Dhaka Mail Logo

মতামত

বদলায় ক্ষমতা, বদলায় না সাধারণ মানুষের ভাগ্য

০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০২:২৫ পিএম

কার্তিকী সকালের মিঠে রোদ গায়ে মেখে যখন চায়ের কাপে প্রথম চুমুক দিচ্ছি, তখন ক্যালেন্ডার জানান দিল আজ ৭ নভেম্বর ২০২৬, শনিবার। বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি বহুল আলোচিত দিন। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ফিরে এসেছে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’। সরকারি ছুটির সুবাদে কর্মব্যস্ত মানুষ আজ একটু আয়েশ করার সুযোগ পেয়েছেন। যদিও ছুটির বাজারে একটুখানি নুন কম পড়েছে, কারণ দিনটি পড়েছে এমনিতেই আয়েশি শনিবারের ঘাড়ে! তবে ঢাকাবাসী গাড়িচালকদের জন্য সকাল সকাল একটা চমৎকার উপরি পাওনা ছিল—ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে সকাল ছয়টা থেকে দুপুর বারোটা পর্যন্ত ছয় ঘণ্টা কোনো টোল ছাড়াই গাড়ি ছুটেছে। রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাঁর বাণীতে রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে জাতীয় ঐক্য ও বৈষম্যহীন দেশ গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাণীতে ছিল স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ ভাবনার দৃঢ় উচ্চারণ। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর নিয়ে ইতিহাসের ব্যাখ্যা অবশ্য একেকজনের কাছে একেক রকম। কারও কাছে সিপাহি-জনতার বিপ্লব, কারও কাছে সামরিক অভ্যুত্থান, আবার কারও কাছে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা। ইতিহাসের এই বহুমাত্রিক পাঠই বোধ হয় তার আসল মজা; তবে ইতিহাসের পাতায় নিজের পছন্দের রং লাগাতে গিয়ে যেন কালির বদলে আলকাতরা না ঢেলে বসি!

ছুটির দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভার্চুয়াল চায়ের দোকানেও আড্ডার কমতি নেই। একদিকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিনের বক্তব্য ঘিরে ৭ নভেম্বরের ইতিহাসে জাসদ ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার ভূমিকা নিয়ে শুরু হয়েছে বেশ চুলচেরা বিশ্লেষণ। নেটজনতার কেউ কেউ এমনভাবে ইতিহাসের দলিলপত্র ঘাঁটছেন, মনে হয় প্রত্যেকেই একেকজন মহাফেজখানার জাঁদরেল কেরানি! অন্যদিকে পুলিশের আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’সংক্রান্ত বক্তব্য এবং পরে তা থেকে সরে আসার ঘটনাটি আবার আলোচনায় এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানের বক্তব্য—সরকারের নির্দেশ হলেও কোনো সরকারি কর্মচারী বেআইনি আদেশ পালন করতে বাধ্য নন—এ প্রসঙ্গে নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। কথাটা শুনে মনে হয়, সরকারি চাকরির নিয়োগপত্রে বুঝি এবার নতুন একটি শর্ত যোগ হবে: বিবেকের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক! 

সামাজিক মাধ্যমে গাইবান্ধার গোলাপী বেগমের ঘটনাটি ভাইরাল হওয়া আরেকটি নির্মম আলোচিত বিষয়। চুরির অভিযোগে ৬৫ বছর বয়সী এক নারীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতনের ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। অভিযোগ সত্য কি মিথ্যা, তার বিচার করবে আইন; কিন্তু একজন অসহায় মানুষকে এভাবে শাস্তি দেওয়ার অধিকার কারও নেই। এদিকে দেশের হাম পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। ৬ নভেম্বর সকাল পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় আরও চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে। সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত মৃত্যুর সম্মিলিত সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৭৬। সংখ্যাটি কেবল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি পরিসংখ্যান নয়, প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবারের কান্না। শীতের আগমনী বার্তাও এসেছে আবহাওয়া অধিদপ্তরের কাছ থেকে—নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত চার থেকে ছয়টি শৈত্যপ্রবাহ হতে পারে, যার মধ্যে দুই থেকে তিনটি তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে; বঙ্গোপসাগরে এক থেকে দুটি ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাবনাও আছে।

সম্পাদকীয় পাতায় চোখ রাখলে বোঝা যায়, সংবাদপত্রের কলম আজকাল বেশ ধারালো। দ্য ডেইলি স্টার হাম প্রতিরোধে টিকার সরবরাহ ঘাটতি দূর করার পাশাপাশি অতীতের ব্যর্থতার তদন্তের সঙ্গে বর্তমান ব্যবস্থাপনার দায়ও নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে। আরেক সম্পাদকীয়তে বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে প্রতারণা ও মানব পাচার বন্ধে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, মধ্যস্বত্বভোগী এবং সরকারি সংস্থাগুলোর জবাবদিহির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কম্বোডিয়া ও রাশিয়াসহ কয়েকটি দেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে নতুন যাচাইব্যবস্থা চালু হলেও প্রশ্ন থেকে যায়—একজন মানুষ জমিজমা বিক্রি করে, ঋণ করে বিদেশে যাবেন, আর সেখানে গিয়ে প্রতারকদের হাতে বন্দি হবেন, এমন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার নাম কী? এদিকে ৩০তম ইউএস ট্রেড শোতে দেশের চিকিৎসা সরঞ্জামশিল্প নিয়ে এসেছে আশাব্যঞ্জক সম্ভাবনার খবর। সরকারি স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারীর মতে, দেশে চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে ৮ থেকে ৯ বিলিয়ন ডলারের বাজার তৈরি হতে পারে। ওষুধের ৯৫ শতাংশের বেশি আমরা নিজেরাই তৈরি করি, অথচ হাসপাতালের বহু যন্ত্রপাতির জন্য বিদেশের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। নিজের বাড়িতে ভাত রান্না হয়, কিন্তু ভাত খাওয়ার থালাটি কিনতে হয় বিদেশ থেকে—ব্যাপারটা কিছুটা সে রকম! এর মধ্যে এলপিজির বাজারে নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা বেশি দিয়ে সিলিন্ডার কেনার অভিযোগও ভোক্তাদের অস্বস্তি বাড়াচ্ছে। বাজারের কারসাজি, স্বাস্থ্যসেবার দুর্বলতা আর বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রতারণা—তিনটি আলাদা সমস্যা হলেও সাধারণ মানুষের পকেট ও নিরাপত্তার ওপর এদের আঘাত একই রকম।

সাতসমুদ্দুর তেরো নদীর ওপারেও রাজনৈতিক হিসাবের খাতা নতুন করে খুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বড় ধাক্কা খাওয়ার ফলে হোয়াইট হাউসের বাসিন্দাকে আগামী দুই বছর কংগ্রেসের সঙ্গে বেশ হিসাব করে চলতে হবে। ক্ষমতার অঙ্কে এমন পালাবদল দেখে মনে হয়, গণতন্ত্রের ক্যালকুলেটরটি মাঝে মাঝে বেশ অপ্রত্যাশিত ফল দেখায়! অন্যদিকে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আবাসিক ভবন ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আহত হয়েছেন অন্তত দুজন। আর আগামী ৯ নভেম্বর তুরস্কের আনতালিয়ায় শুরু হচ্ছে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন COP31. জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানো এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য অর্থায়ন নিয়ে বিশ্বনেতারা আবারও আলোচনার টেবিলে বসবেন। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ধনী দেশগুলোকে প্রতিশ্রুতির বাইরে গিয়ে বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর প্রস্তাবের মধ্যে জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলোর অতিরিক্ত মুনাফার ওপর কর আরোপ করে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে সহায়তা করার কথাও রয়েছে। বড় সাহেবদের সম্মেলন হবে, ভাষণ হবে, ছবি তোলা হবে; তারপর কে কতটা কথা রাখবেন, সেটিই দেখার বিষয়। সমুদ্রের পানি যখন দরিদ্র দ্বীপদেশের উঠোনে ঢুকে পড়ে, তখন জলবায়ু আলোচনার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষের আরামটুকু দিয়ে তাদের ঘর বাঁচানো যায় না।

দিন শেষে ইতিহাস, রাজনীতি আর বিদেশের এই বিচিত্র কাণ্ডকারখানা দেখতে দেখতে মনে হয়, ক্ষমতার মসনদ বদলায়, ক্যালেন্ডারের ছুটির রং বদলায়, সম্পাদকীয়ের ভাষা বদলায়; কিন্তু সাধারণ মানুষের কপাল আর চায়ের কাপের চড়া দামটা বড় একটা বদলায় না। আজ যারা ৭ নভেম্বরের জয়ধ্বনি দিচ্ছেন, যারা ইতিহাসের পাতা নতুন করে পড়ছেন, কিংবা যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন—সবার কাছেই একটি বিনীত নিবেদন। ইতিহাস কোনো তৈলাক্ত বাঁশ নয় যে তাতে প্রতিদিন নতুন রঙের তেল মাখিয়ে ওপরে ওঠার প্রতিযোগিতা করতে হবে। ইতিহাস আয়না; সেখানে নিজের আসল চেহারাটা দেখতে না পারলে দিনশেষে কেবল মুখোশটাই চকচক করবে। বিপ্লবের সার্থকতা ক্ষমতার পালাবদলে নয়, মানুষের জীবনে পরিবর্তনে। ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে হলে ইতিহাসের নামে নয়, মানুষের পাশে দাঁড়িয়েই তার প্রমাণ দিতে হবে।