images

মতামত

ব্রিটিশ রাজনীতি, স্থাপত্য ও চৌর্যবৃত্তি নিয়ে কিছু কথা

ঢাকা মেইল ডেস্ক

০৮ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০১:১৯ পিএম

রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিলেন লিজ ট্রাস। স্কটল্যান্ডের বন্দরনগরী এবারডীনের কাছাকাছি দুরত্বের বালমোরাল দুর্গে ব্রিটিশ মহামহিম রাণীর উপস্থিতি তিনি এ দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। গ্রেট ব্রিটেনে গত ছয় বছরে চতুর্থবারের মতো সরকার প্রধানের পদে পরিবর্তন এলো; বিবিধ ঘটনা-দুর্ঘটনার জের ধরে একে একে বিদায় নিলেন একই (টোরি) দলের ডেভিড ক্যামেরুন, টেরেসা মে, ও বরিস জনসন।

একসময় বলা হতো— ‘ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্যাস্ত যায় না’। কালের থাবায় সে সাম্রাজ্য আজ ইংল্যান্ড, ওয়েলস ও স্কটল্যান্ডে এসে ঠেকেছে। পুরো যুক্তরাজ্যকে বিবেচনায় নিলে অবশিষ্ট থাকে উত্তর আয়ারল্যান্ড আর পশ্চিম গোলার্ধের ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ।

এ রাজ্যগুলোর মধ্যে সৌন্দর্যের রাণী হলো স্কটল্যান্ড। পাহাড়, ঝর্ণা, লেক, সাগরের অপরূপ মেলবন্ধনে বিধাতা সাজিয়েছেন স্কটল্যান্ডকে। তাই এদেশকে দখলে আগ্রহী ছিলেন বিভিন্ন যুগের ক্ষমতাধর নৃপতিগণ। এদের ঠেকাতে প্রতিরক্ষাব্যুহ হিসেবে স্কটল্যান্ডের বড় শহরগুলোতে গড়ে তোলা হয়েছে দুর্ভেদ্য দূর্গ। এদের মধ্যে আমার এডিনবরা, সেন্ট এন্ড্রুজ ক্যাসেল দেখার সুযোগ হয়েছিল।

লিজ ট্রাস যে দুর্গে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন, সে Balmoral Castle ঘিরে রয়েছে বিতর্কের ইতিহাস। ১৮৫২ সালে ব্রিটিশ রাণী ভিক্টোরিয়ায় স্বামী (প্রিন্স আলবার্ট) ফার্গুহাসন পরিবার থেকে এ দুর্গটি খরিদ করেন। এর খরিদমূল্য ছিল বত্রিশ হাজার ব্রিটিশ পাউন্ড। অপার সৌন্দর্য ছাড়াও তুলনামূলক কম তাপমাত্রার কারণে অবকাশ যাপনে রাজপরিবারের প্রথম পছন্দ ছিলো স্কটল্যান্ড।

পশ্চিম এবারডীনের ৮০ কিলোমিটার দুরত্বের দুর্গটি খরিদ করার পর আলবার্ট অনুধাবন করেন যে এর কক্ষসংখ্যা অপ্রতুল এবং এর গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার অপরিহার্য। এ কাজে তিনি নিয়োগ দিলেন সে সময়ের প্রখ্যাত (রাজ অনুগতও বটে) স্থপতি উইলিয়াম স্মিথকে। উইলিয়ামের বাবা স্থপতি জন (John Smith) ১৮৩০ সালে এ দুর্গের নকশা তৈরি করেন। দুঃখের বিষয় উইলিয়াম স্মিথের নকশাটি প্রিন্স আলবার্টের পুরোপুরি মনমতো হলো না। তিনি এর জানালাসহ কিছু কিছু এলাকায় পরিবর্তন আনলেন। ১৮৫৩ সালে এর নতুন করে নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং মূলত, গ্রানাইট ও শ্লেটে তৈরি এ দুর্গের নির্মাণকাজ ১৮৫৬ সালে শেষ হয়। এ সময়ে প্রিন্স আলবার্ট স্থপতি উইলিয়ামকে এবারডীনের ‘সিটি আর্কিটেক্ট’ এর পদটি তোফা হিসেবে দান করেন।

এতে সংক্ষুদ্ধ হন এবারডীন নগরীর আরেক বিশিষ্ট স্থপতি জন বার্নস (John Burns)। তিনি অভিযোগ করলেন, বালমোর দুর্গের নকশাটি মূলত তাঁর। উইলিয়াম চৌর্যবৃত্তির (plagiarism) আশ্রয় নিয়ে নকশাটি তৈরি করেছেন। সেকালেতো বটেই একালেও রাজপরিবারের অনুকম্পা প্রার্থী শিল্পী, পেশাজীবিদের কমতি নেই। অভিযোগ প্রমাণ করে নগর স্থপতির পদটি বাগানোর দুরভিসন্ধি ছিলো তার। রাণীপতি আলবার্ট সে অভিযোগকে আমলে নিলেন না। উইলিয়াম তাঁর পদে অধিষ্ঠিত রইলেন।

এ প্রসঙ্গে আমার জীবনের একটি অনাহূত অভিজ্ঞতার বর্ণনা করছি। ২০০৮ সালে স্কটল্যান্ডের ডান্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে আমার গবেষণা নির্দেশক প্রফেসর আ্যলিস বেলচারের আনুকূল্যে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকের ছাত্রদের ফাইনাল টার্ম পরীক্ষার হল পর্যবেক্ষণের কাজ পাই। এ কাজ সাধারণত শিক্ষক না করে উচ্চতর শ্রেণির ছাত্ররাই করে থাকেন। এর জন্য ঘণ্টাপ্রতি পারিশ্রমিক ছিল সাড়ে সাত পাউন্ড। নবীন পর্যবেক্ষকদের হল পর্যবেক্ষণের আগে এক্সাম অফিসের ম্যানেজারের কাছে যেতে হলো। হল পর্যবেক্ষণের নিয়ম-নীতি তার কাছ থেকে তালিম নিতে হবে। তিনি প্রযুক্তির আশ্রয় নিয়ে আমাদের একের পর এক নিয়ম বর্ণনা করতে লাগলেন। এর একটি ছিল, ‘কোনো ছাত্র পরীক্ষাকালীন সময়ে ওয়াশরুমে গেলে পুরুষ পর্যবেক্ষক তাঁকে অনুসরন করবেন। ছাত্রীর ক্ষেত্রে নারী পর্যবেক্ষকের তাই কর্তব্য’।

উত্তেজনাবশত আমি দাঁড়িয়ে বললাম— ‘এটি কি কোন সভ্য নিয়ম হলো?’ 
তিনি তাঁর প্রশান্ত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তুমি ঠিকই বলেছো। শুরুতে এ অদ্ভুত নিয়ম আমাদের নীতি সংহতি ছিল না। তবে অনিবার্য কারণে এটি আমাদের নীতি-সংহিতায় যোগ করতে হয়েছে।’
তাঁর মুচকি হাসি বলে দিলো তাঁর কথার তীর এশিয়ানদের প্রতি। চাকরিদাতার সঙ্গে চাকরিপ্রার্থীর বচসা চলে না। তাই কথা না বাড়িয়ে নিবিষ্ট মনে তাঁর বাকি কথা শুনলাম।

লিজ ট্রাসকে অভিনন্দন। চ্যালেন্জার ঋষি সোনাকের জন্য রলো গভীর সহানুভূতি। তাঁর টোরি পার্টির সাংসদদের ভোটে তিনি লিজকে ১৩৭-১১৩ ব্যাবধানে হারিয়েও দলের ডেলিগেটদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারলেন না। ডেলিগেটদের আশীর্বাদ পেলে তিনি হতেন প্রথম ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী। অতিধনী-অতি তামাটে (Too Rich Too Brown) বৃত্তবন্দী হওয়ায় এবার তাঁর ভাগ্যে শিকে ছিড়লো না। তাঁর কোটিপতি স্ত্রী ইনফসিসের বিলিনয়ার মালিক নারায়ণা মূর্তির কন্যা অক্সথা মূর্তির (Akshata Murti) অতিরিক্ত ধন সম্পদ তাঁর জন্য কাল হলো।

অক্সতা শব্দের মানে হলো অমর নারী। কোনো সন্দেহ নেই যে স্বামীর প্রধানমন্ত্রী হবার পথে কাঁটা হওয়া এ নারীর নাম ইতিহাসে অমর-অক্ষয় হয়ে থাকবে।

বিদায় বরিস জনসন। ২০০৮ সালে যখন আপনি লন্ডনের মেয়র পদে দাঁড়ালেন, তখন জনগণ আপনার অতিরিক্ত মাদকাসক্তি নিয়ে কথা তুলেছিলো। আপনি কথা দিয়েছিলেন, আপনি পরিমিত মদ্যপান করবেন। জনগণ বিশ্বাস করে শুধু আপনাকে মেয়ব নয়, ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিটের প্রধানমন্ত্রীর আবাস আপনাকে উপহার দিয়েছিলো। স্বয়ং ঈশ্বর অতিমারি করোনার সময় আপনাকে দ্বিতীয়বার জীবন দিয়েছিলেন। কিন্তু আপনি বদলালেন না। এবার আর রাষ্ট্রীয় আচারের বাধা নেই। তবে পরমায়ু লাভ যদি আপনার এ মুহূর্তের লক্ষ্য হয়, তবে আপনাকে বদলাতে হবে।

লেখক: অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল কবীর, উপাচার্য, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

/এএস