আব্দুল হাকিম
০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৬:৩১ পিএম
সারাদেশের মতো ঢাকা-১৫ আসনেও ভোটের লড়াই জমে উঠেছে। এখানে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং বিএনপির শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন। নির্বাচনি প্রচারের শুরু থেকেই উভয় দলের নেতাকর্মীরা মাঠে সক্রিয়। দলীয় প্রধান হিসেবে জামায়াতের প্রার্থী কিছুটা সুবিধা পেলেও স্থানীয় ব্যক্তি, পরিচিতি এবং কার্যক্রমের কারণে বিএনপির প্রার্থীও শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে সামনে এসেছেন।
ভোটাররা এবার দল নয়, প্রার্থীর ব্যক্তিগত পরিচিতি, কার্যক্রম এবং বাস্তব পদক্ষেপকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। শেওড়াপাড়া, তালতলা, কাজীপাড়া ও মিরপুর এলাকার ভোটাররা বলছেন, আগের মতো আবেগনির্ভর ভোট আর হবে না; এবার প্রার্থীর মাঠে উপস্থিতি, বাস্তব পরিকল্পনা এবং প্রতিশ্রুতিই প্রভাবক হবে। দলীয় সমর্থনের দিক থেকেও পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জপূর্ণ। বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা দীর্ঘদিন এলাকার সঙ্গে পরিচিত এবং তা ভোটে সুবিধা হিসেবে প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে জামায়াতও দলীয় ও জোটভিত্তিক শক্তিশালী সমর্থন এবং অভিজ্ঞ নেতাদের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে পৌঁছাচ্ছে। ভোটারদের প্রত্যাশা, প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা এবং নির্বাচনি আচরণবিধি মানার বিষয়গুলোও শেষ পর্যন্ত ফলাফলকে প্রভাবিত করবে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ঢাকা-১৫ আসনের জয় নির্ভর করবে ভোটের শেষ মুহূর্তের হিসাবের ওপর। দলের সুবিধা, স্থানীয় পরিচিতি এবং মাঠে মানুষের উপস্থিতির সমন্বয়ই নির্ধারণ করবে কে আসল জয়ী হবেন। ফলে এই আসনে শেষ পর্যন্ত ভোটের ফলাফল কেবল নির্দিষ্ট সুবিধা বা জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর করবে না, বরং শেষ মুহূর্তের ভোটিং এবং ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিয়েও প্রভাবিত হবে।
দীর্ঘদিন ধরে এই আসনে বিএনপি–জামায়াত একসাথে জোট ছিল, কিন্তু এবার মুখোমুখি প্রতিদ্বন্দ্বিতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী ডা. শফিকুর রহমান নির্বাচন করেছিলেন। তবে নিবন্ধন না থাকার কারণে ভোটে বিএনপির প্রতীক ধানের শীষ ব্যবহার করতে হয়েছিল। সেই নির্বাচনে তিনি পরাজিত হন আওয়ামী লীগের কামাল আহমেদ মজুমদারের কাছে। অন্যদিকে শফিকুল মিল্টন যুবদল নেতা হিসেবে পরিচিত, বিএনপির সহযোগী সংগঠনের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন।
কাজীপাড়া এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আবদুল কাদের বলেন, আগের নির্বাচনে অনেক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু রাস্তাঘাট, জলাবদ্ধতা ও অন্যান্য সেবার মান তেমন পরিবর্তন হয়নি। এবার প্রার্থীকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি, তার কর্মকাণ্ড দেখে ভোট দেব।
রাশেদ মাহমুদ নামে কলেজপড়ুয়া তরুণ ভোটার বলেন, কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন এখন আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যে প্রার্থী বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নিয়ে সরাসরি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে, তার ওপর আস্থা তৈরি হবে।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শামছুর রহমান বলেন, আগের মতো আবেগনির্ভর ভোট নেই। এবার হিসাব-নিকাশ, প্রার্থীর কার্যকারিতা এবং মাঠে উপস্থিতিই বেশি প্রভাব ফেলবে। শেষ মুহূর্তেই বোঝা যাবে কে আসলে জয়ের মুকুট পরবে।
দলীয় কর্মকাণ্ড ও সমর্থনের দিক থেকে দেখা যাচ্ছে, বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা এলাকার মানুষদের সঙ্গে পরিচিত এবং সেই কারণে তাদের প্রার্থী শফিকুল মিল্টন কিছুটা সুবিধা পাচ্ছেন। পাইকপাড়া এলাকার বাসিন্দা ও বিএনপি কর্মী কিসমত আলী বলেন, এই আসন অনেক আগে থেকেই বিএনপির। এই এলাকার জন্মস্থান শফিকুল ভাই। ভোটারদের কাছ থেকে সাড়া ভালো, আশা করি জয়ী হবেন।
অন্যদিকে জামায়াতের কর্মীরা বলছেন, দলের প্রার্থী ডা. শফিকুর রহমান অভিজ্ঞ ও স্বচ্ছ চরিত্রের। মনজু ইসলাম বলেন, আমাদের বিশাল কর্মী রয়েছে। আশা করি বিপুল ভোটে জয়লাভ করবেন আমাদের প্রার্থী। স্থানীয় চায়ের দোকানে আবুল কাসেম বলেন, পাকিস্তান আমলের দল জামায়াত। আগে কিছু রাজাকার ছিল, এখন নেই। নির্বাচিত হলে দেশের উন্নয়ন হবে। মনির হোসেন আরও যোগ করেন, দুই প্রার্থীই ভালো। যেই জিতুক, এলাকার উন্নয়ন হবে।
প্রচারের শুরুতে প্রতীক বরাদ্দ ও নির্বাচনি আচরণবিধি নিয়ে দুই দলের মধ্যে কিছু অভিযোগও উঠেছে। ঢাকা-১৫ আসনে বাংলাদেশ জামায়তে ইসলামী অভিযোগ করেছে, নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও কর্মকর্তারা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতি পক্ষপাত দেখাচ্ছেন, যা সমান প্রতিযোগিতামূলক ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
জামায়াতের সহকারী মহাসচিব ও কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, দল ও প্রার্থীরা সবসময় নির্বাচনি আচরণবিধি মেনে দায়িত্বশীল আচরণ করছেন। তবে বিএনপির সমর্থকরা জামায়াতের নেতাকর্মী, সহকর্মী ও নারী কর্মীদের হামলা ও হয়রানি করছে।
অন্যদিকে বিএনপি বলছে, জামায়াতের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তারা বলছেন, আমাদের প্রচারণা শান্তিপূর্ণ ও শালীন। আমরা ভোটারদের কাছে যাচ্ছি শুধু আমাদের প্রতিশ্রুতি এবং পরিকল্পনা জানাতে। কোনো অবস্থাতেই আমরা কাউকে ভয়ভীতি দেখিয়ে ভোটে প্রভাবিত করব না।
দলের যুগ্ম আহ্বায়ক আনিছুর রহমান বলেন, জামায়াতের পক্ষ থেকে অভিযোগ করার মাধ্যমে তারা বাস্তব ভোট প্রক্রিয়া ও জনগণের নজর কাড়ার চেষ্টা করছে। আমরা চাই, নির্বাচন হোক স্বচ্ছ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক। ভোটাররা নিজস্ব সিদ্ধান্তে ভোট দেবেন এবং সেটাই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সার্থকতা নিশ্চিত করবে।
তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, দুই দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে এখন বেশির ভাগ এলাকায় সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় আছে। ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে দেখা গেছে, বিএনপির নেতাকর্মীরা দলে ভাগ হয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। জামায়াতও ছোট অফিস থেকে নির্বাচনি প্রচার চালাচ্ছেন। প্রশাসন জানিয়েছে, নির্বাচনি আচরণবিধি মেনে চলা বাধ্যতামূলক এবং আইন ভঙ্গ করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ঢাকা-১৫ আসনে জয় নির্ভর করছে ভোটের শেষ মুহূর্তের হিসাবের ওপর। বিএনপির দুটি শাখার বিভাজন থাকলে জামায়াতের সুযোগ বাড়তে পারে। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন ও অন্যান্য দলের ভোটও এই সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করতে পারে। বর্তমানে ঢাকা-১৫ আসনে ত্রিমুখী লড়াই চলছে। দলীয় প্রধান হিসেবে জামায়াতের সুবিধা থাকলেও বিএনপির প্রার্থী স্থানীয় সমর্থন ও পরিচিতির কারণে শক্তিশালী। ফলাফল শেষ পর্যন্ত দেখাবে, কে শেষ পর্যন্ত মাঠে মানুষের উপস্থিতি এবং ভোটারদের আস্থা সবচেয়ে বেশি কাজে লাগাতে সক্ষম হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে ঢাকা-১৫ আসনে রাজনৈতিক পরিবেশ খুবই সক্রিয়। উভয় প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর দল–জমায়েত ও বিএনপির নেতাকর্মীরা সরাসরি ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছেন। জামায়াতে ইসলামী ছোট ছোট দল গঠন করে নারী কর্মীদের মাধ্যমে বাসা-বাড়ি ঘুরে ভোটারদের কাছে ‘ন্যায়-ইনসাফ’ প্রতিষ্ঠায় শফিকুর রহমানের পক্ষে বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে। অন্যদিকে বিএনপির শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন নিজে সরাসরি এলাকায় উপস্থিত হয়ে ভোটারদের হাতে নির্বাচনি ইশতেহার তুলে দিচ্ছেন, পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দা, দোকানদার ও পথচারীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করছেন। এর ফলে প্রচারণার পরিবেশ তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ দেখা দিয়েছে। যদিও নির্বাচনের আগে ছোটখাটো উত্তেজনার ঘটনা ঘটেছিল, এখন উভয় পক্ষের নেতাকর্মীরা নিজের দায়িত্ব পালন করছে এবং ভোটারদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখছে।
ঢাকা-১৫ আসনের মোট ভোটার সংখ্যা ৩,৫১,৭১৮ জন, যার মধ্যে নারী ভোটার ১,৭২,৯০২ জন। অর্থাৎ মোট ভোটের প্রায় ৪৯ শতাংশ নারী। দুই দলের প্রচারণা শিবিরই নারীদের সমর্থনকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। নারী ভোটারদের কাছে নিজেদের কার্যক্রম ও প্রতিশ্রুতি পৌঁছে দেওয়াই দুই পক্ষের মূল লক্ষ্য। জামায়াতের পক্ষ থেকে নারী কর্মীরা ঘরে ঘরে গিয়ে প্রার্থীর নীতি ও পরিকল্পনা তুলে ধরছেন, যাতে ভোটাররা তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা মূল্যায়ন করতে পারে।
বিএনপির প্রার্থী মিল্টনও নারীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন, আশ্বাস দিচ্ছেন যে নির্বাচনের পরও এলাকাবাসীর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় থাকবে। নারীদের অংশগ্রহণের গুরুত্ব বিবেচনা করে উভয় পক্ষই স্থানীয় ও জাতীয় ইস্যু, নিরাপত্তা, বাসস্থান ও কর্মসংস্থান বিষয়ক বার্তা বিশেষভাবে তুলে ধরছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ঢাকা-১৫ আসনে জয় নির্ভর করছে ভোটের শেষ মুহূর্তের উপস্থিতি ও ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর। নির্বাচনি প্রচারণা, জনসংযোগ এবং স্থানীয় কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ভোটারদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা উভয় পক্ষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দলীয় সুবিধা ও পরিচিতি অবশ্যই প্রার্থীর জন্য একটি সহায়ক দিক, তবে শুধু সেটিই জয় নিশ্চিত করতে পারবে না। স্থানীয় পরিচিতি, দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, জনগণের আস্থা অর্জন, এবং নারীদের সমর্থনকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানোই শেষ ফলাফল নির্ধারণে মূল ভূমিকা পালন করবে। এছাড়া মাঠে সমর্থনের দৃঢ়তা ও নেতা-কর্মীদের সক্রিয় উপস্থিতি প্রতিটি ভোটের প্রভাবকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
বর্তমান প্রচারণা এবং জনসংযোগ কার্যক্রম পর্যালোচনা করলে দেখা যাচ্ছে, উভয় পক্ষই সমানভাবে শক্তিশালী এবং সতর্কভাবে ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টা করছে। ফলে ঢাকা-১৫ আসনটি অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। নির্বাচনের প্রতিটি মুহূর্ত, বিশেষ করে শেষ দিনগুলোতে ভোটারদের উপস্থিতি ও সচেতন অংশগ্রহণই চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করবে, কে আসলেই এই আসনে জয়ী হবে। এখন পর্যন্ত প্রচারণার শান্তিপূর্ণ পরিবেশ এবং উভয় দলের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রমাণ করছে, যে ভোটপ্রক্রিয়া সুষ্ঠু ও জনমতভিত্তিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে, এই আসনের ফলাফল কেবল রাজনৈতিক শক্তি বা জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর করবে না, বরং ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, নারীদের সমর্থন এবং মাঠে সমর্থনের সঠিক সমন্বয়ই চূড়ান্ত বিজয় নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এএইচ/জেবি