ঢাকা মেইল ডেস্ক
২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৪:১২ পিএম
কোনো আসনে বিএনপির সামনে নিজ দলের বিদ্রোহী, কোনোটিতে ইসলামী আন্দোলনের শীর্ষ নেতা। রয়েছেন জামায়াত জোটের আলোচিত কেউ কিংবা জাতীয় পার্টির শক্তিশালী প্রার্থী। নির্বাচনে না থেকেও ভোটের মাঠে 'বড় ফ্যাক্টর' হতে পারে আওয়ামী লীগের ভোটার। সব মিলিয়ে বরিশালের প্রায় প্রতিটি আসনেই ভোটের হিসেব-নিকেশ বেশ জটিল।
বেশিরভাগ আসনে দলের পরীক্ষিত প্রার্থীর ওপরই ভরসা রেখেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি। এই জেলার ভোটের ইতিহাসও তাদের পক্ষে।
দলটির স্থানীয় নেতাদের দাবি, বরিশালের সব আসনেই শক্তিশালী অবস্থানে ধানের শীষের প্রার্থীরা। যদিও কোনো কোনো আসনে দলীয় কোন্দল এখনও রয়েছে বলেও মানছেন তারা। অন্যদিকে চরমোনাই পীরের কেন্দ্র হওয়ায় এই জেলায় ইসলামী আন্দোলনের একটি ভোটব্যাংক রয়েছে বলেই মনে করা হয়।
জেলার দুইটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দলটির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম। দলটির নেতারা বলছেন, জামায়াতের সঙ্গে জোট না হলেও ইসলামের পক্ষে ওয়ান বক্স পলিসি নিয়ে নির্বাচনের মাঠে লড়াই করবেন তারা।
এদিকে এক জোট আর দলের প্রার্থীদের নিয়ে অন্তত চারটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বীদের চ্যালেঞ্জ জানাতে মাঠে সক্রিয় জামায়াতে ইসলামী। নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি না হওয়া এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দলটির নেতারা।
এছাড়া আসন ভেদে জাতীয় পার্টির প্রার্থী, বিএনপির বিদ্রোহী কিংবা আলোচিত স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অনেকের ভোটের মাঠে জয়ের সক্ষমতা রয়েছে।
জেলার প্রায় সবগুলো আসনে এমন সমীকরণ এবং বিদ্যমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সাধারণ ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে বলে মনে করেন স্থানীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের অনেকে। তারা বলছেন, ভোটের মাঠ নিজেদের দখলে নিতে শক্তির ব্যবহার যেকোন সময় সংঘাতের কারণ হতে পারে।
ভোটের সমীকরণ জটিল কেন?
নির্বাচনের প্রচারণা শুরু হতেই মাঠের লড়াই জমে উঠেছে বরিশালে। জেলার ছয়টি আসনেই মুখোমুখি একাধিক শক্তিশালী প্রার্থী। অধিকাংশ আসনেই বিএনপির ভালো অবস্থান রয়েছে বলে মনে করা হলেও চ্যালেঞ্জ জানাবে ইসলামী আন্দোলন এবং জামায়াতসহ অন্যান্য প্রার্থীরা। যদিও ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যে ইসলামী আন্দোলন না থাকায় বিএনপির প্রার্থীরা কিছুটা স্বস্তিতে থাকবে বলেও মনে করছেন অনেকে।
গৌরনদী- আগৈলঝাড়া নির্বাচনি এলাকা নিয়ে বরিশাল- ১ আসনে বিএনপি প্রার্থী জহির উদ্দিন স্বপন, জামায়াতের কামরুল ইসলাম খান এবং ইসলামী আন্দোলনের রাসেল সরদার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে এই আসনে দলের স্বতন্ত্র প্রার্থী আব্দুস সোবহান, বিএনপির প্রধান প্রতিপক্ষ বলেই মনে করা হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাবেক সংসদ সদস্য জহির উদ্দিন স্বপনকে প্রার্থী করায় বিএনপির তৃণমূলে অসন্তোষ রয়েছে। ২০০১ সালে ওই এলাকায় সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনাও ভোটের ব্যালটে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। এছাড়া এই আসনের দুই উপজেলার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যালঘু ভোটার থাকা আগৈলঝাড়ায় স্বতন্ত্র প্রার্থী আব্দুস সোবহানের বাড়ি।
দুই বিএনপি নেতার এমন মুখোমুখি অবস্থানের সুযোগ অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীরা কাজে লাগাতে পারে বলে মনে করেন স্থানীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের অনেকে। তারা বলছেন, এলাকার পরিচিত মুখ হওয়ায় জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী কামরুল ইসলাম খান আসনটিতে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন।
বানারীপাড়া-উজিরপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত বরিশাল- ২ সংসদীয় আসনে তুলনামূলক স্বস্তিতে ধানের শীষের প্রার্থী। দলের কোনো বিদ্রোহী না থাকায় জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন এবং জাতীয় পার্টির প্রার্থীরাই এই আসনে তাদের মূল প্রতিপক্ষ। তবে জয়ের ক্ষেত্রে আওয়ামী সমর্থক এবং সংখ্যালঘু ভোটাররাও এখানে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করতে পারে।
বরিশাল সিটি করপোরেশন ও সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত বরিশাল-৫ সংসদীয় আসনটি বিএনপির শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবেই পরিচিত। এই আসনে দলটির প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়া বরিশাল সিটির প্রথম মেয়রও ছিলেন তিনি।
অন্যদিকে এই আসনেই লড়ছেন ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী, দলটির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিম। যার সম্মানে নিজেদের প্রার্থী প্রত্যাহার করেছে জামায়াত। জয়ের জন্য যথেষ্ট না হলেও এখানে ইসলামী আন্দোলনের ভোট ব্যাংক রয়েছে। সেই সাথে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সরিয়ে নেওয়ায় তাদের ভোটও ইসলামী আন্দোলনের পক্ষে গেলে ভোটের জমজমাট লড়াই হতে পারে।
এছাড়া বরিশালের এই আসনটিতে একমাত্র নারী প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল বা বাসদ এবং গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী মনীষা চক্রবর্তী।
এর আগে ২০১৮ সালে বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন মনীষা। এই আসনে আওয়ামী লীগের ভোট কোন দিকে যায় সেটিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বরিশাল- ৬ সংসদীয় আসনে অতীতে ঘুরেফিরে নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তৃতীয়বারের মতো এখানে মনোনয়ন পেয়েছেন বরিশাল দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবুল হোসেন খান। এই আসন থেকেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ইসলামী আন্দোলনের নায়েবে আমীর ফয়জুল করীম। আর জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা মাহমুদুন্নবীও মাঠে রয়েছেন।
জামায়াত এবং ইসলামী আন্দোলন জোট ভেস্তে যাওয়ায় এই আসনে বিএনপি প্রার্থীর জয় সহজ হতে পারে বলেই মনে করছেন অনেকে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ
বরিশালের বিভিন্ন আসনে প্রতিপক্ষের ওপর হামলা কিংবা দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের সঙ্গে সংঘাতের একাধিক ঘটনা ঘটেছে, যা নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
নির্বাচন নিয়ে কথা হচ্ছিল বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে। ভোট দেওয়ার আগ্রহ থাকলেও নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভাবাচ্ছে তাদেরকে।
উৎসবমুখর পরিবেশে মানুষ ভোটকেন্দ্রে যাবে এমন পরিবেশ এখনও তৈরি হয়নি বলেই মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সুজয় শুভ।
আরেক শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মায়েদ বলেন, ‘ভেবেছিলাম উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে ভোট দিব। কিন্তু আমরা যে ভোট কেন্দ্রে যাব, ভোটটা দিয়ে নিরাপদে ফিরে আসতে পারবো সেটা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।’
নির্বাচন ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেমন থাকে, সেটি পর্যবেক্ষণ করেই ভোট দিতে কেন্দ্রে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেবেন মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আগে আমরা ভোট দেতে পারি নাই, কেন্দ্রেও যাই নাই, এখন যদি সুন্দার পরিবেশ হয় তাহলে আমরা ভোট দেতে যাব।’
নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন নির্বাচন পর্যবেক্ষকরাও। সুশাসনের জন্য নাগরিক বা সুজন এর বরিশাল শাখার সাধারণ সম্পাদক রফিকুল আলম মনে করেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের বিষয়ে মানুষকে এখনও আশ্বস্ত করতে পারেনি সরকার।
‘মানুষের মধ্যে ভোট দেওয়ার আমেজ নাই। বিশেষ করে সংখ্যালঘু যারা, এরা সব থেকে আশঙ্কার মধ্যে আছে,’ বলেন সুজন সাধারণ সম্পাদক।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং নির্বাচনের আগে প্রশাসনে ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে রাজনৈতিক দলগুলোও। নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড এখনও তৈরি হয়নি বলে অভিযোগ জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল জব্বারের। তিনি বলছেন, ‘আমাদের দলের কর্মীদেরকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে, মাঠপর্যায়ের নানা কর্মকাণ্ডে বাঁধা সৃষ্টি করা হচ্ছে।’
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ইসলামী আন্দোলনও। দলটির নায়েবে আমির ফয়জুল করীম বলছেন, ‘প্রশাসন একটি দলের দিকে ঝুঁকে গেছে বলেই মনে হচ্ছে।’
'বড় ফ্যাক্টর' আওয়ামী লীগের ভোটার
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে বরিশালের আসনগুলোতে ঘুরেফিরে ক্ষমতায় এসেছে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি। তাই বিএনপির পাশাপাশি আওয়ামী লীগেরও ভোট ব্যাংক রয়েছে এখানে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ না নিলেও জয়-পরাজয়ের বড় ফ্যাক্টর হতে পারে দলটির ভোটাররা।
বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী কিংবা দলীয় কোন্দলের কারণে বরিশালের অন্তত চারটি আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। এমন অবস্থায় আওয়ামী লীগের ভোট নিজেদের বাক্সে আনার চেষ্টাও রয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে।
নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ ট্যাগ দিয়ে কাউকে যেন গ্রেফতার করা না হয়- সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এই আহ্বান জানিয়েছেন ইসলামী আন্দোলনের নেতা সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ ট্যাগ দিয়ে অনেককেই গ্রেফতার করা হচ্ছে, যা ভোটারদের মধ্যে ভয়ের পরিস্থিতি তৈরি করছে।’
আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক নিজের পক্ষে টানতেই এমন অবস্থান কিনা- এ প্রশ্নের জবাবে ফয়জুল করীম বলেন, যোগ্য প্রার্থী দেখেই ভোট দেবেন প্রার্থীরা, এক্ষেত্রে কোনো দলের ভোট টানার বিষয় নেই। তিনি বলেন, ‘কেবল এখন না, নির্দোষ কাউকে যেন কোনো ট্যাগ দিয়ে গ্রেফতার বা হয়রানি করা না হয় সেই আহ্বান এর আগেও আমরা জানিয়েছি’।
'ভোট ব্যাংক' ধারণাটি আর নেই বলেই মনে করেন বরিশাল জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল জব্বার। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের অতীত কর্মকাণ্ডের কারণে ক্ষুব্ধ হয়েই তাদেরকে মানুষ বিদায় জানিয়েছে’।
এদিকে বরিশালকে বিএনপির ঘাঁটি উল্লেখ করে দলটির বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরিন বলছেন, কারচুপির নির্বাচনে ক্ষমতায় গিয়েছিল আওয়ামী লীগ। সবশেষ তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে যে ভোটব্যাংকের কথা বলা হয়, সেটি এই নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রে তেমন ভূমিকা রাখবে না বলে দাবি করেন এই বিএনপি নেতা। -বিবিসি বাংলা
ক.ম/