images

রাজনীতি

মনজুর আলম-হাসনাত সাক্ষাৎ কেন, কী ঘটেছিল গতকাল?

ঢাকা মেইল ডেস্ক

১৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:০৪ পিএম

একসময়ের আওয়ামী লীগ নেতা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মনজুর আলমের বাসায় গিয়ে তার সঙ্গে করেছেন এনসিপি নেতা ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ এবং সেখানে বেশ বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। মঙ্গলবারের (১৪ এপ্রিল) ওই ঘটনা ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

গুঞ্জন উঠেছে, আসন্ন সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে চট্টগ্রাম থেকে মনজুর আলমকে নিজেদের মেয়র প্রার্থী করতে চায় এনসিপি। এখন পর্যন্ত ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনসহ দেশের পাঁচটি সিটি করপোরেশনের জন্য দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেছে তরুণদের এ দলটি।

এনসিপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মিডিয়া সেক্রেটারি ইয়াসির আরাফাত জানান, বাকি সাত সিটি করপোরেশনেও তারা অল্প কিছুদিনের মাঝেই প্রার্থী ঘোষণা করবে। তিনি বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা কমিটি প্রার্থী যাচাই-বাছাইয়ে কাজ করছে। তারা সম্ভাব্য প্রার্থীদের সঙ্গে আলোচনাও করছেন প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে।’

যে সাত সিটি করপোরেশনে এখনো প্রার্থী দেওয়া বাকি রয়েছে, তার মাঝে অন্যতম চট্টগ্রাম। এখন প্রশ্ন হলো, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে মনজুর আলমকে এনসিপি থেকে মনোনয়ন দেওয়া নিয়ে যে গুঞ্জন রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে, তা কতটা সত্যি?

22

কী ঘটেছিল গতকাল

গতকাল অর্থাৎ মঙ্গলবার চট্টগ্রামের কাট্টলি এলাকায় মনজুর আলমের বাসায় সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন হাসনাত আবদুল্লাহ। এই খবর পেয়ে মনজুর আলমের বাসার সামনে ‘জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয়ে কিছু মানুষ জড়ো হয়। পরে মনজুর আলমের বাসা থেকে বের হওয়ার সময় উপস্থিত জনতা হাসনাত আবদুল্লাহকে ঘিরে ধরে নানা প্রশ্ন করে। যার কিছু ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

ওই ভিডিওতে কাউকে কাউকে বলতে শোনা যায়, মনজুর আলম ‘আওয়ামী লীগের দোসর’; হাসনাত আবদুল্লাহ নিজে জুলাই যোদ্ধা, যিনি সংসদে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার কথা বলেছেন; তাহলে তিনি কেন মনজুর আলমের বাসায়, সেটিও জানতে চান তারা হাসনাতের কাছে।

সেখানে ঠিক কী হয়েছিল, সে বিষয়ে জানতে হাসনাত আবদুল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। তবে মুখ খুলেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মনজুর আলম।

তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রামে হাসনাত আবদুল্লাহ সাহেবের একটি প্রোগ্রাম ছিল। তিনি চট্টগ্রামে এসে আমাকে ফোন দিয়েছিলেন দুপুরে। বলেছিলেন আমার বাসায় আসবেন। আমি তাকে দুপুরে খাওয়ার আমন্ত্রণ জানাই।’

33

সাবেক এই মেয়র জানান, ‘বিকেল তিনটার দিকে হাসনাত আবদুল্লাহ তার বাসায় আসেন এবং দুপুরের খাবারও খান। এর কিছুক্ষণ পরে লোকাল কিছু ছেলে বাইরে জড়ো হয়েছিল। পরে হাসনাত আব্দুল্লাহ নিজে গিয়ে তাদের কাছে কথা বলে সাড়ে পাঁচটা ছয়টার দিকে চলে যান।’

জড়ো হওয়া ওই ব্যক্তিদের অনেককে মনজুর আলমকে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ হিসেবে আখ্যা দিতে শোনা যায়। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমার নামে তো কোনো মামলাও নাই। আমি আওয়ামী লীগও করি না। আমি আওয়ামী লীগের দোসর কোথা থেকে হইলাম?’

মনজুর আলম বলেন, ‘আমি তো বিএনপির মেয়র ছিলাম। আমি কী আওয়ামী লীগে যোগ দিছিলাম নাকি? আওয়ামী লীগের তো আমি কিছুই ছিলাম না।’

তিনি জানান, এখানে যারা এসেছিল সবাই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এবং তাদের সবার বাসা তার বাসা ও আশপাশের এলাকায়। ২০১৫ সালের নির্বাচনের পর তিনি রাজনীতি থেকে অবসর নিয়েছেন। এখন তিনি সমাজসেবামূলক কাজের সঙ্গে জড়িত।

তিনি কি আগামীতে এনসিপির হয়ে মেয়র নির্বাচন করতে চান? এমন প্রশ্নের জবাবে সাবেক এই মেয়র বলেন, ‘মানুষ এটা নিয়ে কানাঘুষা করতেছে। আমি তো কাউকে বলি নাই আমি নির্বাচন করব।’

মনজুর আলম ২০১০ সালে বিএনপির সমর্থন নিয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন। ২০১৫ সালেও তিনি সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে বিএনপির সমর্থনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। কিন্তু ওই বছর তিনি ভোট বর্জন করেছিলেন।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, এরপর তাকে আর বিএনপির রাজনীতিতে দেখা যায়নি এবং পরবর্তীতে দুই দফায় জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়ে ব্যর্থ হন।

44

এনসিপি যা বলছে

এনসিপির উত্তরবঙ্গের মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলম বলেন, ‘মনজুর আলমকে এনসিপির মেয়র প্রার্থী করা হবে, এরকম কোনো আলোচনা আমাদের মাঝে হয়নি। হাসনাত আবদুল্লাহ হয়তো তার ব্যক্তিগত জায়গা থেকে দেখা করতে গিয়েছিলেন। যতটুকু শুনেছি, দাওয়াত দিয়েছিল। দলীয় রাজনীতির বাইরেও আমাদের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে ব্যক্তিগত একটা জায়গা (সম্পর্ক) থাকে।’

তিনি বলেন, ‘যখন কোনো দলের বা নেতার সমালোচনা করার মতো যৌক্তিক বিষয় আসে, তখন তাদের বা তার যৌক্তিক সমালোচনা করা হলেও রাজনীতির বাইরেও ওই ব্যক্তির সঙ্গে আলাদা একটা সম্পর্ক থাকে। সেখান থেকেই হয়তো বাসায় দাওয়াতে অংশগ্রহণ করা।’

এনসিপি এই নেতা মনে করেন, এই দেখা করা নিয়ে যা হচ্ছে, তা আসন্ন মেয়র নির্বাচনে চট্টগ্রামে বিএনপির যে সম্ভাব্য প্রার্থীরা, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে করছেন।

তার ভাষায়, ‘উনি (মনজুর আলম) তো এবার বিএনপির নির্বাচনে প্রচারণায় ছিলেন। সেখানে বিএনপির মেয়র ডা. শাহাদাতের সঙ্গে প্রচারণায় ছিলেন। উনি খালেদা জিয়ার দোয়া মাহফিলে ছিলেন। বিএনপি নেতা আমির খসরুর সঙ্গে ছিলেন। সেগুলা নিয়ে তখন ইস্যু হয়নি।’

সারজিস আলম বলেন, ‘ওখানে বিএনপির পটেনশিয়াল মেয়র ক্যান্ডিডেটরা তাদের ইনসিকিউরিটির জায়গা থেকে ইন্টেনশনালি এই সিন ক্রিয়েট করেছে, যে ওনার (মনজুর আলম) সঙ্গে হাসনাতের দেখা হয়েছে ওই উদ্দেশ্যেই (মেয়র নির্বাচন) কি না। উনি (মনজুর আলম) যদি আবার এনসিপির মেয়র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়, তখন তো ওনাদের জেতার চান্স কমে যাবে। তাই সম্ভবত তারা এই ইস্যু ক্রিয়েট করেছে।’

Sarjisww
এনসিপি নেতা সারজিস আলম

এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করায় সমালোচিত হয়েছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা রাজনৈতিক দল এনসিপি, যারা সাধারণত আওয়ামী লীগের রাজনীতির বিরোধিতাই করে থাকে।

কিন্তু একসময় সেই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন, এমন একজনের সঙ্গে এনসিপির শীর্ষ নেতাদের একজনের দেখা করায় দল হিসেবে এনসিপি সমালোচনার মুখে পড়েছে কি না? 

এমন প্রশ্নে সারজিস আলম বলেন, ‘উনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু আমরা দেখলাম যে ওনার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জায়গা থেকে ২০২৬ সালের নির্বাচনে উনি বিএনপির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন।’

তিনি বলেন, ‘আমি জানি না, হয়তো সেই জায়গা থেকেই হাসনাত যখন দেখলো যে উনি বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন বা আমির খসরুর সঙ্গে বসে গল্প করছেন বা বিএনপির মেয়রের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছেন, তাই হয়তো হাসনাত এটা নিয়ে আর চিন্তা করে নাই যে মাঝখানে একসময় উনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিও করেছেন। এটা তো তারাই, মানে বিএনপিই নরমালাইজ করেছে।’

তবে মেয়র প্রার্থী হিসেবে মনজুর আলমকে এনসিপি বিবেচনায় রেখেছে কি না, এ বিষয়ে সারজিস আলম সোজাসাপ্টা কোনো উত্তর দেননি।

তিনি বলেন, ‘উনি বিএনপির রাজনীতিও করেছেন, আওয়ামী লীগের রাজনীতিও করেছেন, সবার সঙ্গে ওনার একটা ভালো সম্পর্ক-বোঝাপড়া আছে, স্থানীয়ভাবেও গ্রহণযোগ্যতা আছে। আমরা মনে করি, ওনার বিরুদ্ধে যদি কোনো প্রমাণিত অপরাধ না থাকে এবং উনি যদি এনসিপির সঙ্গে রাজনীতি করতে চান, ওনার যদি মনে হয় যে উনি ওখানে প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন, তাহলে সেটা উনিও হতে পারেন; আমরা সেটা বিবেচনা করব।’

সারজিস আরও বলেন, ‘এক্ষেত্রে ওনার বিরুদ্ধে বিএনপি যদি এই পলিসিতে না যায় যে, ওনাদের সঙ্গে থাকলে ভালো, আমির খসরু গিয়ে একসঙ্গে মিটিং করবেন; আর ওনাদের সঙ্গে না থাকলে তখন ট্যাগ দিয়ে দেওয়া হবে, এটা তো রাজনৈতিক জায়গা হতে পারে না।’

এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনসিপির একাধিক দায়িত্বশীল ব্যক্তি বলেছেন, মনজুর আলমকে মেয়র প্রার্থী করা নিয়ে এখন পর্যন্ত দলীয় ফোরামে কংক্রিট কোনো আলোচনা হয়নি। কিন্তু ইনফর্মালি দলের মাঝে এটা নিয়ে আলোচনা চলছে।

এএইচ