images

রাজনীতি

ছায়া মন্ত্রিসভা: বদলাবে কি রাজনীতির ধারা

মিরাজুল ইসলাম

১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০১:২১ পিএম

দেশের রাজনীতিতে ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ নিয়ে যে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে, সেটিকে কেবল একটি সাংগঠনিক বা দলীয় কৌশল হিসেবে দেখলে বিষয়টির গভীরতা ধরা পড়বে না। এটি আসলে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের প্রশ্ন। বিরোধী দল কি শুধু আন্দোলন, বর্জন আর স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি নীতিগতভাবে সরকারকে চ্যালেঞ্জ করবে, সেটিই এখন মূল আলোচ্য।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার নানা পথ খোঁজা হয়েছে। নিকোলা ম্যাকিয়াভেলি মনে করতেন, শাসকের শক্তি নির্ভর করে প্রস্তুতি ও বাস্তবতা বোঝার ওপর।

অন্যদিকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক এরিস্টটল রাষ্ট্রকে দেখেছেন নাগরিক কল্যাণের প্রতিষ্ঠান হিসেবে, যেখানে ক্ষমতার ভারসাম্য না থাকলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে।

এই দুই ভাবনার আলোকে ছায়া মন্ত্রিসভাকে বলা যায় একটি প্রস্তুত বিকল্প শক্তি, যা সরকারকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং হঠাৎ রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় স্থিতিশীলতা আনে।

সংসদীয় গণতন্ত্রে এই চর্চার সবচেয়ে শক্ত উদাহরণ যুক্তরাজ্য। দেশটির পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ House of Commons-এ সরকার ও বিরোধী দল একই সঙ্গে নীতিগত প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। Labour Party (লেবার পার্টি) কিংবা Conservative Party (কনজারভেটিভ পার্টি) সরকারে না থাকলেও প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত মুখপাত্র বা ছায়া মন্ত্রী নিয়োগ করে। একই পদ্ধতি অনুসরণ করছে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও নিউজিল্যান্ড। India ভারতেও আনুষ্ঠানিক কাঠামো না থাকলেও বিরোধী দলগুলো বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের জন্য নির্দিষ্ট মুখপাত্র রাখে। দক্ষিণ আফ্রিকায় (ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স) নিয়মিত ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করে সরকারকে চাপে রাখে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই ধারণা আরও প্রাসঙ্গিক। এখানে বিরোধী রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন ও কর্মসূচিনির্ভর। সংসদে নীতিগত বিতর্ক, গবেষণাভিত্তিক সমালোচনা বা বিকল্প বাজেট দেওয়ার সংস্কৃতি তুলনামূলক দুর্বল। ফলে সরকার কার্যত একমুখী হয়ে পড়ে, আর জনগণ শক্তিশালী বিকল্প কণ্ঠস্বর থেকে বঞ্চিত হয়।

আরও পড়ুন

ছায়া মন্ত্রিসভা কী?

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের ঘোষণা রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। যদি সত্যিকার অর্থে প্রতিটি খাতে দক্ষ ও জ্ঞানভিত্তিক নেতৃত্ব গড়ে তোলা যায়, নিয়মিত গবেষণা ও নীতিপ্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়, তাহলে বিরোধী দল কেবল সমালোচক নয়, সম্ভাব্য বিকল্প সরকার হিসেবেও নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। এতে ক্ষমতার পালাবদল হলেও প্রশাসনিক শূন্যতা কমবে এবং ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে।

তবে সতর্কতার জায়গাও আছে। কেবল নামমাত্র পদবণ্টন করে ছায়া মন্ত্রিসভা সাজালে এর কোনো মূল্য থাকবে না। এটি কার্যকর করতে হলে সংসদে সক্রিয় উপস্থিতি, তথ্যভিত্তিক সমালোচনা, জনস্বার্থে স্পষ্ট অবস্থান এবং নিয়মিত নীতিগত প্রস্তাব তুলে ধরতে হবে। না হলে এটি কাগুজে উদ্যোগেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

সব মিলিয়ে, ছায়া মন্ত্রিসভা বাংলাদেশের রাজনীতিকে সংঘাতনির্ভরতা থেকে নীতিনির্ভরতার দিকে নিতে পারে। সরকার ও বিরোধী দল যদি প্রতিযোগিতাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, নীতিগত বিতর্কে সীমাবদ্ধ রাখে, তাহলে গণতন্ত্র আরও পরিণত হবে এবং জনগণই হবে সবচেয়ে বড় উপকারভোগী।

এমআই/জেবি