images

রাজনীতি

আওয়ামী লীগের পতনের কারণ নিয়ে মুখ খুললেন ড. মোমেন

ঢাকা মেইল ডেস্ক

২০ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৫৯ পিএম

দেড় বছর আগে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে তছনছ হয়ে যায় আওয়ামী লীগ সরকারের মসনদ। ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে পালাতে বাধ্য হন সে সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। টানা প্রায় ১৬ বছর রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার পরও দেশের বৃহত্তর দলটির কেন এভাবে পতন হলো, তা নিয়ে মুখ খুললেন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন।

হাসিনা সরকারের সাবেক এই মন্ত্রী বর্তমানে বসবাস করছেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে। সম্প্রতি সেখানে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি বাংলা চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ের কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করেছেন আব্দুল মোমেন।    

সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, কোভিড মহামারি অর্থাৎ করোনার পরে শেখ হাসিনার সঙ্গে তার সরকারের মন্ত্রীদের সাক্ষাতের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত হয়ে গিয়েছিল। জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকার। সেই সঙ্গে কিছু নেতা চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন। এগুলোকেই দলটির পতনের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তিনি।

সাক্ষাৎকারে আব্দুল মোমেন দাবি করেন, টাকা দিলেই আওয়ামী লীগে পদপদবি পাওয়া যেত। জনগণের সঙ্গে দলটির সম্পৃক্ততা একেবারেই কমে গিয়েছিল।

তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকার সরকারি কর্মচারীদের ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ওরা যা বলে তাই করে। একজন মন্ত্রী হিসাবে কিংবা পরবর্তীতে এমপি হিসাবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সুযোগ আমাদের সীমিত হয়ে গেল। কারণ সরকারি অফিসাররা অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেন, একটা না একটা বাহানা দিয়ে তিনারা সহজে (অ্যাপয়েন্টমেন্ট) দেন না। । আর আমরা যারা রাজনীতিবিদ, প্রধানমন্ত্রী মাঝেমধ্যে কোনো জায়গায় বড় বক্তৃতা দেন, আমরা দূরে চেয়ারে বসে থাকি, আর উনি সারমন (ধর্মোপদেশের মতো বক্তৃতা) দেন, আমরা এক পাশে থেকে শুনি। তারপরে যখন উনি বক্তৃতা শেষ করেন, তখন আমাদের রাজনীতিবিদরা ওনার সঙ্গে কথা বলার জন্য সামনে অগ্রসর হলে সেই এসএসএফের লোক ২৫ ফিট দূরে, দূর দূর করে সরায়ে দেয়। ফলে রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনাকে কিছু বলা যে, আমরা কিছু ফিল করি, এই চাঁদাবাজি, এই করাপশন, এগুলো পাবলিক কী মনে করতেছে, সেটা বলার সুযোগ আমাদের কমে গেল।’

আব্দুল মোমেন মনে করেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সবচেয়ে বড় অপরাধ হয়েছে দুটি। একটি হচ্ছে জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ততা কমে যাওয়া, আরেকটি বিভিন্ন শ্রেণির নেতার কাছে চাঁদাবাজিই মুখ্য হয়ে যাওয়া।

সাবেক এই মন্ত্রী দাবি করেন, ‘এগুলো আমি সংসদে তুলেছি। সংসদেও প্রস্তাব দিয়েছি যে, এগুলো বন্ধ করতে হবে। কারণ মানুষ এগুলো পছন্দ করে না। কিন্তু আনফরচুনেটলি আমার দলের নীতি নির্ধারকরা তাতে গুরুত্ব দেয়নি।’

Momen
হাসিনা সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে ড. আব্দুল মোমেন। ফাইল ছবি

মন্ত্রীরাও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে পারতেন না উল্লেখ করে আব্দুল মোমেন বলেন, ‘সব সময় দেখা করতে পারতাম না। কোভিডের আগে যখন আমরা মন্ত্রী হলাম, তখন প্রধানমন্ত্রী প্রত্যেকদিন ক্যাবিনেট মিটিংয়ের পরে সব অফিসারদের বের করে দিতেন, সব ইলেক্টেড রাজনীতিবিদদের রাখতেন। তখন উনি বলতেন, আপনাদের কোনো সমস্যা আছে কি না। তখন আমরা নির্দ্বিধায় আমাদের সমস্যাগুলো বলতাম। তখন উনি উত্তর দিতেন, কাউন্টার হতো। আমরাও কাউন্টার করতাম। কিন্তু কোভিডের পরে মিটিং শেষ হওয়ার সঙ্গেই সঙ্গে উনি বের হয়ে যান। আমরা দৌড়ে গিয়ে কিছু কথা যদি বলতে পারি, সেই সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করি। এই একটা ডিসটেনস (দূরত্ব) শুরু হলো। এই ডিসটেন্সটা পরবর্তীতে আর ঘোচানো যায়নি।’

কোটা সংস্কার আন্দোলনে সরকার ও আওয়ামী লীগের অবস্থান নিয়ে তিনি বলেন, ‘কোটা সম্পর্কে আমাদের প্রত্যেকের ধারণা হলো যে, আওয়ামী লীগ নীতিগতভাবে এই কোটা রেশনালাইজ (যৌক্তিক) পরিবর্তন চায়। আমাদের অনেক সহকর্মী এই নাতিফাতি ওগুলোর জন্য কোটা রাখার পক্ষেই না। ছেলে হইছে, আচ্ছা ছেলে-মেয়ের পর্যন্ত রাখছেন ঠিক আছে, এরপরে আর কী? কিন্তু আমরা এটা পরিবর্তন চেয়েছি এবং এইটা নীতিগতভাবে আওয়ামী লীগও এটা গ্রহণ করেছে। কিন্তু কোথায় লইয়াররা কী একটা কেস-ফেস করে, তারপরে আমি এটা নিয়ে কথা বলেছি। তখন আমাকে বলা হলো, আমরা যেহেতু আপিল করেছি, কোর্টে এটা রায় দেওয়ার। আমি বললাম, কোর্টের রায় দেওয়ার কেস না, এটা তো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। আমি তখন আমার ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম, বলছিলাম আমেরিকাতে ৪০০ বছর কোর্ট এবং জাজেরা স্লেভারিকে (দাসত্ব) প্রটেক্ট (রক্ষা) করেছে কিন্তু। ১৮৬২ খ্রিষ্টাব্দে যখন আব্রাহাম লিংকন ঘোষণা দিলেন, রাজনৈতিকভাবে সিদ্ধান্ত দিলেন যে স্লেভারি ইজ অ্যাবোলিশড, এইটা বাতিল হলো। এরপর কিন্তু কোর্টের কোনো জাজ কোনো কোর্ট স্লেভারিকে প্রটেক্ট করে নাই। সুতরাং ইট ওয়াজ পলিটিক্যাল ডিসিশন। উই শুড টেক পলিটিক্যাল ডিসিশন।’

নেতাদের চাঁদাবাজির পাশাপাশি বড় বড় দুর্নীতির বিষয়েও প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা গিয়েছিল কি না, এ প্রশ্নে আব্দুল মোমেন বলেন, ‘এই কালো কালো টাকা সাদা করা, সেই সব নিয়ে আমি বলেছি, করাপশন নিয়ে, সরকারি কর্মচারীর যে ভরাডুবি করাপশন, সেটা নিয়ে বলেছি। এই প্রজেক্ট ডিলে করে যে করাপশন হয় সেটা আমি বলেছি। ব্যাংকিং ক্ষেত্রে যে একটা নৈরাজ্য, ব্যাংকিংয়ে দু-একটা লোক লাভবান হচ্ছে, যারা এমন লোক, এরা ব্যবসায়ী, আমি চিনিও না ওদের। এদের প্রোটেকশন দেওয়া হয়েছে। আমি এগুলো তুলেছি, আমি তোলার পরে আমাকে বলা হলো, আমরা তো করাপশনে জিরো টলারেন্স দিয়েছি। দুদককে এম্পাওয়ার (শক্তিশালী) করেছি, তারা কাজ করবে, আমি কি প্রত্যেকের কেসের পেছনে পেছনে লেগে থাকব? আমি বলেছি, দু-একটার পেছনে লাগা তো উচিত।’

তিনি বলেন, ‘অনেকেই আমরা দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করি না, খালি প্রশংসা করেই শেষ। আর দোষটা বলতে চাই না। প্রধানমন্ত্রী নিজে বলেন যে আমার পিয়নেরই ১০০ কোটি টাকা। ওনার এক পিয়ন চাঁদাবাজি করে বহু টাকার মালিক হয়ে যায়। সুতরাং অনেক দিন থাকলে যেটা হয় সেটাই। ওই যে বললাম একটা দূরত্ব বেড়েছিল। এগুলো আমাদের অপকর্ম।’

মন্ত্রিসভায় কাদের বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত বলে মনে হয়েছে—এ প্রশ্নে আব্দুল মোমেন বলেন, ‘কোনো রাজনীতিবিদ করাপশন করতে পারে কেবল সরকারি কর্মচারীর সহযোগিতায়, একা পারে না। কারণ প্রজেক্টের টাকার ডিসবার্সমেন্ট অফিসাররা করে। তখন অফিসারের সঙ্গে একটা আঁতাত করতে হবে, অনেক নিচে নামতে হবে, তার সঙ্গে বলতে হবে যে তুমি এটাতে টাকা খাও, এর থেকে অত অংশ আমাকে দাও। সহযোগ ছাড়া আপনি খেতে পারবেন না। একা খাইতে পারবেন না।’

প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালের আগস্ট থেকে ২০১৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশে স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আব্দুল মোমেন। ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি সিলেট-১ আসন থেকে আওয়ামী লীগের টিকিটে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন।

ওই মেয়াদে আব্দুল মোমেনকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করেছিল শেখ হাসিনার সরকার। তিনি পাঁচ বছর দায়িত্ব পালনও করেন। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত দ্বাদশ নির্বাচনেও আব্দুল মোমেন সিলেট-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য হলেও তাকে আর মন্ত্রী করা হয়নি। 

তবে সংসদ সদস্য হিসেবেও বেশিদিন থাকতে পারেননি সাবেক এই পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের হলে রাষ্ট্রপতি জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত করলে অন্যদের আব্দুল মোমেনও সংসদ সদস্য পদ হারান।

আওয়ামী লীগের পতনের পর শেখ হাসিনাসহ তার সরকারের মন্ত্রী, এমপি এবং সরকারি আমলাসহ অনেকেই বিদেশে পালিয়ে যান। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেনও সেই তালিকার একজন। দেশ থেকে পালিয়ে তিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন।    

এএইচ