২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০৩ পিএম
জাতীয় প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠা এবং আমার জন্ম একই সালে। গ্রেগরিয়ান ১৯৫৪ সাল। আমাদের বয়স ৭২ বছর। তবে মাস হিসাব করলে জাতীয় প্রেস ক্লাব বয়সে আমার চেয়ে আট মাসের ছোট। আমার জন্ম ১৯৫৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এবং জাতীয় প্রেস ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৯৫৪ সালের অক্টোবর মাসে। যে বছর আমাদের উভয়ের বয়স ২৪ বছর, অর্থাৎ ১৯৭৮ সাল, ওই বছর আমি জাতীয় প্রেস ক্লাবের স্থায়ী সদস্যপদ লাভ করি। আমার সদস্যপদের বয়স ৪৮ বছর। তখনো আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের ছাত্র। ফুলটাইম সাংবাদিক।
আমি ১৯৭৮ সালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের স্থায়ী সদস্যপদের জন্য আবেদন করি। আমার আবেদনপত্রে প্রস্তাবক হিসেবে স্বাক্ষর করেছিলেন বাংলাদেশ অবজারভারের ওই সময়ের স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট ইকবাল সোবহান চৌধুরী এবং সমর্থন করেছিলেন দৈনিক বার্তার ব্যুরো চিফ মোহাম্মদ সলিমুল্লাহ। তখন প্রেস ক্লাবের সভাপতি ছিলেন এ জেড এম এনায়েতুল্লাহ খান এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ফাজলে রশীদ। ওই বছর আমাকেসহ মাত্র তিনজন সাংবাদিককে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সদস্যপদ দেওয়া হয়েছিল। অপর দুজনের মধ্যে মরহুম লুৎফর রহমান বীনুর নাম মনে আছে। তৃতীয়জনের নাম মনে নেই।
সদস্য হওয়ার এক বছর পর, ১৯৭৯ সালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের ইস্যু করা পরিচয়পত্রটি এখনো আমার কাছে সংরক্ষিত আছে। পরিচয়পত্রটির বয়স ৪৭ বছর। এটি সংরক্ষণে আমার চেয়ে আমার পুত্র সা’দের কৃতিত্ব বেশি। প্রায় ষোলো বছর প্রবাসজীবন কাটিয়ে ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে ঢাকায় গেলে সা’দ আমার কিছু পুরোনো জিনিসের মধ্যে জাতীয় প্রেস ক্লাবের পরিচয়পত্রটি দেখালে আমি বিস্মিত হই এবং স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ি। প্রেস ক্লাবের ইস্যু করা পরিচয়পত্রটির অস্তিত্ব আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। পরিচয়পত্রটি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখি। চোখ ঝাপসা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসার সময় আমি পরিচয়পত্রটি সঙ্গে নিয়ে আসতে চাইলেও আমার পুত্র সেটি তার কাছেই রাখার আগ্রহ দেখিয়ে আমাকে ছবি তুলে দেয়।
পাশাপাশি দুটি লাল রঙের দোতলা ভবন—জাতীয় প্রেস ক্লাব ভবন এবং এর পশ্চিম পাশে একটি সূচালো গম্বুজসহ দোতলা ‘চামেরি হাউস’-এর সঙ্গে আমার চাক্ষুষ পরিচয় ১৯৬৭ সালে। আমি তখন ক্লাস নাইনের ছাত্র। এক বড় ভাইয়ের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সপ্তাহ দুয়েক কাটানোর সময় তিনিই আমাকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি কোনো একটি জাতীয় দৈনিকের আমাদের এলাকার ‘নিজস্ব সংবাদদাতা’ ছিলেন। প্রেস ক্লাব নিয়ে তাঁর আগ্রহ ছিল। তখন প্রেস ক্লাবের আশপাশে খুব বেশি ভবন ছিল না বলে গাছপালা ও বাগান-শোভিত সুন্দর দুটি ভবন সহজেই পথচারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করত।
১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর ভবন দুটির সামনে দিয়ে আমাকে হরহামেশাই যাতায়াত করতে হয়েছে। তখন মনে হতো, প্রেস ক্লাব ভবনের চেয়ে প্রেস ক্লাবের পশ্চিম পাশের ‘চামেরি হাউস’ অধিক দৃষ্টিনন্দন।
আরও পরে, ১৯৭৭ সালে যখন সাংবাদিকতা শুরু করি, তখন আমার লেখার প্রিয় বিষয় ছিল ঢাকার প্রাচীন মসজিদ, মন্দির ও প্রাচীন স্থাপত্যগুলোর ওপর ফিচার লেখা। ‘চামেরি হাউস’ যেহেতু মনোরম একটি ভবন, এটি নিয়েও আমি লিখেছি। ব্রিটিশ শাসনামলে অবিবাহিত ব্রিটিশ অফিসারদের আবাসস্থল হিসেবে ভারতের বেশ কয়েকটি শহরে একই ধরনের স্থাপত্যকৌশলে একই ‘চামেরি হাউস’ (Chummery House) নামে ভবন নির্মাণ করা হয়। সে ধারাবাহিকতায় ঢাকার ‘চামেরি হাউস’ নির্মিত হয় ১৯২০ সালে। ১৯৩৮ সাল থেকে ‘চামেরি হাউস’কে পরিবর্তন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের হোস্টেলে পরিণত করা হয়। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এটি পরিণত হয় সরকারি দপ্তরে। বর্তমানে ভবনটি ‘সেন্টার অন ইন্টিগ্রেটেড রুরাল ডেভেলপমেন্ট ফর এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিক’ (সিরডাপ)-এর সদর দপ্তর। কিন্তু ভবনটির ক্যাম্পাসে এখন উঁচু ভবন নির্মিত হওয়ায় এবং সামনে দিয়ে মেট্রোরেলের লাইন নির্মাণের কারণে ‘চামেরি হাউস’-এর সৌন্দর্য নষ্ট হয়েছে, ঐতিহ্য ধ্বংস হয়েছে।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের নতুন প্রজন্মের সদস্যরা এবং অন্যান্য যারা প্রেস ক্লাবে আসেন, তাঁরা পুরোনো প্রেস ক্লাবের দোতলা লাল ভবনের ভাবগাম্ভীর্য কখনো কল্পনা করতে পারবেন না। ‘চামেরি হাউস’-এর চেয়েও প্রাচীন ছিল প্রেস ক্লাব ভবনটি। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর আসাম ও বেঙ্গল প্রভিন্সের মন্ত্রীদের আবাস হিসেবে নির্মিত হয় ভবনটি। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পরও এটি দীর্ঘদিন সরকারি ভবন হিসেবেই ছিল। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ভবনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ১৯২৬ সালে বিশ্বখ্যাত পদার্থবিদ সত্যেন্দ্রনাথ বসু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ লাভের পর তাঁর আবাস হিসেবে ভবনটি বরাদ্দ করা হয়েছিল এবং প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত তিনি লাল ভবনে বসবাস করেছেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বেশ কয়েক বছর এটি প্রাদেশিক মন্ত্রীদের আবাস হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
বাঙালি ঐতিহ্যপ্রেমী জাতি নয়। প্রয়োজন-অপ্রয়োজন এবং বিশেষ করে জনসংখ্যার বিস্ফোরণ বাঙালিকে ভাঙাগড়ায় বাধ্য ও অভ্যস্ত করে তুলেছে। প্রয়োজনের তাগিদই সম্ভবত সবচেয়ে বেশি প্রবল। ছোট্ট আয়তনের বাংলাদেশের জনসংখ্যা আঠারো কোটির অধিক। ১৯৬০ সালে সাড়ে পাঁচ লাখ জনসংখ্যার ঢাকা নগরী ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে স্বাধীন দেশের রাজধানীতে পরিণত হওয়ার পর মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে, ১৯৭৫ সালের মধ্যে, নগরীর জনসংখ্যা ১৫ লাখ ছাড়িয়ে যায়। এখন ঢাকা মহানগরীর জনসংখ্যা আড়াই কোটির বেশি। জাতীয় প্রেস ক্লাবের ছোট্ট দ্বিতলবিশিষ্ট লাল ভবন যত ঐতিহ্যবাহী ও ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হোক না কেন, প্রয়োজনের তুলনায় সেটি ক্ষুদ্রায়তনের ভবন ছিল। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে ঢাকায় নতুন নতুন সংবাদপত্র প্রকাশিত হতে থাকে। সাংবাদিকের সংখ্যাও বেড়ে চলে। জাতীয় প্রেস ক্লাবকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড, পেশাদার সাংবাদিকদের প্রয়োজন ইত্যাদির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সত্তরের দশকের শেষদিকে পুরোনো প্রেস ক্লাব ভবন ভেঙে প্রেস ক্লাবের নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। জাতীয় প্রেস ক্লাব প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের মধ্যে যাঁরা তাঁদের চোখের সামনে লাল ভবন ভাঙতে দেখেছেন, তাঁরা ব্যথিত হয়েছেন।
প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ও নির্বাহীদের অনেককেই দেখার এবং কারও কারও সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছে আমার। তাঁদের অনেকের দুঃখ ও মধুর স্মৃতিচারণ আমি শুনেছি ও পাঠ করেছি। আমার বয়সী যাঁরা লাল ভবন থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাবে যাতায়াত করতে শিখেছি, তাঁরাও আমার মতো দুঃখ পেয়েছেন। কিন্তু প্রয়োজনের কাছে মানুষের আবেগ-অনুভূতি, ঐতিহ্য ও পছন্দ-অপছন্দের কোনো মূল্য নেই। প্রয়োজন তার কঠোর নিয়মে চলে, এমনকি প্রয়োজন কোনো আইনও মানে না।
যাহোক, জাতীয় প্রেস ক্লাব এখন আর ছোট প্রতিষ্ঠান নয়। প্রেস ক্লাবের বর্তমান স্থায়ী সদস্যসংখ্যা প্রায় দুই হাজার। আমি যখন ক্লাবের সদস্য হয়েছি, তখন সদস্যপদ লাভ খুব সহজ ছিল না। লেখার শুরুতেই তা উল্লেখ করেছি, ১৯৭৮ সালে আমাকেসহ মাত্র তিনজনকে সদস্য করা হয়েছিল। সদস্যপদ অনুমোদনের জটিল প্রক্রিয়ার কারণে আমার সদস্য হওয়ার আগের ও পরের বছরগুলোতেও খুব কমসংখ্যক সাংবাদিকের পক্ষে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সদস্য হওয়া সম্ভব হয়েছে। যতদূর মনে পড়ে, ১৯৮০ সালে ক্লাবের স্থায়ী সদস্যসংখ্যা তিনশোর কম ছিল।
যাঁরা স্থায়ী সদস্য, তাঁরাই প্রেস ক্লাবের ব্যবস্থাপনা কমিটির নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অধিকারী। আমার ওই সময়ের কর্মস্থল দৈনিক সংগ্রামের জ্যেষ্ঠ সহকর্মীরা আমার ওপর একধরনের চাপ সৃষ্টি করলেন নির্বাচনে ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যপদে প্রার্থী হওয়ার জন্য। আমি নির্বাচনবিমুখ মানুষ। কারও কাছে ভোট প্রার্থনা করার কথা কখনো কল্পনায় আনতে পারি না। কিন্তু চাপের কাছে নতি স্বীকার করে আমাকে ১৯৮০ সালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যপদে প্রার্থী হতে হয়েছিল। তখন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ছিলেন ইত্তেফাক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ফাজলে রশীদ। আমার হাউসে তখন প্রেস ক্লাবের ভোটারসংখ্যা ছিল মাত্র তিনজন। আমি ছাড়া অন্য দুজন ভোটার ছিলেন মোহাম্মদ আবদুল মান্নান ও জয়নুল আবেদীন আজাদ। প্রায় তিনশো ভোটারের মধ্যে মাত্র তিনটি ভোট পুঁজি করে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা নির্বুদ্ধিতা ছাড়া কিছু ছিল না।
প্রার্থী হওয়া সত্ত্বেও আমি কারও কাছে ভোট চাইতে যাইনি। কোনো ভোটারের কাছে ফোন করেও ভোট প্রার্থনা করিনি। কয়েকজন উৎসাহী সহকর্মী ‘জাতীয় প্রেস ক্লাব ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যপদে আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুকে জয়যুক্ত করে আপনাদের সেবার সুযোগ দিন’—এ ধরনের একটি কার্ড ছাপিয়ে দিয়েছিলেন। কারও সঙ্গে দেখা হলে তাঁদের হাতে একটি কার্ড গছিয়ে দেওয়ার অতিরিক্ত কিছু করিনি। এরই মধ্যে একদিন প্রেস ক্লাবে দেখা হয় দৈনিক বাংলার ওই সময়ের নির্বাহী সম্পাদক আহমেদ হুমায়ুনের সঙ্গে। তিনি সাংবাদিক ইউনিয়নে অত্যন্ত সক্রিয়, যোগ্য এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নেতা ছিলেন। তিনি আমাকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তিনি বললেন, ‘আপনাকে ভোট চাইতে হবে না। কাল আমার অফিসে আসুন। সারাদিন অফিসে আমার সঙ্গে বসে থাকবেন। আমার কাছে যাঁরা আসবেন, তাঁদের বলব এবং টেলিফোনে যতজনকে পাই, তাঁদেরও বলব আপনাকে ভোট দিতে।’
আমি তাঁর কথায় সম্মত হলেও পরদিন আমি আর দৈনিক বাংলা অফিসে তাঁর কাছে যাইনি। তাঁর অবস্থান, প্রতিভা ও ব্যক্তিত্বের কাছে তখন নিজেকে অত্যন্ত ক্ষুদ্র মনে হতো। ভোটের জন্য তাঁর মতো একজন গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত সাংবাদিকের সময় নষ্ট করতে ইচ্ছা হয়নি। নির্বাচনের দিন ভোট দিতে এসে তিনি আমাকে দেখে শুধু বললেন, ‘আপনি আসলেন না।’ আমি অত্যন্ত লজ্জা অনুভব করেছি।
আমি নির্বাচনে জিততে পারিনি। তবে আমার জন্য সন্তুষ্টির ব্যাপার ছিল যে, সর্বনিম্ন ৯১ ভোট পেয়ে যিনি ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যতালিকার শেষ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন, তাঁর চেয়ে আমি সম্ভবত তিন ভোটে পিছিয়ে ছিলাম। যতদূর মনে পড়ে, শেষ বিজয়ী সদস্য ছিলেন বাংলাদেশ অবজারভারের সহকারী সম্পাদক নজরুল ইসলাম। তবে প্রেস ক্লাবের একজন নতুন সদস্য হিসেবে মাত্র তিন ভোট পুঁজি করে আমার অর্জন মন্দ ছিল না। শ্রদ্ধাভাজন আহমেদ হুমায়ুনের কাছে সারাদিন বসে থাকার সুযোগ গ্রহণ করলে অনেক কিছু শেখাও হতো, জাতীয় প্রেস ক্লাব ব্যবস্থাপনা কমিটির নির্বাচনে জেতাও হতো।
(লেখাটি জাতীয় প্রেস ক্লাবের ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে স্মরণিকায় প্রকাশিত)