Dhaka Mail Logo

মতামত

শ্রমিকের ন্যায্য দাবির আড়ালে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অপচেষ্টা?

০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৫০ এএম

রাজধানীর মিরপুরে পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যে সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা কেবল একটি শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। 

শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও জীবনমান উন্নয়নের দাবি যেমন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন, তেমনি সেই দাবিকে পুঁজি করে কেউ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ ও জনজীবনে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে কি না, সেটিও গভীরভাবে অনুসন্ধান করা জরুরি। কারণ শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন এবং সেই আন্দোলনের আড়ালে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংসের কর্মকাণ্ড এক বিষয় নয়।

পোশাকশিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এ শিল্পের কয়েক মিলিয়ন শ্রমিকের শ্রম ও ঘামের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে দেশের রপ্তানি আয়ের একটি বড় অংশ। অথচ এই শিল্পের শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়, খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ও সন্তানদের শিক্ষার খরচ বিবেচনায় নিলে মজুরি বৃদ্ধির দাবি যে বাস্তবসম্মত ও যৌক্তিক, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। একজন শ্রমিকের ন্যূনতম আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু মালিকপক্ষের দায়িত্ব নয়, এটি রাষ্ট্রেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সাত মাসের মধ্যে পোশাকশ্রমিকদের মজুরি পুর্র্নিধারণে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। ১ নভেম্বর শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে মালিক, শ্রমিক ও নিরপেক্ষ প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে বোর্ড গঠনের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়। 

বোর্ডের দায়িত্ব হচ্ছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে নতুন ন্যূনতম মজুরি কাঠামোর সুপারিশ তৈরি করা। শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ। তবে বোর্ড গঠনই শেষ কথা নয়; শ্রমিকদের প্রত্যাশা ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মজুরি নির্ধারণই হবে এর প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি।

এখানেই স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে, শ্রমিকদের দাবি বিবেচনায় নিয়ে যখন সরকার মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে এবং মালিকপক্ষও এ প্রক্রিয়ায় সম্মতির কথা জানিয়েছে, তখন আন্দোলন কেন ক্রমেই সহিংসতার দিকে গড়াল? 

দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলন, প্রতিবাদ ও কর্মসূচি গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু সেই অধিকার প্রয়োগের নামে পুলিশের ওপর হামলা, গাড়িতে আগুন, সড়ক অবরোধ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর কিংবা সাধারণ মানুষের চলাচল বন্ধ করে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

১ নভেম্বর মিরপুরে শ্রমিকদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, সড়ক অবরোধ ও পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতির কারণে মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও পল্লবী এলাকায় সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হয়। মেট্রোরেল স্টেশনে কয়েক ঘণ্টা ট্রেনের যাত্রাবিরতি বন্ধ রাখতে হয়। 

রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এই যোগাযোগব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ায় কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগে পড়তে হয়। একটি শিল্পের শ্রমিকদের দাবি আদায়ের আন্দোলনে যখন হাজারো নিরপরাধ মানুষ ভোগান্তির শিকার হন, তখন সেই আন্দোলনের কৌশল ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খানের বক্তব্য অনুযায়ী, সহিংসতার ঘটনায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের ১১ জন নেতাকর্মীকে ডিবি গ্রেফতার করেছে। 

পুলিশের দাবি, গ্রেফতার ব্যক্তিরা স্থানীয় পোশাকশ্রমিক নন; বরং বরিশাল, পটুয়াখালী, কক্সবাজার ও গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে এসে আন্দোলনের আড়ালে নাশকতায় অংশ নিয়েছেন। পুলিশের পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা সাধারণ শ্রমিকদের আন্দোলনে অনুপ্রবেশ করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার চেষ্টা করেছেন। 

এই অভিযোগগুলো সত্য হলে তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। কারণ রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ কোনো সংগঠনের নেতাকর্মীরা যদি শ্রমিকদের প্রকৃত অসন্তোষকে ব্যবহার করে সহিংসতা ছড়ানোর চেষ্টা করেন, তাহলে তাতে একদিকে শ্রমিকদের ন্যায্য আন্দোলন প্রশ্নবিদ্ধ হবে, অন্যদিকে দেশের শিল্প ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও হুমকির মুখে পড়বে। তবে তদন্তের আগেই সব আন্দোলনকারীকে রাজনৈতিক কর্মী কিংবা নাশকতাকারী হিসেবে চিহ্নিত করাও সমীচীন নয়। প্রকৃত শ্রমিকদের সঙ্গে বহিরাগত উসকানিদাতাদের পার্থক্য শনাক্ত করাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য বড় দায়িত্ব।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন এসেছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলন হয়েছে। এসব আন্দোলনের অনেকগুলোর পেছনে ছিল বাস্তব সমস্যা ও অধিকার আদায়ের আকাঙ্ক্ষা। তবে সেইসব আন্দোলনেও আওয়ামী লীগ অনুপ্রবেশ করে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের অপচেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। 

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প শুধু একটি উৎপাদন খাত নয়; এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি। এই শিল্পে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা, উৎপাদন কার্যক্রম ও রপ্তানি সরবরাহব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। শেষ পর্যন্ত তার চাপ গিয়ে পড়বে শ্রমিকদের ওপরই। কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হলে শ্রমিকের আয় কমবে, কর্মসংস্থান অনিশ্চিত হবে এবং দেশের অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সুতরাং শ্রমিকদের দাবি পূরণের পাশাপাশি শিল্পের নিরাপদ পরিবেশ বজায় রাখাও অত্যন্ত জরুরি।

এ ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব দ্বিমুখী। একদিকে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে মজুরি বোর্ডকে দ্রুত ও স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, বাসাভাড়া, খাদ্য ও চিকিৎসার খরচ বিবেচনায় নিয়ে বাস্তবসম্মত মজুরি নির্ধারণ করতে হবে। 

অন্যদিকে আন্দোলনের নামে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর, পুলিশের ওপর হামলা কিংবা রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংসের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনতে হবে। কোনো নিরপরাধ শ্রমিক যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হতে দেওয়া যাবে না। শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি একটি অর্থনৈতিক ও মানবিক দাবি; এটি কোনো দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়। এই দাবিকে কেন্দ্র করে কেউ যদি পরিকল্পিতভাবে সহিংসতা সৃষ্টি করে, তাহলে সরকার কঠোর হবে এটাই স্বাভাবিক।

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় স্থিতিশীলতা রক্ষা করা যেমন জরুরি, তেমনি শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠাও অপরিহার্য। এই দুইয়ের মধ্যে সংঘাত তৈরি না করে সমন্বয় ঘটানোই সরকারের প্রধান দায়িত্ব। 

মিরপুরের ঘটনাকে তাই শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে নয়, শ্রমিক আন্দোলনের পবিত্রতা, রাজনৈতিক দায়িত্বশীলতা এবং রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার প্রশ্ন হিসেবেও দেখতে হবে। শ্রমিকের হাতে ন্যায্য মজুরি পৌঁছাতে হবে, আর শ্রমিকের পরিচয় ব্যবহার করে যারা সহিংসতা ও নাশকতা চালাবে, তাদের আইনের মুখোমুখি করতে হবে। 

শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক, কিন্তু সেই অধিকারের আড়ালে রাষ্ট্র ও অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করার কোনো অপচেষ্টা যেন সফল না হয়।

লেখক: প্রধান প্রতিবেদক, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)