Dhaka Mail Logo

মতামত

কোরআন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ: কয়েকটি প্রশ্ন ও প্রস্তাবনা

ঢাকা মেইল ডেস্ক

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৫:০৯ পিএম

সৌদি আরবে গত সপ্তাহে যে আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেখানে মোট পাঁচ ক্যাটাগরিতে প্রতিযোগিতা নির্ধারিত ছিল। বাংলাদেশি প্রতিযোগী হাফেজ তাকরিম চতুর্থ ক্যাটাগরিতে অংশ নিয়ে তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে। তা হচ্ছে: ‘তাজভিদ ও সুন্দর সুরের মাধ্যমে ধারাবাহিক পনেরো পারা মুখস্থ’ বিভাগ। এর আগে তৃতীয় ক্যাটাগরি হচ্ছে: ‘তাজভিদ ও সুন্দর সুরের মাধ্যমে পূর্ণ কোরআন মুখস্থ’ বিভাগ। পৃথিবীর যে দেশের প্রতিযোগিতাই হোক সাধারণত বাংলাদেশের হাফেজরা এই দুই বিভাগেই অংশ নিয়ে থাকে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিভাগে তাজভিদ ও সুরের পাশাপাশি ইলমুল কিরাআত ও তাফসিরের কথাও যুক্ত রয়েছে। এসব বিভাগে বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণের বিষয়ে জানা যায় না।

আমরা যদি প্রতিযোগিতার নামের দিকে লক্ষ্য করি তাহলে দেখতে পাব, এর পূর্ণ নাম হচ্ছে: কিং আব্দুল আজিজ কোরআনের হিফজ, তেলাওয়াত ও তাফসিরের প্রতিযোগিতা। চলতি বছর এর ৪২তম আসর সমাপ্ত হলো। তার মানে প্রায় চার দশক ধরে এই প্রতিযোগিতা চলছে এবং ২/৩ দশক থেকে বাংলাদেশি প্রতিযোগীরাও অংশ নিয়ে পুরস্কার অর্জন করছেন।

প্রথম প্রশ্ন হলো, এই দীর্ঘ সময়ে প্রথম ও দ্বিতীয় বিভাগে কেন বাংলাদেশি হাফেজদের অংশগ্রহণ নেই? এর একমাত্র কারণ বলা যায়, বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ইলমুল কিরাআতের চর্চা নেই। প্রতিযোগিতার প্রথম ক্যাটাগরিতে যে ‘শাতিবিয়্যাহ’ কিতাবের নাম ও ত্বরিক বলা হয়েছে, তা কী ও কেন তাও অধিকাংশ হাফেজ জানেন না।

দ্বিতীয় প্রশ্ন, বাংলাদেশের সাধারণ মহলে ইলমুল কিরাআতের পরিচিতি না থাকলেও এসব প্রতিযোগিতার সাথে যারা সংশ্লিষ্ট তারা কেন এই বিষয়ে উদ্যোগী হলেন না? দুই দশকেরও অধিক সময় ধরে বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের ছাত্ররা যাচ্ছে, পুরস্কার পাচ্ছে। কিন্তু তারা শুধু হিফজের সবচেয়ে সহজ ক্যাটাগরি নিয়েই সন্তুষ্ট থেকেছে। তাদের দায়িত্বশীল শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠানও তাদের সেদিকে আগ্রহী করেনি বা ব্যবস্থা নেয়নি। আমাদের দেশে কিরাআত বলতে এখনও 'কানে হাত দিয়ে মুখ বেঁকিয়ে চোখ বুঁজে গলা ফাটিয়ে' তেলাওয়াতকেই বুঝে মানুষ। তাদের এই অবস্থার পরিবর্তনে কী ভূমিকা রেখেছেন এসব বিশ্বজয়ী হাফেজ বা তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো? নাকি শুধু স্রোতে গা ভাসিয়ে আখেরে পকেট ভারীই করে গেছেন?

আরও পড়ুন: প্রশংসায় ভাসছেন তাকরিম

উদাহরণস্বরূপ বলি, হাফেজ তাকরিম নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের সম্পদ। সে ইতিপূর্বেও দুই দেশের প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে জয়ী হয়ে এসেছে। তারপরও কেন সৌদি আরবের প্রতিযোগিতায় তাকে চতুর্থ বিভাগে অংশ নিতে হলো? কেন এতদিনেও তাকে ইলমুল কিরাআতের বিশেষজ্ঞ কারো মাধ্যমে (অনলাইনে হলেও) প্রস্তুত করা হলো না?

tt2

কেউ হয়তো বলবেন, অল্প বয়সের বাচ্চা তাই। কিন্তু যে বাচ্চা ছেলে এটুকু বয়সে এত বড় অর্জন করতে পারে তাকে সঠিক পরিচর্যা দিলে অবশ্যই পারত, যেমনটা আরব বাচ্চাদের দেওয়া হয়ে থাকে। আমরা শুধু তাদের দেখেই যাই, আর সবচেয়ে সহজ বিভাগে অংশ নিয়ে বিশ্বজয়ের আত্মতৃপ্তিতে ভুগি।

তৃতীয় প্রশ্ন, হিফজ-হুফফাজদের নামে যে অজস্র সংগঠন আছে, শাস্ত্রীয়ভাবে ইলমুত তাজভিদ ও ইলমুল কিরাআত চর্চায় তাদের ভূমিকা কী? দেশব্যাপী লাখ লাখ টাকা খরচ করে নানারকম অনুষ্ঠান তারা আয়োজন করেন। তাদের অনেকে এসব পদ-পদবী নিয়ে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে নায়ক-গায়কদের সাথে কোরআনের অনুষ্ঠানেও অংশ নেন। কিন্তু ‘উলুমুল কোরআন’ (তাজভিদ-কিরাআত-তাফসির) বিষয়ে তাদের জ্ঞানচর্চা কতটুকু?

বরং দুঃখজনক কথা হলো, যারা বাংলাদেশে ইলমুল কিরাআত চর্চার উদ্যোগ নিয়েছেন বা নিচ্ছেন তারা পদে পদে এসব সংগঠনের কর্তাব্যক্তিদের মাধ্যমে বাধাপ্রাপ্ত বা আশাহত হয়েছেন।

শেষকথা, কোরআন চর্চা ও কোরআনের প্রতি ভালোবাসার যে জোয়ার উঠেছে, সময় এসেছে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ইলমুল কিরাআতকে শেখা ও শেখানোর। শুধু মাকামাতি সুর নয়; শাস্ত্রীয়ভাবে দশ কিরাআতকে শেখা জানা ও পড়ার প্রয়োজন এখন। সস্তা জনপ্রিয়তা ও দুটো পয়সা কামানোর মোহে বিশ্বজয়ী হাফেজদের না খাটিয়ে তাদের এই পথে মেহনত করানো হোক। কারী আব্দুল বাসেত, মাহমুদ খলিল হুসারি, মিনশাভী বা সুদাইস, শুরাইম, মাহের উকাইলির সুর শুনিয়ে হিফজখানা চালানোর পরিবর্তে তাদের সনদে ইলমুল কিরাআতের চর্চা করা হোক। হিফজ ও হুফফাজ সংশ্লিষ্ট সকলে এই বিষয়ে কার্যকরী ভূমিকা নেবেন বলেই আশা রাখি।

লেখক: পিএইচডি গবেষক, তাফসির ও উলুমুল কোরআন বিভাগ, আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় মিসর