মোস্তফা ইমরুল কায়েস
০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:৩১ পিএম
নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নায়ক আমানুল্লাহ আমান একানব্বইয়ের নির্বাচনে রেকর্ডসংখ্যক ভোটে বিজয়ী হয়েছিলেন। তখন থেকে টানা চারটি নির্বাচনে তিনি নিজের জয় ধরে রেখেছিলেন। তবে নানা জটিলতায় পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে তিনি অংশ নিতে পারেননি। অনেক বছর পর এবার তিনি এই আসনে আবার প্রার্থী হয়েছেন। এবার তিনি রেকর্ড ভোটে জিততে চান। এলাকার মানুষেরাও তাকে নিয়ে সেই স্বপ্নই দেখছেন।
তবে আসনটিতে প্রথমবারের মতো শক্ত অবস্থানে রয়েছে জামায়াতে ইসলামীও। দলটিও আঁটঘাঁট বেঁধে নেমেছে। পাশাপাশি এখানে আছেন ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীও। ধারণা করা হচ্ছে, এই আসনে ত্রিমুখী লড়াই হবে। যদিও সব বিচারেই অনেকটা এগিয়ে রয়েছেন আমানুল্লাহ আমান।
সম্প্রতি আঁটিবাজার, কদমতলীর একাংশ, জিনজিরা, নয়াবাজার, ঘাটারচর, আরশিনগর ও খোলামোড়া ঘাট বাজার ঘুরে লোকজনের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।
ঢাকা-২ আসনটি কেরানীগঞ্জ উপজেলার কালিন্দী, বাস্তা, শাক্তা, রোহিতপুর, তারানগর, কলাতিয়া, হযরতপুরসহ সাতটি ইউনিয়ন ও পার্শ্ববর্তী সাভার উপজেলার আমিনবাজার, ভাকুর্তা ও তেঁতুলঝড়ার ৩টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। এখানে মোট ভোটার ৪ লাখ ১৯ হাজার ২১৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ প্রায় ১৮ হাজার এবং নারী ভোটার ২ লাখ প্রায় দেড় হাজার। এর মধ্যে সনাতন ধর্মের ভোটও রয়েছে একটা অংশজুড়ে।
আওয়ামী লীগের শাসনকালের আগে টানা চারবারের এমপি ছিলেন আমানুল্লাহ আমান। ফলে এই আসনে তার ব্যাপক প্রভাব ও জনপ্রিয়তা রয়েছে। লোকজনও তাকে এক নামেই চেনে। তার হাত ধরেই কেরানীগঞ্জ, কামরাঙ্গীরচরের যাবতীয় উন্নয়ন হয়েছে বলে দাবি এলাকাবাসীর। ফলে তার কাছে তারা ঋণী বলে দাবি অনেকের। যদিও মাঝে আসনটি হাতছাড়া হয়ে যায় বিএনপির। এলাকাবাসীর অভিযোগ, আওয়ামী লীগের এমপিরা নির্বাচিত হয়ে কোনো ধরনের উন্নয়ন করেননি। উল্টো বাজেট লুটপাট করেছেন।
এ আসনে রাতদিন সমান তালে চলছে নির্বাচনি প্রচারণা। এবার আসনটিতে প্রথম প্রার্থী দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন। যদিও জামায়াত প্রার্থী বদল করেছে। জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন কর্নেল (অব.) আব্দুল হক অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলনের হয়ে ভোটে জহিরুল ইসলাম।
এই আসন ঘুরে লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা গত ১৭ বছর হাত খুলে ভোট দিতে পারেননি। ভোটকেন্দ্রে গেলেও অন্যে তার ভোট দিয়েছে বলে জেনে হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। কোনো প্রতিবাদ করলেই হামলা মামলার শিকার হয়েছেন। তবে এবার ভিন্ন প্রেক্ষাপটে তারা ভোট দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের ভাষ্য, এবারের ভোট হবে উৎসবমুখর। ফলে এবার ভোটের বন্যা বইয়ে দেবেন তারা।

গত বৃহস্পতিবার বিকেলে আসনটির ব্রাহ্মণকিত্তা বাজার সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে ভোটার সালাউদ্দিন বলছিলেন, ‘আমানের বিকল্প এখনো হয়নি। যারা দাঁড়িয়েছেন তারাও ভোট পাবেন, তবে তাদের থেকে অন্তত ২০ থেকে ৩০ গুণ বেশি ভোট পাবেন আমানুল্লাহ আমান। ফলে তার বিজয় হবে রেকর্ড।’
তার মতে, এই আসনে আমানকে চ্যালেঞ্জ করে কেউ এমপি হবে এমন প্রার্থী এখনো কেউ হয়নি। তিনি হয়তো মারা গেলে আসনটি হাতছাড়া হতে পারে বিএনপির। কিন্তু জীবদ্দশায় নয়।
আসনটিতে দিনভর ঘুরে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারও এই আসনে বিপুল ভোটে জয়ী হবেন বিএনপি প্রার্থী আমানুল্লাহ আমান। তাকে টক্কর দেওয়ার মতো বাকি দুই প্রার্থীর ভোটব্যাংক নেই।
আঁটিবাজারে একটি চায়ের দোকানে কথা হচ্ছিল ষাটোর্ধ মজিবরের সঙ্গে। তিনি বলছিলেন, আমান এই আসনের জনপ্রিয় নেতা। তাকে ছাড়া ভোটারটা কিছু কল্পনাও করতে পারে না। তার দাবি, আসনটি বিএনপির ঘাঁটি। ফলে আমান রেকর্ড ভোটে জয়ী হবেন।
নয়াবাজার, খোলামোড়া, জিনজিরার কিছু অংশ ও আঁটিবাজার ছাড়াও ঘাটারচর এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের বেশিল ভাগই এবার ধানের শীষে ভোট দিতে চান। প্রার্থী হিসেবে তারা আমানকে এক নামেই চিনেন।
তারা বলছেন, এবার তার ছেলেকে এই আসনে দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন আমানুল্লাহ আমান। এজন্য প্রচারেও নেমেছিলেন তার ছেলে ব্যারিস্টার ইরফান ইবনে আমান অমি। কিন্তু বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি কেরানীগঞ্জবাসী। তারা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। বিষয়টি আঁচ করতে পেরে দ্রুত সিদ্ধান্ত বদলান আমান। ফলে তার এমন সিদ্ধান্তকে তারা স্বাগত জানিয়েছে।
আলীপুর ব্রিজ এলাকায় কথা হয় সেখানকার বাসিন্দা আমিনুলের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমান ছাড়া কেঠায় আছে যে ভোট দিমু! আমান হইলো গিয়া আমাগো পোলা। তারে ছাড়া অন্যরে ভোট দিমু কল্পনাও কইরবার পারি না।’

আঁটিবাজারের যুবক প্রিতম বলেন, ‘আমরা আগে ধানের শীষে ভোট দিলেও জিততো নৌকা। কিন্তু এবার সেটা হবে না। ফলে আমানকে এবারও সকলে ভোট দেবে ও তিনি বিপুল ভোটে জিতবেন।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেরানীগঞ্জ বিএনপির নেতাকর্মীরা একযোগে মাঠে নেমেছেন। বৃহস্পতিবার খোলামোড়া ভিআইপি সড়কের পাশে কিছু লোকের জটলা। পরে জানা গেল, তারা আমানুল্লাহ আমানের পক্ষে ভোট চাচ্ছেন।
এই আসনে প্রচারে জামায়াতও পিছিয়ে নেই। আসনটির প্রতিটি ঘরে ঘরে যাচ্ছেন দলটির কর্মীরা। তারা নানা প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছেন। ভোট চাচ্ছেন জামায়াতের পক্ষে।
খোলামোড়া বাজার থেকে খানিকটা পশ্চিমের রাস্তা ধরে এগোতেই চোখে পড়ল জামায়াত প্রার্থীর নির্বাচনি অফিস। সেখানে গিয়ে দেখা গেল, একটি টিনসেডে ঘেরা বড় একটি গোডাউনের মতো কক্ষকে নির্বাচনি প্রচারণার অফিস বানানো হয়েছে। তাতে বসে আছেন কয়েকজন লোক। সেখান থেকে এগিয়ে সামনের বাজারে গিয়ে চায়ের দোকানে বসতেই ভোটের আলাপ কানে এসে বাজলো। জানতে চাইলাম, কে হবেন এই আসনের এমপি। নয়ন নামে একজন বলে উঠলেন- দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী। তার দাবি, বিগত সময়ে এই আসনের লোকজন বিএনপি ও আওয়ামী লীগকে দেখেছে। এবার তারা জামায়াতকে দেখতে চান। ফলে আসনটিতে এবার জামায়াত ভালো ভোট পেয়ে বিজয়ী হবে বলে দাবি তার।
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, এই আসনে দাঁড়ানো জামায়াতের প্রার্থী কর্নেল (অব.) আব্দুল হকের বাড়ি আঁটিবাজার এলাকায়। ফলে আসনটির স্থায়ী বাসিন্দা তিনি। এলাকার ছেলে হওয়ায় তারও কিছু পক্ষের লোকজন আছে। যারা এখন রাতদিন তার পক্ষে ভোট চেয়ে বেড়াচ্ছেন। প্রতিটি মোড়ে মোড়ে আমানের পাশেই ঝুলছে কর্নেল (অব.) আব্দুল হকের ব্যানার।
এমআইকে/জেবি