেকে নিয়ন্ত্রণ করছে ছাত্রশিবির। যে বিষয়টি কখনো প্রকাশ্যে আসছে না।

ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিব বলেন, ‘শুধু আবাসিক হল না, গত দেড় দুই বছরে আমরা দেখেছি ঐতিহ্যবাহী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক সমিতিসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোতেও তারা সাধারণ শিক্ষার্থীর ব্যানারে ঢুকে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। যে কারণে সেই সংগঠনগুলোও নিজেদের মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না।’

saddam4
ছাত্রশিবির সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর ক্যাম্পাসগুলোতে যেই ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’ শব্দটা সামনে আসছে, সেই সাধারণ শিক্ষার্থী নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন সময়ে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাশেদা রওনক খান বলেন, ‘চব্বিশের ৫ আগস্টের পর ক্যাম্পাসগুলো এক ধরনের পরিবর্তন এসেছে। সেখানে ছাত্ররা চেয়েছে যে ক্যাম্পাসের ‘সাধারণ শিক্ষার্থীরা’ কোনো দলের ব্যানারে থাকবে না। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে সাধারণের সংজ্ঞা নিয়ে একটা প্রশ্ন উঠছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা দেখেছি ‘সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের’ ব্যানারে একটা দল প্রভাব খাটাতে শুরু করল। সেখানে স্বাভাবিকভাবে সরকার গঠনের পর সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠন এই জায়গাটাকে প্রশ্নের মধ্যে ফেলেছে। এটাকে কেন্দ্র করেই ক্যাম্পাসগুলোতে এক ধরনের অস্থিরতা বা কিছুটা টানাপোড়েন শুরু হয়েছে।’

তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে ছাত্রশিবিরের সভাপতি সাদ্দাম বলেন, ‘ছাত্রদলের এমন অনেকে আছে তাদের পড়াশোনা শেষ হয়েছে ১০ বছর আগে, তাদের অনেকে দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে হলগুলোতে থাকতে চায়। সেটাতে ‘সাধারণ শিক্ষার্থীরা’ বাধা দিলেই তারা ক্ষেপে যাচ্ছে। শিবিরের ওপর দায় চাপাচ্ছে।’ সূত্র: বিবিসি বাংলা

এএইচ