০২ নভেম্বর ২০২৬, ১১:১৮ এএম
সালাম ও সুপ্রভাত। কার্তিকের কুয়াশা-জড়ানো সকালে যখন অনলাইন এবং দৈনিকের পাতায় দেশ দুনিয়া দেখে বেড়াচ্ছি, মনে হলো আমাদের এই বদ্বীপের জীবনটা এক অদ্ভুত কিসিমের পাঁচফোড়ন-তেতো, মিষ্টি, ঝাঁঝালো; সব স্বাদই আছে, শুধু কোনটি কখন মুখে পড়বে তার ঠিক নেই। সংবাদপত্রের পাতা থেকে অবাধ্য মনটি বারবার আটলান্টিক পেরিয়ে ইউরোপ-আমেরিকার দিকে ডানা মেলছে। আমেরিকার আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে আমাদের এখানে যে পরিমাণ চুলচেরা বিশ্লেষণ, তাতে ট্রাম্প কিংবা ডেমোক্র্যাটদের ভাগ্য নির্ধারণে বুড়িগঙ্গার তীরের মানুষেরও বুঝি কিছুটা ভূমিকা আছে! অথচ দেশের ঘরের খবরই কম কী?
মিরপুর, আশুলিয়া ও গাজীপুরে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে আন্দোলন, সংঘর্ষ, সড়ক অবরোধ ও উৎপাদন বন্ধের ঘটনায় এক দিনে ৫২৯টি কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; প্রায় দশ লাখ শ্রমিকের কাজ ব্যাহত হয়েছে বলে শিল্পমালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর তথ্য। পাওয়া যাচ্ছে ডিসেম্বর কেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার গন্ধ! সরকার ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন করেছে, প্রধানমন্ত্রী উৎপাদন অব্যাহত রাখতে এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন।
শ্রমিকের পেটে ভাত না থাকলে শিল্পের চাকা ঘুরবে কী দিয়ে, আবার কারখানায় আগুন, ভাঙচুর কিংবা সহিংসতা হলে মজুরির আসবে কোত্থেকে? তবে কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল পে-স্কেল দেওয়ার আগেই এই বিষয়টি ভাবা। তবে আর সময় নষ্ট না করে মালিক, শ্রমিক ও সরকারের ত্রিপক্ষীয় আলোচনায় দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করতে হবে।
এই মজুরির হিসাবের পাশেই রাজনীতির হিসাবের খাতা খুলে বসেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবি। ৩২টি রাজনৈতিক দলের ওপর পরিচালিত গবেষণায় অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, অর্থায়নের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং দলীয় নেতৃত্বে অংশগ্রহণের ঘাটতি উঠে এসেছে। দলীয় আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ, নিয়মিত কাউন্সিল এবং নেতৃত্ব নির্বাচনে গোপন ব্যালটের সুপারিশও করেছে সংস্থাটি। রাজনীতির দোকানে গণতন্ত্রের সাইনবোর্ড ঝুললেই ভেতরে গণতন্ত্রের চর্চা হয় না-এই পুরোনো কথাটি আবার মনে করিয়ে দিল প্রতিবেদনটি। এদিকে রাজধানীর যানজটের মহাকাব্যে নতুন চরিত্র হিসেবে হাজির হচ্ছে আট রঙের ই-রিকশা।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে আটটি জোনে ভাগ করে প্রতিটি জোনের জন্য আলাদা রঙের রিকশা নিবন্ধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রং দিয়ে এলাকা চেনা যাবে, কিন্তু চালকের প্রশিক্ষণ, যাত্রী নিরাপত্তা, নির্দিষ্ট চলাচলের নিয়ম ও কার্যকর তদারকি নিশ্চিত না হলে যানজটের চরিত্র বদলাবে কি না, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। আজ জাতীয় স্বেচ্ছায় রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদান দিবসও পালিত হচ্ছে-প্রতিপাদ্য, ‘রক্তদানে জীবনের জয়গান, চক্ষুদানে আলোর সন্ধান’। শহীদ মিনার থেকে র্যালি এবং বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।
কী চমৎকার বৈপরীত্য! একদিকে মানুষ নিজের রক্ত দিয়ে অন্যের জীবন বাঁচাতে এগিয়ে আসছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রের নানা প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির রক্তস্বল্পতা কাটছে না।
তারুণ্যের প্রসঙ্গে আজ একটু থামতেই হয়। জাতীয় যুব দিবসের কর্মসূচিতে র্যালি, বৃক্ষরোপণ ও স্বনির্ভরতার আহ্বান আমাদের আশাবাদী করে। কিন্তু কুমিল্লায় দেশীয় অস্ত্র হাতে একদল কিশোর-তরুণের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর চারজনকে আটক করার খবর সেই আশায় খানিকটা ছায়া ফেলে। তাদের মধ্যে তিনজনের বয়স ১৭ বছর বলে পুলিশ জানিয়েছে। তারুণ্যের হাতে বই, প্রযুক্তি, কাজের দক্ষতা ও স্বপ্ন থাকার কথা; অস্ত্র হাতে দলবদ্ধ দাপট দেখানোর কথা নয়।
সামাজিক মাধ্যমে কয়েক সেকেন্ডের ভাইরাল খ্যাতি কখনো কখনো জীবনের দীর্ঘ পথটিকেই অন্ধকার করে দেয়। একই সময়ে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীতে মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়া ৪০ টন সিমেন্টসহ চারজনকে আটক করেছে কোস্টগার্ড।
প্রায় চার লাখ টাকা মূল্যের এই চালানটি জব্দের ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, সীমান্ত ও সমুদ্রপথের নিরাপত্তা শুধু বড় অস্ত্রের বিষয় নয়; ছোট ছোট চোরাচালানও রাষ্ট্রের আইন ও অর্থনীতিকে ফাঁকি দেয়।
চট্টগ্রাম বন্দরে আজ আরেকটি আন্তর্জাতিক যোগাযোগের অধ্যায় শুরু হচ্ছে। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর যৌথ সামুদ্রিক মহড়া ‘ক্যারাট বাংলাদেশ ২০২৬’-এ অংশ নিতে মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজ ইউএসএস ওয়ারিয়র বন্দরে এসে পৌঁছেছে। ২ থেকে ৬ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় এই মহড়ায় দুই দেশের নৌসদস্যরা সমুদ্রপথের নিরাপত্তা, পেশাগত দক্ষতা ও যৌথ কার্যক্রম পরিচালনার অভিজ্ঞতা বিনিময় করবেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এরই মধ্যে নতুন কৌশলগত সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২৯-৩০ অক্টোবরের শীর্ষ সম্মেলনে ‘অ্যালায়েন্স ফর দ্য ফিউচার’ নামে নতুন অংশীদারিত্ব ঘোষণা করেছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের অনুপস্থিতি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে একে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী জোট বলা ঠিক হবে না; বরং বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও নিরাপত্তায় নিজেদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বাড়ানোর উদ্যোগ।
অন্যদিকে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করতে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ২.১ বিলিয়ন ডলারের ৫০০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে। অর্থাৎ একদিকে নতুন অংশীদারিত্বের হাত মেলানো, অন্যদিকে যুদ্ধের ময়দানে আরও ক্ষেপণাস্ত্র পাঠানো-বিশ্ব কূটনীতির পাঁচফোড়নে শান্তি ও সংঘাতের স্বাদ পাশাপাশি পরিবেশিত হচ্ছে।
আজকের লেখায় আলোচনায়ও ঘুরেফিরে এসেছে শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি ও প্রবাসগামী কর্মীদের সুরক্ষা। একটি সম্পাদকীয়তে মজুরি বোর্ডের কাজ দ্রুত শেষ করার পাশাপাশি শ্রমিক অসন্তোষের শান্তিপূর্ণ সমাধানের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। আরেকটি সম্পাদকীয়তে বিদেশে কাজের স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা করা মানুষের প্রতারণা ও শোষণ থেকে সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে। দুটি সম্পাদকীয়র বিষয় আলাদা হলেও মূল প্রশ্নটি এক-যারা শ্রম দিয়ে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখেন, তাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার দায়িত্ব নেবে কে? দেশের কারখানার শ্রমিক হোন কিংবা বিদেশের নির্মাণশ্রমিক, তাদের ঘামের মূল্য নিয়ে রাষ্ট্রের কোনো আপস চলতে পারে না। মজুরি বোর্ডের টেবিলে সিদ্ধান্ত আসতে হবে, আর বিদেশগামী কর্মীর হাতে বিমানবন্দরের টিকিটের পাশাপাশি নিরাপদ কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তাও থাকতে হবে।
আজ কার্তিকের এই শীত-শীত সকালে চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে মনে হলো, পৃথিবীটা গোল; আর আমাদের বাংলাদেশ নামে ছোট্ট ভূখণ্ডটি যেন আরও একটু গোলমেলে। এখানে একই দিনে কেউ রক্ত দিয়ে জীবন বাঁচানোর শপথ নেয়, কেউ অস্ত্র হাতে সামাজিক মাধ্যমে বাহাদুরি দেখায়; কেউ ন্যায্য মজুরির দাবিতে রাজপথে নামে, কেউ আবার সেই শ্রমের ফসল নষ্ট করে। রাজনীতিতে স্বচ্ছতার দাবি ওঠে, অথচ বাস্তবায়নের বেলায় হিসাবের খাতা প্রায়ই বন্ধ থাকে। সবমিলিয়ে বাঙালির জীবনে পাঁচফোড়নের অভাব নেই, শুধু রান্নার হেঁশেলে একটু শৃঙ্খলা দরকার। আজকের প্রত্যাশা, শ্রমিকের দাবি আলোচনায় মিটুক, তরুণেরা সঠিক পথে এগিয়ে যাক, শহরের রাস্তায় নিয়ম ফিরুক এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কথার চেয়ে কাজে বেশি পরিচিত হোক। সপ্তাহের প্রথম দিনটি সবার জন্য নিরাপদ, কর্মময় ও কল্যাণকর হোক।
লেখক: সাবেক সিনিয়র সচিব।