images

রাজনীতি

আত্মবিশ্বাসী বিএনপি, স্বপ্ন বুনছে জামায়াত

বোরহান উদ্দিন

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:১৬ এএম

রাজধানীর অভিজাত এলাকা থেকে শুরু করে অলিগলি, চরাঞ্চল ও পাহাড়ের দুর্গম জনপদ—সব জায়গায় পড়েছে নির্বাচনের ছোঁয়া। কোথাও সাবেক রাজনৈতিক মিত্রদের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ, কোথাও আবার সম্প্রীতির নতুন আহ্বান। একদিকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। আবার তরুণ তুর্কি নাহিদ-সারজিসদের ভাগ্যও নির্ধারিত হবে বৃহস্পতিবারের ব্যালটে। কার কতটা জনপ্রিয়তা, কে আনতে পারেন নতুনত্বের চমক—তা নিয়ে দেশজুড়ে টানটান উত্তেজনা। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর একটি প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের সম্ভাবনা প্রধান দলগুলোর মধ্যে তৈরি করেছে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য।

বিশেষ করে একাধিকবার রাষ্ট্র পরিচালনা করা বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে জনসমর্থনের ভিত্তিতে রাষ্ট্রক্ষমতায় ফেরার প্রবল আত্মবিশ্বাস দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা জামায়াতে ইসলামী নতুন মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে বৃহত্তর মোর্চার মাধ্যমে দেশ পরিচালনার স্বপ্ন দেখছে। দলগুলোর নেতাদের দেশজুড়ে নির্বাচনী প্রচারণা ও বক্তব্যে এমন ইঙ্গিতই মিলেছে।

বিএনপির রাজনীতি এখন মূলত জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং রাষ্ট্র সংস্কারের অঙ্গীকারকে ঘিরে। দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচনী প্রচারণায় দেওয়া বক্তব্যে ইতিবাচক ও আত্মবিশ্বাসী সুর বজায় রেখেছেন। তাঁর বিশ্বাস, বিগত বছরগুলোতে দলের নেতা-কর্মীদের ত্যাগ এবং সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা আগামী নির্বাচনে ব্যালটের মাধ্যমে প্রতিফলিত হবে।

picture

বিএনপি নেতারা বলছেন, তাদের এই আত্মবিশ্বাসের মূল ভিত্তি দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত জনভিত্তি। দলটির হাইকমান্ড মনে করছে, অবাধ ও নিরপেক্ষ ভোট হলে দেশের বৃহত্তর অংশ বিএনপির ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে রায় দেবে। পাশাপাশি আগামীর বাংলাদেশ গড়ার রূপরেখাও ছিল তাদের প্রচারণার কেন্দ্রবিন্দুতে। তারেক রহমানের বারবার উচ্চারিত জনগণের ক্ষমতায়ন তৃণমূল কর্মীদের মধ্যে সুদৃঢ় আস্থার সৃষ্টি করেছে বলে দাবি বিএনপি নেতাদের।

আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হওয়ার পর তারেক রহমান থেকে শুরু করে দলের প্রার্থী, নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা ধানের শীষের পক্ষে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছেন। গত ২২ জানুয়ারি সিলেটের হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.)–এর মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে তিনি নির্বাচনী প্রচার শুরু করেন। এরপর প্রতিদিন সারাদেশে দলের প্রার্থীদের পক্ষে ৪৩টি পথসভায় বক্তব্য রাখেন। সবশেষ রাজধানীতে দুই দিনে ১৫টি জনসভা করার পর মা-বাবার কবর জিয়ারতের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারণা শেষ করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।

সোমবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে অতীতের ভুলত্রুটির জন্য দুঃখ প্রকাশ করে তিনি ধানের শীষে ভোট চান। তিনি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি সারাদিন ধানের শীষে ভোট দিন, তারুণ্যের প্রথম ভোট ধানের শীষের জন্য হোক।

দলীয় প্রধানের সঙ্গে সুর মিলিয়ে নেতারাও বলছেন, এবারের নির্বাচনে ধানের শীষের ভূমিধস বিজয় হবে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন নিয়ে সরকার গঠন করবে বিএনপি।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান বলেন, আমরা আত্মবিশ্বাসী যে, ইনশাআল্লাহ বাংলাদেশের মানুষের রায় আমরা পাব। আমরা এককভাবে সরকার গঠন করতে সক্ষম হব।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এবারের নির্বাচনে চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স ও কাউন্টার ব্যালেন্স সঠিকভাবে থাকায় তথাকথিত নির্বাচন প্রকৌশলের আশঙ্কা নেই। বিএনপি ভূমিধস জয় পাবে বলে আমরা আশাবাদী।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ গণতন্ত্র উত্তরণে বিএনপির ওপর আস্থা রেখেছে। ১২ ফেব্রুয়ারি তার প্রতিফলন দেখা যাবে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশে পুনরায় গণতন্ত্রের উত্থান ঘটবে বলে আমরা আশা করি।

বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিনের দাবি, সারা দেশে বিএনপির পক্ষে যে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে, তাতে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হলে নিরঙ্কুশ বিজয় অনিবার্য।

বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আগামীর কল্যাণরাষ্ট্র গঠনে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নেতৃত্ব দেবেন।

picture

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী এবারের নির্বাচনকে দেখছে নিজেদের নতুনভাবে প্রমাণের সুযোগ হিসেবে। দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ শীর্ষ নেতারা সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে কথা বলছেন। এতদিন জামায়াতকে বড় কোনো দলের সহযোগী হিসেবে দেখা হলেও এবার ১১ দলীয় একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে নিজেদের সক্ষমতার পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করেছে দলটি।

তবে ইসলামী দলগুলোর ভোট এককভাবে একীভূত না হওয়ায় প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন হতে পারে বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে। বিশেষ করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ভোট যদি এক প্ল্যাটফর্মে আসত, তাহলে ১১ দলীয় জোটের পরিস্থিতি আরও অনুকূলে আসতে পারত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, মানুষ আর নতুন কোনো স্বৈরাচারকে ক্ষমতায় দেখতে চায় না। জামায়াত ক্ষমতায় গেলে তা দলের সরকার হবে না, ১৮ কোটি মানুষের সরকার হবে। তাই একবার সুযোগ দিন।

নির্বাচনের প্রাক্কালে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, জামায়াত সবাইকে নিয়ে ঐক্যের বাংলাদেশ গড়তে চায়। এমন বাংলাদেশ, যেখানে কেবল পারিবারিক পরিচয়ে কেউ দেশের চালকের আসনে বসতে পারবে না; রাষ্ট্র হবে সবার, সরকার হবে জনগণের।

বিইউ/এআর