নিজস্ব প্রতিবেদক
২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৪১ পিএম
পুরাতন রাষ্ট্রীয় বন্দোবস্তে ভাঙন, কাঙ্ক্ষিত সংস্কার এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক রূপান্তর এখনো গভীর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় বড় পরিবর্তন এলেও সেই পরিবর্তনের প্রত্যাশা কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। এমন বাস্তবতায় গণতন্ত্রের পুনর্ভাবনা, রাষ্ট্রীয় সংস্কার এবং রূপান্তরের কঠিন পথচলা নিয়ে দিনব্যাপী সম্মেলনের আয়োজন করে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের গভর্নেন্স ও উন্নয়ন বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইজিডি।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) রাজধানীতে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা, রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা এবং সংস্কারের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। যুক্তরাজ্য সরকারের উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন গবেষণা সংস্থার সহায়তায় আয়োজিত এই সম্মেলনে বিআইজিডির ‘স্টেট অব গভর্নেন্স ২০২৪–২০২৫’ গবেষণা প্রকল্পের ফলাফল তুলে ধরা হয়।
সম্মেলনের বিভিন্ন সেশনে আলোচকরা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ফলে দেশের রাজনৈতিক কাঠামোয় কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে, নতুন কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠছে কি না এবং জনগণের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে—এসব বিষয়ে মতামত দেন। আলোচনায় অভ্যুত্থানকালীন সংহতি, অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনীতি, তরুণদের রাজনৈতিক সংগঠনের ধারা, সংস্কার ও বিপ্লবের সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক রূপান্তর প্রক্রিয়ায় জেন্ডারভিত্তিক বিতর্কের বিভিন্ন দিক উঠে আসে।
২০০৬ সাল থেকে বিআইজিডির স্টেট অব গভর্নেন্স প্রতিবেদনগুলো তাত্ত্বিক ও মাঠপর্যায়ের গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থার জাতীয়, স্থানীয় ও খাতভিত্তিক চিত্র তুলে ধরে আসছে। আসন্ন ২০২৪–২০২৫ সালের প্রতিবেদনে জুলাই গণঅভ্যুত্থান, এর পরবর্তী পরিস্থিতি এবং এর ফলে বাংলাদেশের রাজনীতি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের ওপর প্রভাব বিশ্লেষণ করা হবে। প্রতিবেদনে ধারাবাহিকতার পাশাপাশি পরিবর্তনের দিকগুলোও তুলে ধরা হবে এবং ভবিষ্যতে পরিস্থিতি কোন দিকে যেতে পারে, সে বিষয়েও আলোচনা থাকবে।
বিআইজিডির গবেষণায় বলা হয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো একক ঘটনার ফল নয়; বরং এটি ছিল দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া একাধিক সংহতির সম্মিলিত বহিঃপ্রকাশ। মাত্র দুই মাসের মধ্যে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর অংশগ্রহণে আন্দোলনটি সামান্য ইস্যুভিত্তিক প্রতিবাদ থেকে বহুমাত্রিক আন্দোলনে রূপ নেয়। রাজপথের আন্দোলনের পাশাপাশি ডিজিটাল এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সংহতি যুক্ত হয়ে এটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রভাব ফেলে। তবে আলোচকদের মতে, শেষ পর্যন্ত এই অভ্যুত্থানটি পূর্ণাঙ্গ অর্থে গণমানুষের আন্দোলনে পরিণত হতে পারেনি।
সম্মেলনে উপস্থিত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক নুসরাত তাবাসসুম বলেন, আন্দোলনের সময় এবং আন্দোলনের পর তিনি উপলব্ধি করেছেন যে এটি পুরোপুরি গণমানুষের আন্দোলন হয়ে উঠতে পারেনি। ভবিষ্যতে যদি আবার কোনো গণঅভ্যুত্থান ঘটে, তবে রাজনৈতিকভাবে সচেতন মানুষদের আগে থেকেই প্রস্তুত করা জরুরি। তিনি বলেন, ‘না’ বলার প্রশ্নে যেমন ঐকমত্য দরকার, তেমনি ‘হ্যাঁ’ বলার বিষয়গুলোতেও ঐকমত্য গড়ে তুলতে হবে—এভাবেই সংহতি টিকে থাকবে।
সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের একটি বড় প্রশ্ন ছিল—অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি আদৌ ছিল কি না। অধিকাংশ বক্তা বলেন, মূল লক্ষ্য ছিল এমন একটি রাষ্ট্র কল্পনা করা, যেখানে রাষ্ট্র ইচ্ছেমতো কাউকে হত্যা করতে পারবে না এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর গণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাদিন শান্তা মুর্শিদ প্রশ্ন তোলেন, নির্বাচন এবং রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ডের অবসানই কি রাজনৈতিক স্বপ্নের ন্যূনতম সীমা, নাকি এর বাইরে আরও কিছু কল্পনা করা সম্ভব।
গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনীতি
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর প্রথমদিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি জনসমর্থন ও বৈধতা ছিল বেশ শক্তিশালী। বিআইজিডির আগস্ট ২০২৪ সালের একটি জাতীয় জরিপ অনুযায়ী, ৮৩ শতাংশ মানুষ আগের সরকার উৎখাতের পক্ষে ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সমর্থন কমে আসে এবং ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে তা প্রায় অভ্যুত্থানের আগের অবস্থায় নেমে যায়। অর্থনৈতিক আশাবাদও হ্রাস পায়, কারণ শাসনব্যবস্থা ও অর্থনীতি উন্নত হবে—এমন প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। এর ফলে দ্রুত নির্বাচনের দাবিও জোরালো হয়ে ওঠে।
বিআইজিডির বিশ্লেষণে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের পর্যাপ্ত রাজনৈতিক ক্ষমতা না থাকায় সামাজিক ও রাজনৈতিক নানা সমস্যা তৈরি হয়। জনশৃঙ্খলার ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ায় দলবদ্ধ সহিংসতা বৃদ্ধি পায়, যা সরকার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। অনেক ক্ষেত্রে জনগণের দাবিগুলো ন্যায্যতা বা সমতার ভিত্তিতে নয়, বরং রাজনৈতিক লাভ-ক্ষতির বিবেচনায় দেখা হয়েছে। সংস্কারের ক্ষেত্রেও সরকার খুব একটা সক্রিয় ছিল না। ফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলো রাজনৈতিক অভিজাতদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে এবং সাধারণ নাগরিকদের কার্যকর অংশগ্রহণ কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী এবং সংবিধান সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান ড. আলী রিয়াজ বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন না থাকায় রাষ্ট্রকে আগের সরকারের সময় শক্তিশালী হয়ে ওঠা আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, দেশের গল্প এখানেই শেষ হয়নি। গণভোটে যেসব বিষয় আনা হয়েছে, সেগুলো অনুমোদিত হলে রাজনৈতিক দলগুলো জনতার প্রশ্নের মুখে পড়বে এবং সংস্কারের সুযোগ তৈরি হবে। তিনি আরও বলেন, সুশীল সমাজ অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারত, কিন্তু তারা রাজনৈতিকভাবে আরও সক্রিয় হলে সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখা সম্ভব হতো।
লন্ডনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাওমী হোসাইন বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর সুশীল সমাজের শূন্যতায় একটি হিংস্র শক্তি প্রবেশ করেছে। নারী, আদিবাসী ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং দেশের দুটি প্রধান সংবাদপত্রকে লক্ষ্য করে আক্রমণ আগের সময়ের তুলনায় আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার আরও দৃঢ়ভাবে কী গ্রহণযোগ্য আর কী গ্রহণযোগ্য নয়—সে বিষয়ে বার্তা দিলে ব্যক্তিগত অধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সুরক্ষিত করা সম্ভব হতো।
জেন্ডার বিতর্ক ও নতুন যুব রাজনীতি
বিআইজিডির গবেষণায় দেখা গেছে, নারী উন্নয়ন ও অধিকার বিষয়ক সংস্কার প্রস্তাব সামনে আসার পর সরকার এই প্রতিক্রিয়ার মাত্রা আগে থেকে অনুমান করতে পারেনি। গবেষণায় আরও বলা হয়, নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের সদস্যদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হয়রানি করা হয়েছে এবং বিতর্কিত সুপারিশগুলো কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই প্রকাশ করা হয়েছে।
অন্যদিকে জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে তরুণদের নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে ওঠে। গবেষণায় দেখা যায়, তরুণ নেতৃত্বাধীন দলটি শুরুতে আন্দোলনভিত্তিক হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও সাংগঠনিক দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফলে যে আশাবাদ নিয়ে মানুষ যুব রাজনীতির দিকে তাকিয়েছিল, তা ধীরে ধীরে সন্দেহে রূপ নেয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সামিনা লুতফা বলেন, ছাত্র আন্দোলন অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য একটি শক্তিশালী জবাবদিহি ব্যবস্থা হতে পারত। কিন্তু সরকারের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কৌশল শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে এবং তারা যে রাজনৈতিক কাঠামো থেকে স্বাধীন থাকতে চেয়েছিল, তার মধ্যেই মিশে গেছে।
ভাঙন ও সংস্কারের মাঝখানে বাংলাদেশ
গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশ একটি বিপ্লব ও সংস্কারের মিশ্র রূপান্তর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছে। এই কঠিন সময় পার করতে অভিজাতদের ঐকমত্য ও নাগরিকদের অংশগ্রহণ জরুরি ছিল, কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে সংস্কারের ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিআইজিডির জ্যেষ্ঠ গবেষক ড. আসিফ শাহান বলেন, বর্তমানে দেশে এমন এক অভিজাত ঐকমত্য তৈরি হয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষের কোনো অংশগ্রহণ নেই। নীতি গবেষণা সংস্থার চেয়ারম্যান প্রফেসর রেহমান সোবহান বলেন, কাগজে সংস্কার প্রস্তাব থাকলেই হবে না, বাস্তবায়ন না হলে তার কোনো মূল্য নেই।
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেন, শিক্ষা, জেন্ডার ও স্বাস্থ্য খাতে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার না হলেও অর্থনীতিতে কিছু অগ্রগতি হয়েছে। সংস্কার কোনো মিথ্যা প্রতিশ্রুতি ছিল না; এটি ছিল জনগণের গভীর প্রত্যাশা, যা এখনো অটুট রয়েছে।
এএইচ/ক.ম