১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩২ পিএম
শরতের শেষবেলার আকাশে মেঘ নেই, কিন্তু মানুষের মনে মেঘ জমার উপকরণ যথেষ্ট। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ইউরেনিয়াম জ্বালানি এসেছে—বাংলাদেশ পরমাণুর শক্তি কাজে লাগানোর পথে আরেক ধাপ এগোল। খবরটি আনন্দের, সন্দেহ নেই। কিন্তু একই সকালে বাজারের থলিতে কাঁচামরিচ আর ইলিশের দাম দেখলে মনে হয়, পরমাণুর চেয়েও শক্তিশালী কোনো বিস্ফোরণ প্রতিদিন মধ্যবিত্তের পকেটে ঘটছে। একদিকে বিজ্ঞান আমাদের ভবিষ্যতের দরজা খুলছে, অন্যদিকে বাজারের দরজায় দাঁড়িয়ে গৃহকর্তা পকেট হাতড়ে দেখছেন, ভবিষ্যতের জন্য কিছু অবশিষ্ট আছে কি না। সভ্যতার এই অদ্ভুত ব্যবস্থা—বিদ্যুতের আলো বাড়ছে, অথচ সংসারের হিসাবের খাতায় অন্ধকারও কমছে না।
রাজধানীর প্রশাসনিক মানচিত্রেও নতুন অধ্যায় লেখার প্রস্তুতি চলছে। আবদুল গণি রোডের পুরোনো সচিবালয় ছেড়ে প্রশাসনের নতুন ঠিকানা হতে যাচ্ছে শেরেবাংলা নগরের আগারগাঁও। মন্ত্রিসভা ৩১.৫৮ একর জমিতে ১৪টি বারো তলা ভবন, প্রায় ৩৩ লাখ বর্গফুট অফিসের জায়গা, গাড়ি রাখার ব্যবস্থা ও সবুজ এলাকা নিয়ে নতুন সচিবালয় নির্মাণের প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। আগামী বিজয় দিবসে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং ২০২৯ সালের মধ্যে কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই বৈঠকে আগামী গ্রীষ্মের আগে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে বিশেষ অধ্যাদেশের খসড়াও অনুমোদিত হয়েছে। পরিকল্পনা বড়, স্বপ্নও ছোট নয়। তবে ঢাকার যানজটে আটকে থাকা নাগরিকের মনে একটি নিরীহ প্রশ্ন জাগতেই পারে—সচিবালয়ের ঠিকানা বদলালে কি তার ভাগ্যদেবীর ট্রাফিক সিগন্যালও সবুজ হবে? ফাইলের ধুলো এক পাড়া থেকে অন্য পাড়ায় স্থানান্তরিত হওয়ার সঙ্গে যদি কাজের গতি, জবাবদিহি ও নাগরিকের ভোগান্তিও স্থানান্তরিত হয়, তবেই নতুন ভবনের স্থাপত্যে রাষ্ট্রের নতুন পরিচয় ফুটে উঠবে।
চেয়ারেরও নিজস্ব ভূগোল আছে। বাণিজ্য, নৌপরিবহন, বস্ত্র ও পাটসহ কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে সচিব পর্যায়ে রদবদল হয়েছে; একজন অতিরিক্ত সচিব সচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছেন, দুজন পেয়েছেন ভারপ্রাপ্ত সচিবের দায়িত্ব। সরকারি প্রজ্ঞাপনে এসব পরিবর্তনের বিবরণ থাকে, কিন্তু পরিবর্তনের আসল পরীক্ষা হয় দফতরের বাইরে।
এদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জীবনযাত্রার মানবিষয়ক জরিপে দেখা যাচ্ছে, দেশের ৪৭.৪২ শতাংশ পরিবার ঋণগ্রস্ত। গড় মাসিক আয় ৩৩ হাজার ৫১৩ টাকা, ব্যয় ৩৫ হাজার ৩১১ টাকা। অর্থাৎ মাস শেষ হওয়ার আগেই গড়ে ১ হাজার ৭৯৮ টাকার ঘাটতি। আয়-ব্যয়ের এই ব্যবধান শহরে আরও বেশি। মাসের হিসাব মেলাতে গিয়ে পরিবারগুলোকে যে ঋণ করতে হয়, তার জন্য কোনো বিশেষ অধ্যাদেশ লাগে না; লাগে শুধু টাকার অভাব। নতুন অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ঋণপত্র বা এলসি খোলার হার ১৮ শতাংশ বেড়েছে—আমদানি বাণিজ্যে এটি আশাব্যঞ্জক সংকেত।
বাংলাদেশ ব্যাংকও ৬০ হাজার কোটি টাকার উদ্দীপনা প্যাকেজ থেকে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা বাজারে ছেড়েছে। এখন দেখার বিষয়, অর্থনীতির এই সুবাতাস কাগজপত্র ও ব্যাংকের হিসাব পেরিয়ে সাধারণ মানুষের ঘর পর্যন্ত পৌঁছায় কি না। অর্থনীতির চাকা ঘুরছে—এ কথা শুনতে ভালো; তবে সংসারের চুলায় হাঁড়ি না চড়লে সেই চাকার শব্দে ক্ষুধার্ত মানুষের বিশেষ আনন্দ হওয়ার কথা নয়।
সামাজিক মাধ্যমে মানুষের ক্ষোভের ভাষাও ক্রমে স্পষ্ট হচ্ছে। ডায়ালাইসিসের লাগামহীন ব্যয়, জনস্বাস্থ্যের দুরবস্থা এবং ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। একটি জীবন বাঁচানোর চিকিৎসা যদি মধ্যবিত্তের সঞ্চয় শেষ করে দেয়, তবে চিকিৎসার অধিকার আর সামর্থ্যের মধ্যে ব্যবধানটি বড় নির্মম হয়ে ওঠে। মশার কাছে মানুষের পদমর্যাদা নেই; সে সচিব, ব্যবসায়ী কিংবা দিনমজুরের পরিচয়পত্র দেখে কামড়ায় না। অথচ চিকিৎসার বিল এসে শ্রেণিভেদ বেশ ভালোভাবেই চিনিয়ে দেয়।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিও ও অভিযোগ নিয়েও চলছে আলোচনা; কোথাও জনপ্রতিনিধির আচরণ, কোথাও ক্ষমতাবান ব্যক্তির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই জরুরি, কারণ ভাইরাল হওয়া মানেই সত্য প্রমাণিত হওয়া নয়। আবার পদ-পদবি আছে বলেই কেউ প্রশ্নের ঊর্ধ্বে চলে যান না। সামাজিক মাধ্যম কখনো মানুষের না-বলা কথা সামনে আনে, কখনো তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কাঠগড়া বানিয়ে ফেলে। এই দুই প্রবণতার মাঝখানে সত্যকে বাঁচিয়ে রাখাই কঠিন কাজ।
আজকের লেখায় দুটি বিষয় বিশেষ মনোযোগ দাবি করে—শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি এবং ব্যাংকের খেলাপি ঋণ। দ্য ডেইলি স্টার-এর সম্পাদকীয়তে পোশাকশ্রমিকদের জীবনধারণের উপযোগী মজুরির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতার যুক্তি দেখিয়ে শ্রমিকের ন্যূনতম জীবনযাপনের প্রয়োজনকে অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষায় রাখা যায় না।
পোশাক রফতানির আয় দেশের অর্থনীতিতে আসে শ্রমিকের হাত ঘুরেই; অথচ সেই হাতের মানুষটি যদি ঘরভাড়া, খাবার ও চিকিৎসার হিসাব মেলাতে না পারেন, তবে শিল্পের সাফল্যের ছবিটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। অন্যদিকে খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর নীতি, আইনি জটিলতা দূর করা এবং ব্যাংকিং খাতে তারল্য ফেরানোর তাগিদও জোরালো হচ্ছে। ঋণ নিয়ে ফেরত না দেওয়ার সংস্কৃতি আর শ্রম দিয়ে ন্যায্য মজুরি না পাওয়ার বাস্তবতা পাশাপাশি থাকলে অর্থনীতির ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। টাকা ধার নেওয়ার সময় যদি চুক্তির এত গুরুত্ব থাকে, ফেরত দেওয়ার সময় তা হঠাৎ হালকা হয়ে যায় কেন? ব্যাংকের সংস্কার মানে শুধু নতুন নিয়ম লেখা নয়; ঋণগ্রহীতার জবাবদিহি এবং আমানতকারীর স্বার্থ রক্ষা করাও তার অংশ।
অর্থনীতির হিসাবের বাইরে আজ আরেকটি বড় প্রশ্ন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা (সংশোধন) আইন, ২০২৬ নিয়ে সম্পাদক পরিষদ ১২ দফা সুরক্ষার প্রস্তাব দিয়েছে। জনস্বার্থে সাংবাদিকতা, রাজনৈতিক সমালোচনা ও ব্যঙ্গকে অপরাধের সঙ্গে এক করে না দেখা, তল্লাশি ও নজরদারিতে বিচারিক তদারকি এবং অনলাইন কনটেন্ট অপসারণে স্বচ্ছতার দাবি উঠেছে। একই সময়ে দ্য ডেইলি স্টার-এ ব্যারিস্টার সারা হোসেনের সম্পাদকীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অনলাইন বিচারপ্রবণতার বিপদ সামনে এনেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে নিন্দা ও বিদ্বেষের বিস্তারও নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজন মনে করিয়ে দেয়। আইন যদি অপরাধ ঠেকানোর বদলে সমালোচকের কণ্ঠ চেপে ধরার অস্ত্র হয়ে ওঠে, তবে তার উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন উঠবে। আবার অভিযোগ উঠলেই কাউকে সামাজিক মাধ্যমে দোষী সাব্যস্ত করাও ন্যায়বিচার নয়। আদালতের কাজ আদালতকে করতে দিতে হবে; হ্যাশট্যাগের বিচারকরা অন্তত রায় দেওয়ার আগে সাক্ষী জেরা করার সুযোগটি রাখুন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেমন দরকার, তেমনি দায়িত্বশীল মতপ্রকাশও দরকার।
বিশ্বমঞ্চে তাকালে বোঝা যায়, মানুষের অসন্তোষের ভাষা দেশভেদে বদলালেও তার পেছনের বেদনা খুব আলাদা নয়। ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবস্থা ও সরকারি সেবার মান নিয়ে বিক্ষোভ সহিংসতায় গড়িয়েছে; বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের পর পুলিশ বহু মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে। ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলীয় সা’দা প্রদেশে বিমান হামলায় অন্তত ৯ জন নিহত ও ১৯ জন আহত হয়েছেন বলে হুথি-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে; নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে। হুথিরা হামলার দায় সৌদি আরবের ওপর চাপালেও সৌদি কর্তৃপক্ষের তাৎক্ষণিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একটি দেশে মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে রাস্তায় নামছে, আরেক দেশে যুদ্ধের মধ্যে সাধারণ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। এই দুই ঘটনার মধ্যে তুলনা টানা যায় না, কিন্তু একটি সত্য দুটিতেই আছে—রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক সংঘাত ও অর্থনৈতিক সংকটের চূড়ান্ত মূল্য প্রায়ই দিতে হয় সাধারণ মানুষকে। মানবসভ্যতা পরমাণুর শক্তি নিয়ন্ত্রণ করতে শিখছে, অথচ মানুষের ক্রোধ, ক্ষুধা ও যুদ্ধ থামানোর কূটনীতি এখনো বারবার হোঁচট খায়। এর চেয়ে বড় পরিহাস আর কী হতে পারে?
সোমবারের দিনটা তাই আমাদের সামনে দুটি হিসাব খুলে রেখেছে। একদিকে কত ভবন উঠবে, কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ তৈরি হবে, কত কর্মকর্তা কোন পদে বসবেন এবং অর্থনীতির সূচক কতটা ওপরে উঠবে। অন্যদিকে মাস শেষে একটি পরিবারের হাতে কত টাকা থাকবে, অসুস্থ মানুষ চিকিৎসা পাবেন কি না, শ্রমিক ন্যায্য মজুরি পাবেন কি না, আর নাগরিক নির্ভয়ে নিজের মত বলতে পারবেন কি না। প্রথম হিসাবটি রাষ্ট্রের সামর্থ্য জানায়; দ্বিতীয়টি জানায় সেই সামর্থ্যের সুফল মানুষের জীবনে পৌঁছেছে কি না। রূপপুরের চুল্লি জ্বলুক, সচিবালয়ের নতুন ভবন উঠুক, ছাদে সৌরবিদ্যুৎ তৈরি হোক—এসবই আমরা চাই। শুধু চাই, উন্নয়নের আলো যেন এমন উজ্জ্বল না হয় যে তার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের মুখটাই আর দেখা যায় না। কারণ রাষ্ট্রের সাফল্য শেষ পর্যন্ত ভবনের উচ্চতায় নয়, সাধারণ মানুষের জীবন কতটা স্বস্তির হলো, তার মধ্যেই মাপা যায়।
লেখক: সাবেক সিনিয়র সচিব।