Dhaka Mail Logo

মতামত

অর্থনীতির সম্ভাবনা, জনজীবনের সংকট

২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২৩ এএম

আজকের খবরের কাগজ খুলে দেখি, চায়ের কাপ ঠান্ডা হওয়ার আগেই মন কখনো টগবগ করে, কখনো হিম হয়ে যায়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন, অর্থাৎ প্রায় ৬৩৬ কোটি মার্কিন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সূর্যোদয়ের দেশের সঙ্গে এই অর্থনৈতিক বোঝাপড়া বাস্তবে রূপ নিলে শিল্প, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থানের নতুন দরজা খুলতে পারে। তবে বিনিয়োগের অঙ্ক কাগজে যত বড়ই দেখাক, তার প্রকৃত মহিমা বোঝা যাবে কারখানার চিমনি জ্বললে, তরুণের হাতে কাজ এলে এবং সংসারের মাসিক হিসাবের খাতায় একটু স্বস্তি ফিরলে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আসল পরীক্ষা করমর্দনের ছবিতে নয়, সাধারণ মানুষের জীবনে তার ফল কতখানি পৌঁছাল, তাতেই।

এই আশাবাদের পাশেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স ধর্মঘটের খবর যেন এক বালতি ঠান্ডা জল। হাসপাতালে অসুস্থ মানুষটির কাছে অ্যাম্বুলেন্স কোনো বিলাসবহুল মোটরগাড়ি নয়, অনেক সময় জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা শেষ বাহন। সেখানে ধর্মঘটের জাঁতাকলে রোগী ও স্বজনের অসহায়তা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দরকষাকষিরও একটা মানবিক সীমা আছে। জুলাই অভ্যুত্থানে আহতদের চিকিৎসায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও গাফিলতি বন্ধের নির্দেশও তাই শুধু প্রশাসনিক আদেশ হয়ে থাকলে চলবে না; চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পেতে তাঁদের যেন দরজায় দরজায় ঘুরতে না হয়। অন্যদিকে নওগাঁর হাটে শীতকালীন সবজির সরবরাহ বেড়ে দাম কমার খবর কিছুটা স্বস্তি দেয়। একদিকে কৃষকের মাঠ থেকে বাজারে সবজি আসে, অন্যদিকে পরিবহন ও বাজারব্যবস্থার নানা স্তরে চাঁদাবাজির অভিযোগে সেই স্বস্তির কতটা যে উবে যায়, তা যুগান্তরের ‘থামছেই না চাঁদাবাজি’ সম্পাদকীয়তে উঠে এসেছে। অর্থনীতির অঙ্কে উৎপাদন বাড়লেই হবে না, মাঝপথের অদৃশ্য টোলঘরগুলোও বন্ধ করতে হবে। নইলে কৃষকের ঘাম সস্তা, ক্রেতার বাজার চড়া—এই অদ্ভুত হিসাবের সমাধান মিলবে কোথায়?

সমাজমাধ্যমের উঠোনে ততক্ষণে নেটপাড়ায়—দুই কাণ্ডে বেশ গোলমাল। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের লগি-বৈঠার রক্তাক্ত স্মৃতি ঘিরে জামায়াতের স্মরণসভা, দোয়া ও রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়ে চলছে আলোচনা; পাশাপাশি শাঁখারী বাজারের পূজামণ্ডপে এক মুসলিম তরুণীর উলুধ্বনি দেওয়ার ভিডিওকে কেন্দ্র করে কেউ সম্প্রীতির প্রশংসা করছেন, কেউ সংস্কৃতির ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। বাঙালি ঘটনা দেখার আগেই তার পক্ষে-বিপক্ষে মিছিল সাজাতে পারে, এ এক বিরল প্রতিভা। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া আর ঘটনার সব তথ্য যাচাই হয়ে যাওয়া এক কথা নয়। একই নেটপাড়ায় মেট্রোরেলে এক যাত্রীর অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর খবর মানুষের উদাসীনতা নিয়ে ক্ষোভ তুলেছে; ঘটনাটির বিবরণ যাচাই করা জরুরি হলেও প্রশ্নটি বড় নির্মম—পাশের মানুষটি বিপদে পড়লে আমরা হাত বাড়াই, নাকি মোবাইলের পর্দায় চোখ নামিয়ে রাখি? কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে গভীর নলকূপ খননের গর্ত থেকে গ্যাস বেরিয়ে আগুন লাগার ঘটনাও সতর্ক করেছে। পানি খুঁজতে গিয়ে আগুনের সন্ধান—প্রকৃতি মাঝে মাঝে এমন ধাঁধা দেয়, যার উত্তর ফেসবুকের মন্তব্যে নয়, ভূতাত্ত্বিক পরীক্ষা ও নিরাপত্তাব্যবস্থায় খুঁজতে হয়।

সম্পাদকীয়র পাতায় দুটি বিষয় বিশেষ মনোযোগ দাবি করে—চাঁদাবাজির দৌরাত্ম্য এবং জুলাই অভ্যুত্থানে আহতদের চিকিৎসার দায়। প্রথমটির বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে ধরলেই হবে না; পরিবহন, বাজার ও সরবরাহব্যবস্থায় কারা টাকা তোলে, কারা তাদের প্রশ্রয় দেয়, সেই শৃঙ্খল ভাঙতে হবে। দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে আহত যোদ্ধাদের চিকিৎসা যেন দপ্তরের এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে না পড়ে, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব। ব্যাংকের নিরাপত্তা এবং ওয়েবসাইটে সফটওয়্যারের দুর্বলতা নিয়েও উদ্বেগ কম নয়। ডিজিটাল যুগে তালা-চাবির পাশাপাশি পাসওয়ার্ডও পাহারা দিতে হয়; আর ব্যাংকের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা মানে গ্রাহকের টাকা ও তথ্য দুটিই সুরক্ষিত রাখা। সেনাসদরে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসিফিক আর্মি কমান্ডের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের সাক্ষাৎ এবং বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের দশম ল্যান্ড ফোর্সেস আলোচনা প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও দুর্যোগ মোকাবিলায় সহযোগিতার প্রসঙ্গ সামনে এনেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হারেৎজ পত্রিকার সম্পাদকীয়তে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নীতি নিয়ে সমালোচনা অব্যাহত; আর ইয়েমেনের হুথিদের সৌদি আরবের রাস তানুরা তেল শোধনাগারে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবিতে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা নতুন করে বেড়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ হামলার বিবরণ নিশ্চিত না করলেও, তেল সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ঘিরে সংঘাতের আশঙ্কা বিশ্ববাজারের জন্য উদ্বেগজনক।

দূর আমেরিকার রাজনীতিতেও কথার গোলা কম ছোড়া হচ্ছে না; ট্রাম্প ও ওবামাকে ঘিরে রাজনৈতিক বাক্যবাণের খবরের মধ্যে কে কী বলেছেন, তা নির্দিষ্ট সূত্রে যাচাই করেই গ্রহণ করা ভালো। সব মিলিয়ে আজকের দিনের শিক্ষা এই—টোকিও থেকে বিনিয়োগের সম্ভাবনা আসুক, নওগাঁর হাটে সবজির দাম কমুক, কিংবা ঢাকার রাস্তায় রোগীর জন্য অ্যাম্বুলেন্স ছুটুক, শেষ বিচারে মানুষের জীবনটাই আসল হিসাব। রাষ্ট্রের সাফল্য শুধু বড় অঙ্ক, বড় বৈঠক কিংবা বড় বড় ঘোষণায় মাপা যায় না; মাপতে হয় নাগরিক কতটা নিরাপদ, অসুস্থ মানুষ কত দ্রুত চিকিৎসা পান, আর বাজারে সাধারণের পকেট কতখানি রক্ষা পায়, তা দিয়ে। খবরের কাগজে দুনিয়ার অনেক খবরই ছাপা হয়, কিন্তু মানুষের খবরটি যেন ছাপার অক্ষরের আড়ালে হারিয়ে না যায়। বুধবারের সকালে এইটুকুই কামনা—দেশে বিনিয়োগের আলো জ্বলুক, হাসপাতালের দরজায় অসহায়তা না জমুক, আর মানুষের বিবেকটি অন্তত মোবাইলের ব্যাটারির মতো হঠাৎ নিভে না যাক।