Dhaka Mail Logo

মতামত

আলো জ্বলুক, হিসাবও থাকুক

০৮ নভেম্বর ২০২৬, ১২:১১ পিএম

নভেম্বরের সকালটা এ দেশে বরাবরই একটু আলসেমি মাখানো, তবে আজকের রবিবাসরীয় সূর্যটা যেন একটু বেশিই চটপটে। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে খবরের কাগজের পাতা থেকে উঁকি দিল গতকালের মহোৎসব-জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস। নয়াপল্টন থেকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ পর্যন্ত যে জনস্রোত নামল, তা দেখে মনে হচ্ছিল যেন কার্তিক মাসের ধানখেতে হঠাৎ উত্তাল বাতাস লেগেছে।

আমাদের রাজনীতির কর্তারা মঞ্চে দাঁড়িয়ে যখন হাঁকডাক ছাড়লেন যে, ‘জনগণের অধিকার আর কেউ কাড়তে পারবে না’, তখন এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা গাঁয়ের গ্রাম পুলিশটি হয়তো মনে মনে হাসছিল। হাসবারই কথা, তার পকেটে যে তখন নতুন বেতনের খসখসানি-সাড়ে সাত হাজার থেকে একলাফে সাড়ে দশ হাজার! একেই বলে বিপ্লবের মিষ্টি স্বাদ। সঙ্গে বেড়েছে অবসর ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা।

গ্রামের যে মানুষটি রাত জেগে পাহারা দেন, তাঁর পকেটে তিন হাজার টাকা বেশি আসা নিছক পরিসংখ্যান নয়, সংসারের হাঁড়িতে একটু বেশি ভাতের নিশ্চয়তা। আর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউর ‘কনসার্ট ফর সলিডারিটি’-তে জেমস, মাইলস আর ওয়ারফেজের গিটারে যখন টান পড়ল, তখন রাজনীতির সেই গুরুগম্ভীর বচনগুলো তরুণদের করতালির নিচে চাপা পড়ে স্রেফ সুরেলা বাষ্পে পরিণত হলো।

এদিকে সামাজিক মাধ্যমের অলিতে-গলিতে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে এক অদ্ভুত গুঞ্জন। ক্যালেন্ডারের পাতা বলছে আজ ৮ নভেম্বর, রোববার। অথচ কালকের ছুটির রেশ কাটিয়ে আপামর ছাত্রসমাজ আর চাকরিজীবীদের একটা বড় অংশ গোঁ ধরে বসে আছে-আজও নাকি ছুটি! কেউ বলছেন শ্যামাপূজার ঐচ্ছিক ছুটি, কেউবা তিন দিনের টানা ছুটির দিবা স্বপ্নে বিভোর। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটির তালিকায় দিনটি থাকলেও সরকারি অফিসের জন্য এটি সাধারণ ছুটি নয়; হিন্দু সরকারি কর্মচারীদের জন্য ঐচ্ছিক ছুটি। অর্থাৎ কারও ছুটি, কারও কর্মদিবস-একই ক্যালেন্ডারে দুই রকমের জীবন!

এরই মধ্যে ঢাকার যানজট ও ব্যাটারিচালিত রিকশার বেপরোয়া চলাচল নিয়ে তৈরি ‘বাপের রাস্তা’ নামের অনলাইন গেমটি সামাজিক মাধ্যমে বেশ আলোড়ন তুলেছে। আফসোস, রূপালী পর্দার আড়ালে বসে থাকা কোনো এক চতুর হ্যাকার যখন বিন্যান্স থেকে এক ঝটকায় ৬.৩ বিলিয়ন ডলার হাওয়া করে দিল, তখন আমাদের ঘরের যুবকেরা ফেসবুকে স্ক্রল করে খুঁজছে আজ স্কুল-কলেজ খোলা কিনা। ওইদিকে সোনার ভরি যখন সগর্বে দুই লাখ ছাব্বিশ হাজার নয়শ তেইশ টাকার পাহাড়ে চড়ে বসে মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস তুলছে, তখন সিলিকন ভ্যালিতে অ্যাপল কোম্পানি তাদের নতুন 'এম সিক্স' প্রসেসরের ম্যাকবুক প্রো বাজারে ছাড়ার বন্দোবস্ত করছে। যেন এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের মেলা!

আমরা সোনার হরিণ ধরতে না পেরে রুপার অলংকারে সান্ত্বনা খুঁজছি, আর দুনিয়া ছুটছে চিপ আর ডেটা, কোড আর ক্রিপ্টোকারেন্সিতে। একই পৃথিবী, অথচ মানুষের দুশ্চিন্তার মুদ্রা কত বিচিত্র!

সম্পাদকীয় পাতায় চোখ রাখলে উন্নয়নের দুটি বড় হিসাব সামনে আসে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ১২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার এই কেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের আগে আরও কয়েক ধাপ পরীক্ষা ও নিরাপত্তা যাচাই বাকি। বিদ্যুৎ আসবে, কিন্তু তার সঙ্গে আসবে প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা, ব্যবস্থাপনা ও ব্যয়ের দীর্ঘ হিসাব। আলো জ্বালানোর আনন্দে যেন বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকৃত খরচ ও দায়বদ্ধতার অঙ্কটি আড়াল না হয়।

অন্যদিকে জাতিসংঘের সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের সময়সীমা ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। তিন বছর অতিরিক্ত সময় পাওয়া নিঃসন্দেহে স্বস্তির। কিন্তু দরিদ্র দেশের পরিচয় আরও কিছুদিন বহাল রাখার মধ্যে আনন্দ খোঁজার চেয়ে এই সময়টুকু কাজে লাগানোই বুদ্ধিমানের কাজ।

রফতানি বহুমুখীকরণ, রাজস্ব আহরণ, কর্মসংস্থান ও শিল্পের উৎপাদনশীলতা না বাড়লে সময় বাড়বে, সক্ষমতা বাড়বে না। পরীক্ষার হলে অতিরিক্ত সময় পাওয়া যায়, কিন্তু উত্তরপত্রে ভালো উত্তর না লিখলে নম্বর বাড়ে না।

চোখটা যখন আন্তর্জাতিক পাতায় গিয়ে ঠেকল, তখন বুকটা ধক করে উঠল। ‘স্টার ট্রেক’-এর ক্যাপ্টেন জঁ-লুক পিকার্ড এবং ‘এক্স-মেন’-এর প্রফেসর এক্স চরিত্রে যিনি কোটি দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন, সেই ব্রিটিশ অভিনেতা স্যার প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট ৮৬ বছর বয়সে পৃথিবীর মঞ্চ ছেড়ে চলে গেছেন। তার গম্ভীর কণ্ঠ, স্থির অভিনয় আর মঞ্চের দীর্ঘ সাধনা দর্শকের স্মৃতিতে থেকে যাবে।

ওদিকে মিরপুর টেস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্পিনারদের ঘূর্ণিতে আমাদের ব্যাটসম্যানরা যখন খাবি খাচ্ছে, তখন যেন মনে হচ্ছিল এই পতন শুধু উইকেটের নয়, এক একটা বিশ্বাসের। ফিফা অনূর্ধ্ব-১৫ দলের ছেলেরা রানার্স-আপ হয়ে মাঠ ছাড়ার সময় যে কান্নাটা লুকোচ্ছিল, তা হয়তো আমাদের ক্রিকেটের বড় বড় তারকাদের চোখেও আজ দেখা দেওয়া উচিত ছিল।

জীবনের এই হিসাবটা বড় অদ্ভুত। কারও কাছে তিন হাজার টাকা বেতন বৃদ্ধি একরাশ স্বস্তি, অন্যদিকে Binance-এর বিপুল অর্থ চুরির ঘটনা দেখিয়ে দিল, আধুনিক প্রযুক্তি যত দ্রুত এগোয়, তার নিরাপত্তার ফাঁকফোকরও তত বড় ঝুঁকি তৈরি করে। কেবল ডিজিটাল সম্পদ নয়, মানুষের বিশ্বাসও সেখানে বিপন্ন হয়। প্রযুক্তির এই বিস্ময়কর যুগে মানুষ মহাকাশে ঘাঁটি বানানোর স্বপ্ন দেখছে, অথচ নিজের ডিজিটাল ভল্টের চাবি সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছে।

লেখক: সাবেক সিনিয়র সচিব।