জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৩৯ এএম
* এনসিপিকে ৩০ আসন দেওয়ায় ইসলামী আন্দোলন ও খেলাফত মজলিসের ক্ষোভ।
* জামায়াত ২৭৬টি ও ইসলামী আন্দোলন ২৬৮টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে।
* চলতি সপ্তাহেই সমাধানের সম্ভাবনা।
* জোট অটুট রাখতে উভয় পক্ষই ছাড় দিতে প্রস্তুত।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দীর্ঘদিনের আলোচনা সত্ত্বেও ইসলামপন্থী দলগুলোর মধ্যে আসন ভাগাভাগি নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। প্রায় সাড়ে তিন মাস একসঙ্গে কাজ করলেও নির্বাচনের একেবারে দোরগোড়ায় এসে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের (চরমোনাই পীরের দল) মধ্যে সমঝোতায় ফাটল দেখা দিয়েছে। জোটগত বোঝাপড়া আদৌ কার্যকর হবে কি না, তা নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন। তবে জোটসংশ্লিষ্ট নেতাদের দাবি, চলতি সপ্তাহেই এই অনিশ্চয়তার অবসান হতে পারে।
জোটসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জামায়াত নিজের জন্য ১৮০ থেকে ১৮৫টি আসন রাখার প্রস্তাব দেয়। বাকি আসন শরিক দলগুলোর মধ্যে বণ্টনের কথা বলা হয়। সে হিসাবে জামায়াতের পর ইসলামী আন্দোলনের সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়ার কথা। এরপর জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি)।
কিন্তু চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন এই প্রস্তাবে সন্তুষ্ট নয়। দলটির নেতারা বলছেন, সাংগঠনিক শক্তি ও মাঠপর্যায়ের অবস্থান বিবেচনায় তাদের আরো বেশি আসন পাওয়া উচিত। বিশেষ করে তরুণদের নিয়ে গড়া দল এনসিপিকে ৩০টি আসন দেওয়ার সিদ্ধান্তে তারা ক্ষুব্ধ।
দলটির মতে, এনসিপিকে অযথা বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে ইসলামী আন্দোলনের অবস্থানের সঙ্গে একমত হয়েছে মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসও।
জোট গঠনের প্রাথমিক ধাপে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনসহ মোট আটটি দল আসন ভাগাভাগির আলোচনায় ছিল। তবে মনোনয়নপত্র জমার শেষ সময়ের এক দিন আগে ২৮ ডিসেম্বর, এনসিপি এবং অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) জোটে যুক্ত হয়। একই রাতে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) যুক্ত হওয়ার খবর আসে। এতে শরিক দলের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১১টিতে।
আরও পড়ুন: জামায়াত জোটে যোগ দিলো এনসিপি-এলডিপি
ইসলামী আন্দোলন ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের শীর্ষ নেতাদের অভিযোগ, নতুন তিনটি দলকে জোটে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে তাদের মতামত যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, জামায়াতের একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণই বর্তমান অস্বস্তি ও অসন্তোষের মূল কারণ।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ২৮ ডিসেম্বর ১১ শরিক দলের মধ্যে সর্বশেষ দফার বৈঠক হয়। ওই দিন জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান জানান, এনসিপি ও এলডিপি একযোগে আন্দোলনের অংশ হিসেবে জোটে যুক্ত হয়েছে। পরে এবি পার্টির যুক্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
সর্বশেষ প্রস্তাব অনুযায়ী, জামায়াত ইসলামী আন্দোলনকে ৪০টি, এনসিপিকে ৩০টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে ১১টি, খেলাফত মজলিসকে তিনটি, এবি পার্টিকে তিনটি, এলডিপিকে দুটি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টিকে (জাগপা) তিনটি এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টিকে (বিডিপি) দুটি আসন দেওয়ার কথা বলেছে।
তবে চূড়ান্ত সমঝোতা না হওয়ায় মনোনয়নপত্র জমার শেষ দিন ২৯ ডিসেম্বর জামায়াত ২৭৬টি আসনে প্রার্থী দেয়। ইসলামী আন্দোলন মনোনয়ন জমা দেয় ২৬৮টি আসনে। এ ছাড়া এনসিপি ৪৪টি, এবি পার্টি ৫৩টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ৯৪টি এবং খেলাফত মজলিস ৬৮টি আসনে প্রার্থী দেয়।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য ও জোটসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যেসব আসন ইসলামী আন্দোলনের জন্য ছেড়ে দেওয়ার কথা ছিল, সেখানেও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে জামায়াতের প্রার্থীরা মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। একইভাবে, হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরাও জামায়াতের জন্য নির্ধারিত আসনগুলোতে মনোনয়ন দিয়েছেন।
জামায়াত যে ২৪টি আসনে প্রার্থী দেয়নি, সেগুলোর বেশিরভাগই এনসিপির জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। এ ছাড়া জামায়াত ঢাকা-১৩ আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক এবং কিশোরগঞ্জ-৬ আসনে দলটির যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমীনের জন্য প্রার্থী প্রত্যাহার করেছে।
অন্যদিকে, ইসলামী আন্দোলনও তাদের বরাদ্দ পাওয়া আসনগুলোতে প্রার্থী রেখেছে। দলের সিনিয়র নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিম বরিশাল-৫ ও বরিশাল-৬ আসনে মনোনয়ন দিয়েছেন, যেখানে জামায়াতের প্রার্থীরাও রয়েছেন।
আরও পড়ুন: জোটে যাওয়া নিয়ে এনসিপিতে ভাঙনের সুর!
সমঝোতার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, মনোনয়ন যাচাই শেষ হলে আমরা আবারো বসব। আমরা আশা করছি, এই সপ্তাহের মধ্যেই বিষয়টি চূড়ান্ত করে ঘোষণা দিতে পারব।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ বলেন, ‘আমরা একটি জোট হিসেবে নির্বাচন করছি। জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি। জোট অটুট রাখতে প্রয়োজনে ছাড় দিতে আমরা প্রস্তুত।’
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ ফয়জুল করীম বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এখনো জোট ভাঙেনি। কেউ বহিষ্কৃত হয়নি, কেউ বেরিয়েও যায়নি। আমরা সবাইকে নিয়ে এগোতে চাই। তবে যদি কেউ এককভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার চিন্তা করে, তাহলে সম্মিলিত পথচলা কঠিন হয়ে পড়বে।’
টিএই/এমআর