images

রাজনীতি

ঢাকা-৬: ইঞ্জিনিয়ার বনাম ডক্টরের লড়াই

বোরহান উদ্দিন

০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:৪৮ পিএম

  • প্রধান ইস্যু নাগরিক সমস্যা
  • প্রতিশ্রুতির প্রতিযোগিতায় প্রার্থীরা
  • ঝুঁকি ও চাঁদাবাজিমুক্ত এলাকা গড়তে চান ইশরাক
  • নিরাপদ পুরান ঢাকা গড়ার ভাবনা মান্নানের
  • আ.লীগের নীরব ভোটের দিকে চোখ প্রার্থীদের

অন্যান্য আসনের মতো ঢাকা–৬ আসনেও বিরাজ করছে নির্বাচনি উত্তাপ। পুরান ঢাকার সরু গলি, ঘিঞ্জি এলাকায় দিনভর প্রচারণা-গণসংযোগে ব্যস্ত প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকরা। সুত্রাপুর, ওয়ারী, গেন্ডারিয়া ও কোতোয়ালি (আংশিক) থানা নিয়ে গঠিত এই আসনের সাধারণ ভোটারদের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে যতটা আলোচনা তার চেয়ে আপেক্ষ অনেকটা বেশি। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, নির্বাচন এলে প্রার্থীরা প্রতিশ্রুতি দেন, কিন্তু যানজট, গ্যাস সংকট থেকে শুরু করে নাগরিক জীবনের কোনো পরিবর্তন আসে না। তাই আসছে নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা প্রার্থী বাছাইয়ে ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে চান।

ভোটাররা যখন ভোটের হিসাব-নিকাশ করছেন তখন প্রার্থীরাও ভেবেচিন্তে বাস্তবসম্মত প্রতিশ্রুতি দেওয়ার চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি ভোটারদের দ্বারে দ্বারে পৌঁছাতে লাগামহীন প্রচারণা চালাচ্ছেন প্রার্থীরা।

এলাকার নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে ও সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, সারাদেশের মতো রাজধানীর এই গুরুত্বপূর্ণ আসনেও নির্বাচনি লড়াই জমে উঠেছে।

তবে একাধিক প্রার্থী থাকলেও আলোচনায় বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ড. আব্দুল মান্নান। দুই ভিন্ন দল এবং পেশাগত ভিন্নতার দুই প্রার্থীকে নিয়েই চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

অন্যদিকে এই আসনে আওয়ামী লীগের নীরব ভোটার যারা তারা শেষ পর্যন্ত কোনদিকে যাবেন, কাদের ভোট দেবেন তা জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে মনে করছেন স্থানীয়রা। প্রার্থীদের পক্ষ থেকেও এমন ভোটারদের দিকে নজর রাখা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

এই আসনে এর বাইরেও জাতীয় পার্টির আমির উদ্দিন আহমেদ (ডালু), গণফ্রন্টের আহম্মেদ আলী শেখ, বাংলাদেশ মুসলিম লীগের মো. আকতার হোসেন, বাংলাদেশ কংগ্রেসের মো. ইউনুস আলী আকন্দ প্রার্থী হয়েছেন। এছাড়াও গণঅধিকার পরিষদের মো. ফখরুল ইসলাম প্রার্থী হলেও এখন বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছেন।

তবে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থী ছাড়া বাকিদের আলোচনা নেই বললেই চলে। কয়েকজন প্রার্থী তো এলাকায় অপরিচিত।

নাগরিক দুর্ভোগই ভোটের প্রধান ইস্যু

প্রায় তিন লাখ ভোটারের এই আসনে নির্বাচনি ইশতেহারের চেয়ে বাস্তব জীবনের সংকটই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে গ্যাস সংকট, বছরের পর বছর ধরে চলা সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি, ভয়াবহ যানজট, ঝুঁকিপূর্ণ পুরোনো ভবন এবং চাঁদাবাজির অভিযোগ নিত্যদিনের। বছরের পর বছর এমন সমস্যা নিয়ে নাগরিকরা চললেও কেউ যেন দেখার নেই।

লক্ষ্মীবাজার এলাকার একজন নারী ভোটার ক্ষোভের সঙ্গে ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘নির্বাচন এলেই সবাই আশ্বাস দেয়। ভোট শেষ হলে আর কাউকে দেখা যায় না। সকাল ছয়টায় গ্যাস চলে যায়, আসে রাত বারোটায়। এমন করে তো জীবন চালানো কঠিন। দীর্ঘদিন ধরে এমনটা চলছে। কারও কাছে সমাধান নেই?’

গেন্ডারিয়ার বাসিন্দা আব্দুল মালেক ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘বড় বড় উন্নয়নের গল্প লাগবে না, নিয়মিত গ্যাস চাই, চলার মতো রাস্তা চাই। বছরের পর বছর শুধু আশ্বাসই শুনে যাচ্ছি। এসব আর ভালো লাগে না।’

শাঁখারীবাজারের এক ব্যবসায়ী জানান, রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি আর যানজটে আমাদের ব্যবসা শেষ। কভার্ড ভ্যান দিয়ে বছরের পর বছর রাস্তা বন্ধ করে রাখা হয় কেউ সমাধান করে না। এবার যে এমপি আসবে, সে যেন অন্তত এসব কাজে নজর দেয়।

Ishrak

এলাকার এক তরুণ ভোটার বলেন, ইশরাক হোসেন সাদেক হোসেন খোকার ছেলে, এটা সবাই জানে। আমরা চাই তিনি সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এলাকায় বাস্তব কাজ করে দেখাবেন। অন্যদের মতো প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ থাকবেন না।

ইশরাকের ভাবনায় নিরাপদ পুরান ঢাকা

ইশরাক হোসেন ঢাকা-৬ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হলেও তিনি গণ্ডির বাইরেও বেশ পরিচিত। বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটির সদস্য ইশরাক ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকার ছেলে। ফলে ঢাকাজুড়ে তার একটি পরিবারিক রাজনৈতিক পরিচয়ও রয়েছে।

একইসঙ্গে তার পরিচিতির আরেকটি কারণ হলো ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদ নিয়ে। ২০২০ সালের নির্বাচনে তিনি ভোটে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে আদালতের রায়ের মাধ্যমে সেই নির্বাচনের ফলাফল সংশোধনের দাবি করেন। আদালত তাকে মেয়র হিসেবেও ঘোষণা করে একটি রায় দিয়েছিল, যদিও আইন অনুযায়ী শপথ গ্রহণ না করায় মেয়রের চেয়ারে বসতে পারেননি। এ নিয়ে তুমুল আন্দোলনও হয়েছে ঢাকায়।

ইশরাকের কর্মী সমর্থকদের দাবি, রাজনৈতিক পরিবারের বেড়ে ওঠার পাশাপাশি দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমে তিনি নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেছেন। যা নির্বাচনে সুফল বয়ে আনতে সহায়ক হবে।

এদিকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখে ইশরাক তার প্রচারণায় নগর ব্যবস্থাপনার বিষয়টি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তার প্রচারণার মূল বার্তা- ঝুঁকিমুক্ত ও চাঁদাবাজিমুক্ত পুরান ঢাকা।

ইশরাক হোসেন বলেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া পুরান ঢাকার সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। উন্নয়ন করতে হবে, তবে এই এলাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ করেই। গ্যাস সংকট নিরসন, সড়ক ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে পরিকল্পিত পুনর্গঠনের কথাও তিনি তার প্রচারণায় তুলে ধরছেন।

শিক্ষকতা থেকে বিকল্প নেতৃত্বের প্রত্যাশা মান্নানের

জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ড. আব্দুল মান্নান দীর্ঘদিন শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত থাকায় প্রচারণায় শিক্ষা, নৈতিকতা ও সুশাসনের বিষয়টিতে জোর দিচ্ছেন। তিনি নিজেকে একটি ‘পরিষ্কার ও বিকল্প নেতৃত্ব’ হিসেবে উপস্থাপন করতে প্রাণপণ চেষ্টা করছেন।

জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য এবং ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ শাখার সহকারী সেক্রেটারি ড. আব্দুল মান্নান প্রচারণায় এসব নিয়ে সরব রয়েছেন। তিনি বলছেন, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও মাদক বন্ধ করাই আমাদের অগ্রাধিকার। তিনিও পুরান ঢাকাকে নিরাপদ ও বসবাসযোগ্য করতে চান। তার দাবি, শিক্ষিত ও নৈতিক নেতৃত্বের বার্তা ভোটারদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলছে।

Mannan

সুত্রাপুরের একজন ভোটার তার প্রত্যাশার কথা জানিয়ে ঢাকা মেইলকে বলেন, আমরা এমন একজন মানুষ চাই, যিনি দুর্নীতির সঙ্গে আপস করবেন না। কথা কম, কাজ বেশি করবেন তাকেই সংসদ সদস্য নির্বাচিত করতে চাই।

জোট রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ

এদিকে খুব প্রভাব না থাকলেও এই আসনের নির্বাচনি সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে গণঅধিকার পরিষদের সিদ্ধান্ত। দলটির প্রার্থী মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ইশরাক হোসেনকে সমর্থনের ঘোষণা দিয়েছেন। শুক্রবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৪৩ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায় গণসংযোগকালে তিনি এ ঘোষণা দেন।

ফখরুল ইসলাম বলেন, দলীয় সভাপতি নুরুল হক নুরের নির্দেশনা অনুযায়ী এখন থেকে গণঅধিকার পরিষদ ও এর অঙ্গসংগঠনগুলো বিএনপির পক্ষে মাঠে কাজ করবে। পরে দুই পক্ষের নেতাকর্মীদের একসঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগে অংশ নিতে দেখা যায়।

ফ্যাক্টর হতে পারে আওয়ামী লীগের নীরব ভোট

এদিকে গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগের থানা, ওয়ার্ড পর্যায়ের পদধারী কোনো নেতাকর্মী এলাকায় নেই। অন্যদিকে নির্বাচনে ভোট না দিতে কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে আওয়ামী লীগ থেকে। এরমধ্যেও এলাকার আওয়ামী লীগ সমর্থক, তাদের নীরব ভোটাররা কি করবেন তা এখনো পরিষ্কার না হলেও অনেকেই কেন্দ্রে যাবেন প্রার্থীরাও এমনটা ধরে নিয়েছেন।

আলোচনা হচ্ছে, একাধিকবার এই আসনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ছিলেন। মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ সংসদ নির্বাচিত হয়েছেন। আর এই আসনে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংকও আছে। আসছে নির্বাচনে এই নীরব ভোট জয়-পরাজয়ে বড় ভূমিকা রাখবে এমনটাই মনে করা হচ্ছে।

স্থানীয় বিএনপির একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সাধারণ কর্মীরা এলাকায় আছেন। তারা সবাই না হলেও বেশির ভাগ ভোট দেবে এটা নিশ্চিত। সেসব ভোট যাতে ধানের শীষে যায় সেটা কীভাবে নিশ্চিত করা যায় এটা ভাবতে হবে।’

বিইউ/জেবি