images

রাজনীতি

ঢাকা-৩: লড়াই হবে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার

মোস্তফা ইমরুল কায়েস

০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:২৭ পিএম

রাজধানীর অদূরে ঢাকা-৩ আসনে এবার ভোটের সমীকরণ কিছুটা ভিন্ন। কে হবেন এ আসনের প্রতিনিধি, তা নিয়ে ভোটারদের মধ্যে স্পষ্ট ধারণা এখনো তৈরি হয়নি। দীর্ঘ ১৭ বছর ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে না পারা অনেক ভোটার বলছেন, এবার প্রার্থী নয়, প্রতীক দেখেই ভোট দেবেন। আবার কেউ কেউ গুরুত্ব দিচ্ছেন প্রার্থীর অতীত কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক পরিচ্ছন্নতাকে। 

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। অন্য দলগুলোর পক্ষে উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করা কঠিন হবে বলে মনে করছেন ভোটারদের একটি বড় অংশ। নির্বাচনের আর মাত্র ৮ দিন বাকি থাকলেও এখনো অনেক ভোটার প্রকাশ্যে তাদের পছন্দের কথা বলছেন না। ফলে ভোটের হিসাব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় জটিল হয়ে উঠেছে।

সম্প্রতি এই আসনের কদমতলী, জিনজিরা, বান্ডছাট গাঁও, বাসস্ট্যান্ড ও চুনকুটিয়া চৌরাস্তা (হিজলতলা বাজার) ঘুরে লোকজনের সঙ্গে কথা বলে এমন সব তথ্য উঠে এসেছে ঢাকা মেইলের সরেজমিন প্রতিবেদনে।

ঢাকা-৩ আসনটি জিনজিরা, শুভাঢ্যা, আগানগর, তেঘরিয়া ও কোন্ডা—এই পাঁচ ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। এ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৬২ হাজার ১৫৯ জন। ভোটারের সংখ্যায় পুরুষরা এগিয়ে থাকলেও সনাতন ধর্মাবলম্বী ভোটারও কম নয়—সংখ্যা প্রায় অর্ধলক্ষ। ফলে তাদের ভোট নিয়েও চলছে নানা হিসাব-নিকাশ।

1

সরেজমিনে যা মিলেছে

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এবার এই আসনে বিএনপির হয়ে লড়ছেন গয়েশ্বর রায়। এর আগে আমানুল্লাহ আমান টানা চারবার এমপি হওয়ায় তিনি দল থেকে মনোনয়ন চেয়েও পাননি। পরে ২০০৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী, সাবেক জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের কাছে পরাজিত হন। এবার গয়েশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত নেতা শাহীনুর ইসলাম। শাহীনুরকে লোকজন খুব একটা চেনেন না বললেই চলে। তবে সবাই জানেন, দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে একজন প্রার্থী দাঁড়িয়েছেন।

কদমতলী, জিনজিরা, তেঘরিয়া ও কোন্ডা এলাকার মোড়ে মোড়ে গয়েশ্বরের পাশাপাশি শাহীনুরের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের ব্যানার দেখা গেছে। তবে নির্বাচনের আগাম কোনো পোস্টার চোখে পড়েনি। যদিও গত এক বছর ধরে গয়েশ্বর মাঠে সক্রিয় রয়েছেন।

এই আসনের অতীত ইতিহাস ও স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১—এই তিন নির্বাচনে টানা বিএনপি জয়ী হয়েছিল। আসনটিতে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিলেন বিএনপি নেতা আমানুল্লাহ আমান। কিন্তু তার জনপ্রিয়তাই আওয়ামী লীগের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। তাকে সরিয়ে প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে হাসিনা সরকার আসনটি ভেঙে দুই ভাগ করে ঢাকা-২ ও ঢাকা-৩ গঠন করে। বর্তমানে আমান লড়ছেন ঢাকা-২ আসনে।

২০০৮ সালে ঢাকা-৩ আসনটি দখলে নেয় আওয়ামী লীগ। এতে বিএনপির ভোটব্যাংকে কিছুটা ভাটা পড়ে। তবে দলটি মাঠ ছাড়েনি। হাসিনা সরকারের ভোট ডাকাতি, জালিয়াতি ও রাতের ভোটের কারণে বিএনপি সুবিধা করতে পারেনি। তবুও আশা ছাড়েনি তারা। এবার তাদের প্রত্যাশা ছিল ভিন্ন। কিন্তু সেই প্রত্যাশার গুড়ে বালি ঢেলেছে জামায়াতে ইসলামী।

2

এই আসনে জামায়াত আগে কখনো প্রার্থী দেয়নি, কারণ তারা বিএনপির সঙ্গে জোটে ছিল। এবার তারা প্রার্থী দিয়েছে। প্রার্থী পরিচিত মুখ না হলেও অনেকে তাকে ভোট দেওয়ার কথা বলছেন। ইতিমধ্যে তারা আসনটিতে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। ফলে বিএনপি কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে। কে কতটা জনপ্রিয়, তা স্পষ্ট হবে আগামী ১২ তারিখের ভোটে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও ভোটাররা যা বলছেন

গত বৃহস্পতিবার বিকেলে কদমতলীর চুনকুটিয়া চৌরাস্তার একটি চায়ের দোকানে কথা হয় আসাদুলের সঙ্গে। চা-দোকানি আসাদুল রাজনীতি নিয়ে বেশ সচেতন। তিনি বলেন, এবার গয়েশ্বরের এমপি হওয়া কঠিন। হলেও জামায়াতের সঙ্গে কঠিন লড়াই করেই জয়ী হতে হবে। মানুষ এত সহজে বিএনপিকে ভোট দেবে না। এখন হিসাব অনেক।

তার দোকানে বসা দুই ক্রেতার একজন রিবন বলেন, গত বছরগুলোতে মানুষ ভোট দিতে পারেনি। এবার মানুষ হাত খুলে ভোট দেবে, তবে প্রার্থী নয়—প্রতীক দেখে। পাশে বসা জিয়ান বলেন, মানুষ এখন অনেক সচেতন। চোখ-কান খোলা। তারা সঠিক প্রার্থীকেই বেছে নেবে।

কদমতলী মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা অটোচালক রশিদুল বলেন, অনেক কিছু দেখেছি। এবার একটু ভিন্নভাবে ভাবছি। কী ভাবছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেটা ১২ তারিখে জানাব। তিনি জানান, তার পরিবারে ১২টি ভোট রয়েছে। তারা হিসাব-নিকাশ করেই ভোট দেবেন।

তারা জানান, গত ১৫ দিন ধরে প্রার্থীদের লোকজন এসে লিফলেট দিচ্ছেন ও ভোট চাইছেন। কিন্তু তারা এখনো কাউকে কথা দেননি। আরও কয়েক দিন দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন। কারণ হিসেবে বলেন, আগে যাদের ভোট দিয়েছেন তারা পালিয়ে গেছে। কেউ কেউ ক্ষমতায় আসার আগেই দাপট দেখাচ্ছে। এসব বিষয় তারা ভালোভাবে নিচ্ছেন না।

0

তারা আরও বলেন, সম্প্রতি জামায়াতের প্রার্থীর ওপর হামলার খবর পেয়েছেন, যা রাজনীতির জন্য ইতিবাচক নয়।

তারা জানান, আসনটিতে প্রায় অর্ধলক্ষ হিন্দু ভোটারের ভোট পেতে প্রার্থীরা বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন। তবে এবার হিন্দু ভোটে পরিবর্তন আসতে পারে। তাদের অর্ধেক ভোট গয়েশ্বরের বাক্সে, আর বাকি ভোট জামায়াতের ঘরে যেতে পারে—এমন আলোচনা রয়েছে।

এবার ভোটের আমেজ তেমন নেই বলে জানান তারা। মিছিল নেই, মিটিং নেই, চায়ের দোকানে ভিড় নেই। পোস্টার না থাকায় তারা বরং খুশি।

ভোট বেড়েছে জামায়াতের

স্থানীয়দের মতে, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে আবু হাসেম নামে এক জামায়াত নেতা প্রার্থী হলেও খুব কম ভোট পেয়েছিলেন। তবে এবার জামায়াতের ভোটব্যাংক বেড়েছে। জুলাই আন্দোলনে ভূমিকা, গত ১৭ বছরে দলটির ওপর নির্যাতনের কারণে অনেকের সহানুভূতি তৈরি হয়েছে।

জিনজিরার জমির আলী বলেন, আগে মানুষ জামায়াতকে ভোট দিত না। এবার চিত্র ভিন্ন। তার এলাকায় অনেকেই জামায়াতকে ভোট দেওয়ার কথা বলছেন।

বিএনপির ওপর অনেকে ক্ষুব্ধ কেন

কেরানীগঞ্জের বান্ডছাট গাঁও বাস রোডের শহীদ মিনারের পাদদেশে স্থানীয়রা বলেন, ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী বিএনপিতে আশ্রয় নিয়েছেন। বিষয়টি ভোটাররা ভালোভাবে নিচ্ছেন না। এতে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

চায়ের দোকানি সিরাজ বলেন, আমরা যাদের কারণে ১৭ বছর ভোট দিতে পারিনি, বিএনপির নেতারা এখন তাদের সঙ্গেই ঘোরেন। এতে আমরা ক্ষুব্ধ।

4

স্থানীয়দের অভিযোগ, সাবেক চেয়ারম্যান শাহীনের ঘনিষ্ঠ ফারুক মোল্লা এখন বিএনপির আশ্রয়ে রয়েছেন। এতে বিরক্ত অনেকেই। তারা আশঙ্কা করছেন, এর প্রভাব নির্বাচনে পড়বে।

এছাড়া এলাকায় চাঁদাবাজির অভিযোগও রয়েছে। তারা আরও জানান, আওয়ামী লীগের অনেক নেতা পালিয়ে গেলেও দলটির বিপুল ভোটার এখনো সক্রিয়ভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।

কদমতলীর চুনকুটিয়া এলাকায় দুই ভোটার বলেন, তারা এবার বিএনপিকে ভোট দেবেন না, জামায়াতকে দেবেন। তাদের যুক্তি, জামায়াতকে ভোট দিলে তারা নিরাপদ থাকবেন।

যারা লড়ছেন এই আসনে

এই আসনে বিএনপি ও জামায়াত ছাড়াও স্বতন্ত্র প্রার্থী মনির হোসেন, জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকে মো. ফারুক, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকে মো. সুলতান আহম্মদ খান, গণফোরামের মুহাম্মদ রওশন ইয়াজদানী, বাসদের মুজিবুর হাওলাদার, গণসংহতির বাচ্চু ভুঁইয়া, বাংলাদেশ কংগ্রেসের মোহাম্মদ জাফর এবং গণঅধিকার পরিষদের মোহাম্মদ সাজ্জাদ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে মাঠে ও মোড়গুলোতে মূলত বিএনপি, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীদের ব্যানারই চোখে পড়েছে।

এমআইকে/এআর