জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:২২ পিএম
ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বিএনপি সরকার জুলাই বিপ্লবের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। বিএনপি এখন ‘সুবিধাবাদের রাজনীতিতে’ অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। সংসদে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকতে পারে, কিন্তু রাজপথে জনগণই প্রকৃত শক্তি। সেই জনগণকে উপেক্ষা করে টিকে থাকা সম্ভব নয়।
জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা এসব বলেছেন। আজ শনিবার (৪ এপ্রিল) বিকেলে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে আয়োজিত সংক্ষিপ্ত সমাবেশে তারা এসব কথা বলেন।
গণভোটের রায়ের বিরুদ্ধে সরকারি দলের অবস্থানের প্রতিবাদে সমাবেশ শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেট থেকে শুরু হয়ে পল্টন, বিজয়নগর ও কাকরাইল ঘুরে শান্তিনগরে গিয়ে শেষ হয়। এ সময় অংশগ্রহণকারীরা সরকারবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দেন এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি জানান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও সংসদ সদস্য এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, আজ আমি সংসদে গিয়েছি জুলাই বিপ্লবের কারণে, আজ আমি এখানে বক্তব্য দিচ্ছি জুলাই বিপ্লবের কারণে। জুলাই বিপ্লব আমাদের নতুন জীবন দান করেছে। সেই জুলাই বিপ্লবকে অস্বীকার করা মানে নতুন জীবনকে অস্বীকার করা। তিনি অভিযোগ করেন, ভোট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বিএনপি এখন সেই জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে অস্বীকার করছে।
এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, জুলাই বিপ্লব কোনো দলকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য হয়নি। এটি ছিল পুরাতন ও অকার্যকর ব্যবস্থাকে ছুড়ে ফেলে একটি নতুন, জনমুখী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। এই বিপ্লবের মূল লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রক্ষমতা জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া এবং কোনো একক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত না হতে দেওয়া।
গণভোটের প্রসঙ্গে জামায়াত নায়েবে আমির বলেন, আজকে গণভোটকে অস্বীকার করা মানে শুধু ৭০ শতাংশ মানুষের রায়কে অস্বীকার করা নয়; বরং আবার সেই পুরোনো ফ্যাসিবাদী কায়দায় রাষ্ট্র পরিচালনার চেষ্টা করা। দীর্ঘ ১৬ বছরে আমরা এক ব্যক্তির শাসন দেখেছি, যেখানে ভিন্নমত দমন করা হয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষ নিপীড়নের শিকার হয়েছে।
সরকারকে সতর্ক করে এটিএম আজহার বলেন, জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবেন না। আমাদেরকে রাজপথে নামতে বাধ্য করবেন না। সময় থাকতে যদি দেশের কল্যাণ চান, তাহলে গণভোটের রায় মেনে নিন। অন্যথায় এর পরিণতি ভালো হবে না।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক বিএনপির সমালোচনা করে বলেন, দলটি এখন ‘সুবিধাবাদের রাজনীতিতে’ অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এমন কিছু অধ্যাদেশ আছে, যা ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করে—সেগুলো বিএনপির কাছে গ্রহণযোগ্য; কিন্তু জনগণের কল্যাণে নেওয়া উদ্যোগগুলো তারা সমর্থন করে না।
মামুনুল হক বলেন, ‘গণভোটের আগে বিএনপি সুস্পষ্টভাবে কোনো অবস্থান নেয়নি। কিন্তু ভোটের পর তারা জনগণের রায়কে অস্বীকার করছে’। তিনি বলেন, ‘দেশের মানুষ মুনাফিকের রাজনীতি পছন্দ করে না। যদি জনগণের রায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া হয়, তাহলে রাজপথেই তার জবাব দেওয়া হবে।’
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, জনগণের ভোটে সরকার গঠন বৈধ। কিন্তু জনগণের ভোটে সংস্কার হলে তা অবৈধ—এমন দ্বিচারিতা দেশের মানুষ মেনে নেবে না। তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে গঠিত ঐকমত্য কমিশনে সংবিধানের টেকসই সংস্কারের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে এবং সেখানে একটি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল।
আখতার অভিযোগ করেন, গণভোটের আগে পর্যন্ত তারা প্রকাশ্যে বিরোধিতা করেনি। কিন্তু দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর এখন তারা জনগণের রায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর সাহস করছে। গণভোটের মাধ্যমে জনগণ রাষ্ট্রকাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তন চেয়েছে, কিন্তু তা বাস্তবায়নে গড়িমসি করা হচ্ছে।
সংবিধান প্রসঙ্গে আখতার বলেন, দেশ পরিচালনার জন্য সংবিধান প্রয়োজন, কিন্তু সেই সংবিধান কোনো দলীয় সংবিধান হতে পারে না। এটি হতে হবে জনগণের সংবিধান। গণভোট বাস্তবায়িত হলে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আসবে এবং একক কর্তৃত্বের সুযোগ কমে যাবে—যা বর্তমান ক্ষমতাসীনদের পছন্দ নয়।
এনসিপির এই নেতা বলেন, ‘সংসদে আপনাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকতে পারে, কিন্তু রাজপথে জনগণই প্রকৃত শক্তি। সেই জনগণকে উপেক্ষা করে টিকে থাকা সম্ভব নয়।’ একইসঙ্গে তিনি রাজনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আমরা সংঘাত চাই না, আমরা একটি সুন্দর রাজনৈতিক সমাধান চাই।’
সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদ, খেলাফত মজলিশের মহাসচিব ড. আহমাদ আব্দুল কাদের, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির নায়েবে আমির মোখলেসুর রহমান কাসেমী, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ডা. ওমর ফারুক, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহসভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির মহাসচিব নিজামুল হক নাঈম প্রমুখ।
সমাবেশে বক্তারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, গণভোটের রায় দ্রুত বাস্তবায়ন না করা হলে দেশব্যাপী আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। একইসঙ্গে তারা সরকারকে জনগণের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রাজনৈতিক সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
টিএই/ক.ম