Dhaka Mail Logo

মতামত

কার্তিকের কুয়াশায় দেশকালের চালচিত্র

২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০৩ এএম

কার্তিকের এই শীতল সকালে এক কাপ গরম চা আর একখানা খবরের কাগজ—বাঙালির দিন শুরুর এর চেয়ে নিরীহ আয়োজন আর কী হতে পারে? অবশ্য খবরের কাগজ খুললেই বোঝা যায়, নিরীহ জিনিসেরও বেশ উত্তেজক ক্ষমতা আছে। চায়ের কাপে ঝড় তোলার আগে একবার দেশের হালচাল দেখে নেওয়া যাক।

বাংলাদেশের স্বপ্নের ডানা ক্রমেই লম্বা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সস্ত্রীক চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে নিপ্পনের দেশে গেছেন যেখানে কূটনীতির পাশাপাশি ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত বারোটি অগ্রাধিকার খাতে প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ও সহযোগিতার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। অবকাঠামো, জ্বালানি, পরিবহন, শিল্পায়ন—সবই আছে সেই ঝুলিতে। শুনতে বেশ মনোরম; কিন্তু অর্থনীতির একটি বদভ্যাস আছে, সে কথার চেয়ে হিসাব বেশি বোঝে। টোকিওর টেবিলে ভবিষ্যতের নকশা আঁকা হচ্ছে, এদিকে ঢাকার বাজারে গৃহস্থের বর্তমানের হিসাবই মিলছে না। বাজারে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের তৎপরতা আছে, তদারকিও চলছে; কিন্তু সিন্ডিকেট আর মধ্যস্বত্বভোগীর পুরোনো কারসাজি যদি বহাল থাকে, তবে টাস্কফোর্সের ঘাম ঝরবে, ক্রেতার ঘামও ঝরবে—শুধু দামের ঘামটি শুকোবে কি না, সেটাই প্রশ্ন। বিদেশি বিনিয়োগের সাফল্য ডলারের অঙ্কে মাপা যায়, কিন্তু তার আসল পরীক্ষা কর্মসংস্থান, উৎপাদন আর মানুষের হাঁফ ছেড়ে বাঁচার সুযোগে। ক্রেতা শেষ পর্যন্ত বক্তৃতা কেনেন না, বাজারের থলিতে কী উঠল সেটিই দেখেন।

বাঙালির মন খারাপ হলে কেউ রাজনীতির দিকে তাকান, কেউ ক্রিকেটের দিকে, আর কেউ ফেসবুক খুলে বসেন। ক্রিকেটে আমাদের বাঘেদের সাম্প্রতিক ব্যর্থতা আর আফগানিস্তানের অগ্রগতি দেখে মনে হয়, বাঘের গর্জন আর স্কোরবোর্ডের ভাষা সব সময় এক হয় না। যুদ্ধ-অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাওয়া একটি দেশ ক্রিকেটে এগিয়ে যাচ্ছে; আর আমরা কখনো পুরোনো গৌরবের গল্প বলি, কখনো নতুন আশ্বাসের অপেক্ষা করি। খেলায় হারজিত থাকবেই, কিন্তু উন্নতির জন্য অনুশীলনের বিকল্প নেই—এ কথা ক্রিকেটারদের মতো সমর্থকদেরও মনে রাখা ভালো। এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পথশিশুর ফুল বিক্রির দৃশ্য ঘিরে এক টিকটক তারকার মানবিকতার প্রদর্শনী নিয়ে বিতর্ক। শিশুটির উপকার হলো, নাকি তার অসহায়ত্ব কারও জনপ্রিয়তার পুঁজি হলো? সাহায্য করা মহৎ কাজ; কিন্তু সাহায্যের আগে ক্যামেরা চালু করতেই হবে, এমন কোনো বিধান ধর্মে বা আইনে আছে বলে জানা নেই।

সম্পাদকীয়গুলো অবশ্য এই কাগুজে সংস্কৃতির মূলে কুঠারাঘাত করতেই ব্যস্ত। আজকের দুই প্রধান পত্রিকার সম্পাদকীয়তে যা দেখলাম, তার সারমর্ম হলো—আমাদের শিক্ষার মেরুদণ্ডটি নাকি এখন ‘ডিজিটাল স্ক্রিনের’ অতি-ব্যবহারে আরও কিছুটা বেঁকে গেছে, এবং যুবসমাজকে বইয়ের পাতায় ফেরানো না গেলে আগামী দিনে আমরা কেবল ‘রিলস’ বানানোর মতো এক বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী জাতিতে পরিণত হবো। দ্বিতীয় সম্পাদকীয়টির সুর আরও চড়া—সেখানে দেশের ব্যাংক খাতের তারল্য সংকট আর খেলাপি ঋণের ভূত নিয়ে এমন এক সচিত্র বিবরণ দেওয়া হয়েছে, যা পড়লে মনে হবে, ব্যাংকে টাকা রাখার চেয়ে বালিশের নিচে রাখা ঢের নিরাপদ। তারল্যসংকট, খেলাপি ঋণ ও দুর্বল ঋণ আদায় নিয়ে উদ্বেগ কাটাতে হলে নিয়ম সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে। ব্যাংকের টাকা কোনো জাদুর কলের পানি নয়—ইচ্ছেমতো খুলে দিলেই যে আবার ভরে উঠবে, তার নিশ্চয়তা নেই। আমানতকারীর অর্থের নিরাপত্তা, ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা এবং প্রভাবশালীদের জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরবে কী করে? ক্ষমতা যার হাতেই থাকুক, তার কাছে প্রশ্ন থাকবে—এইটুকু গণতন্ত্রের প্রাথমিক ব্যাকরণ। 

আমরা যখন নিজেদের এই ক্ষুদ্র ভাঙাগড়ার সংসারে মগ্ন, ঠিক তখনই বিশ্বের দরবারে চোখ রাখলে গা শিউরে ওঠে। মধ্যপ্রাচ্যের জল্লাদখানা থেকে খবর এসেছে—ইহুদিবাদী ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভাগ্য নাকি এখন ঝুলছে খোদ মুসলিম দলগুলোর সমর্থনের ওপর! রাজনীতির এই অদ্ভুত ডিগবাজি দেখে স্বয়ং চাণক্যও বোধহয় কবরে শুয়ে লজ্জা পেতেন। আর দূর আমেরিকায় প্রবীণ বিল ক্লিনটন সাহেব আবেগাপ্লুত হয়ে জগতকে জানাচ্ছেন, তার কন্যা চেলসি নাকি পবিত্র কুরআন শরীফ পড়ে এক পরম আত্মিক শান্তি খুঁজে পেয়েছেন। আহা, দুনিয়াটা কত বিচিত্র—কেউ তলোয়ার দিয়ে রক্তের হোলি খেলছে, কেউ আবার পবিত্র বাণীর পাতায় জীবনের মানে খুঁজছে!

অন্যদিকে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সাম্প্রতিক টানাপোড়েন, বিশেষত খাগড়াছড়ির সংঘর্ষের পর তৈরি হওয়া সংবেদনশীলতা, দুই দেশের দায়িত্বশীল আচরণের প্রয়োজন মনে করিয়ে দেয়। প্রতিবেশী বদলানো যায় না, মতভেদও এক কাপ চায়ে মুছে যায় না। সীমান্ত, নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও মানুষের স্বার্থে সংযম এবং আলোচনা জরুরি। বন্ধুত্ব মানে সব বিষয়ে একমত হওয়া নয়; আবার সার্বভৌমত্ব রক্ষার অর্থও সব দরজা বন্ধ করে দেওয়া নয়। কূটনীতির কৃতিত্ব কে কত জোরে কথা বললেন, তাতে নয়—সমস্যা কতটা কমল, তার মধ্যে।

সোমবারের এই প্রভাতে আমাদের চাওয়া খুব বেশি নয়। জাপানের সঙ্গে সহযোগিতা বাস্তব কর্মসংস্থান আনুক, বাজারে সাধারণ মানুষ স্বস্তি পাক, ক্রিকেটে ফিরুক ধারাবাহিকতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বই ও চিন্তার মর্যাদা বাড়ুক, আর ব্যাংক খাতে নিয়মের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক। সামাজিক মাধ্যমে মানবিকতা যেন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নাম হয়, মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করার কৌশল নয়। রাজনৈতিক মতভেদ থাকুক, বিতর্কও থাকুক; তবে সত্যের সঙ্গে যেন তার বিচ্ছেদ না ঘটে। সম্পাদকীয় প্রশ্ন তুলবে, নাগরিকেরা আলোচনা করবেন, আর সরকারের কাজ হবে কথার জবাব কাজে দেওয়া। কার্তিকের সকালে কুয়াশা থাকতেই পারে; কুয়াশার ওপর আমাদের হাত নেই, কিন্তু পথের দিশা খোঁজার দায়িত্ব আমাদেরই। আল্লাহ বাংলাদেশকে শান্তি দিন, দেশের মানুষকে নিরাপদ রাখুন, অভাবগ্রস্তের কষ্ট লাঘব করুন এবং দায়িত্বশীলদের ন্যায় ও প্রজ্ঞার সঙ্গে কাজ করার তৌফিক দিন। আমিন।