১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১৩ পিএম
বাংলাদেশে সরকার বদলেছে, রাজনৈতিক ক্ষমতার বিন্যাস বদলেছে, মানুষের প্রত্যাশাও বারবার নতুন করে জেগেছে। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা বদলেছে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করা যায়। সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হলে গণতন্ত্রের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ, গণতন্ত্রের স্থায়িত্ব শুধু ভোটের ফলের ওপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে ক্ষমতাসীন সরকারের সিদ্ধান্তের বাইরে কতগুলি প্রতিষ্ঠান স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, নাগরিক কতটা নির্ভয়ে কথা বলতে পারেন এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতার অপব্যবহার হলে প্রতিকার পাওয়ার পথ কতটা খোলা থাকে তার ওপর।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই প্রশ্ন নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতায় আসা দলগুলো রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের অভিযোগের মুখে পড়েছে। বিরোধী দলে থাকার সময় যে দল প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমের মুক্ত পরিবেশের কথা বলে, ক্ষমতায় গিয়ে তারই একাংশের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রবণতা দেখা যায়। রাজনৈতিক পরিচয় বদলালেও এই প্রবণতা থেকে যায়। ফলে ক্ষমতার পালাবদল মানুষের প্রত্যাশা জাগালেও রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কের মৌলিক পরিবর্তন ঘটে না।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গভীর বিতর্কের বিষয় হয়ে থাকবে। সেই সময়ের জনঅসন্তোষ, আন্দোলন, ক্ষমতার পরিবর্তন এবং ঘটনাগুলোর নেপথ্য নিয়ে নানা ব্যাখ্যা ও বয়ান রয়েছে। ঘটনাপ্রবাহকে কেউ একভাবে দেখেন, কেউ অন্যভাবে। কোনও একটি ব্যাখ্যাকে আগাম চূড়ান্ত সত্য বলে ধরে নেওয়ার চেয়ে জরুরি হল, সেই অভিজ্ঞতা থেকে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা চিহ্নিত করা। ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, জবাবদিহির অভাব এবং নাগরিকের অধিকার সুরক্ষায় ব্যর্থতার যে প্রশ্নগুলো সামনে এসেছে, সেগুলোর নিষ্পত্তি রাজনৈতিক সুবিধা-অসুবিধার হিসাব দিয়ে করা সম্ভব নয়।
এখানেই প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা। গাড়ির শক অ্যাবজর্বার রাস্তার প্রতিটি ধাক্কা সামলে যাত্রীকে ঝাঁকুনি থেকে রক্ষা করে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও কিছু প্রতিষ্ঠান একই কাজ করে। স্বাধীন সংবাদমাধ্যম ক্ষমতাকে প্রশ্ন করে, স্বাধীন বিচার বিভাগ নাগরিকের অধিকার রক্ষা করে, নিরপেক্ষ প্রশাসন আইন কার্যকর করে এবং মুক্ত নাগরিক পরিসর মানুষের অসন্তোষ ও দাবি প্রকাশের সুযোগ দেয়। এই ব্যবস্থাগুলো কার্যকর থাকলে রাজনৈতিক সংঘাতের অভিঘাত সামলানো সহজ হয়। এগুলো দুর্বল হলে প্রতিটি সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে রাষ্ট্রের কর্মপদ্ধতি ও নাগরিকের নিরাপত্তা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
সংবাদমাধ্যমের পরিস্থিতি এই সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসের ২০২৬ সালের বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে বাংলাদেশ ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৫২তম স্থানে রয়েছে। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণে রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতির পাশাপাশি সরকারি সম্প্রচারমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির হিসাবে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ৩৮৩ জন সাংবাদিক হয়রানি, হামলা বা হুমকির শিকার হয়েছেন। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই সংখ্যা ৩২ শতাংশ বেশি। ঘটনার ৯১ শতাংশ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে।
এই পরিসংখ্যানের তাৎপর্য শুধু আক্রান্ত সাংবাদিকের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় পর্যায়ে কোনও জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনিক কর্মকর্তা বা প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করতে গিয়ে সাংবাদিক যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তবে সাধারণ মানুষের অভিযোগও অপ্রকাশিত থেকে যায়। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা তাই সাংবাদিকদের পেশাগত সুবিধার প্রশ্ন নয়। এটি নাগরিকের জানার অধিকার এবং ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করার অন্যতম শর্ত।
আইনের ব্যবহারও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের পরিবর্তে সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ এসেছিল, পরে সেটি আইনে পরিণত হয়েছে। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে ‘গুজব’ কিংবা ‘রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকর’ বক্তব্যের মতো অস্পষ্ট সংজ্ঞা এবং কনটেন্ট ব্লকের ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থা। কোনও বক্তব্য অপরাধ কি না, তা যদি অস্পষ্ট আইনি সংজ্ঞার ওপর নির্ভর করে, তবে তার প্রভাব পড়ে সাংবাদিকতা, গবেষণা, রাজনৈতিক সমালোচনা এবং সাধারণ নাগরিকের মতপ্রকাশে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধের বিচার অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু আইনের ভাষা এমন হতে হবে, যাতে বৈধ সমালোচনাকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ না থাকে।
নাগরিক পরিসরের স্বাধীনতাও একইভাবে জরুরি। সভা-সমাবেশের অনুমতি, সংগঠনের কার্যক্রম, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার বাস্তবে কতটা সুরক্ষিত, তা দিয়েই বোঝা যায় রাষ্ট্র ভিন্নমতকে কতটা জায়গা দিচ্ছে। সিভিকাস মনিটরের মূল্যায়নে বাংলাদেশের নাগরিক পরিসর এখনও ‘অবদমিত’ শ্রেণিতে রয়েছে। ধর্মীয় বা রাজনৈতিক চাপের মুখে অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়া, সমালোচনার জেরে গ্রেপ্তার কিংবা সংগঠনকে প্রশাসনিক বাধার মুখে পড়তে হলে নাগরিক স্বাধীনতা কাগজে স্বীকৃত থাকলেও তার কার্যকারিতা কমে যায়।
কোনও রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার তদন্ত ও বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু ব্যক্তির অপরাধের দায় এবং রাজনৈতিক পরিচয়কে এক করে দেখলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা কঠিন হয়। একই মানদণ্ড সব দলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে হবে। আজ যে অধিকার কোনও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের জন্য অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হচ্ছে, আগামী দিনে সেই অধিকারই অন্য পরিস্থিতিতে নিজের জন্য জরুরি হয়ে উঠতে পারে। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানকে দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে রাখার প্রয়োজন এখানেই।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান হয়নি। ২০২৫ সালের নভেম্বরে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়সংক্রান্ত অধ্যাদেশ জারি এবং ডিসেম্বরে পৃথক সচিবালয়ের উদ্বোধন অধস্তন আদালতের প্রশাসনিক স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের এপ্রিলে সংসদ সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশ বাতিল করে। পরে সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করার ফলে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। কাঠামো নিয়ে পর্যালোচনা চলতে পারে। কিন্তু বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব কমানোর কার্যকর ব্যবস্থা ছাড়া বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা যাবে না।
পুলিশ ও জনপ্রশাসনের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন। নিয়োগ, পদায়ন ও পদোন্নতিতে রাজনৈতিক আনুগত্যের গুরুত্ব থাকলে কর্মকর্তাদের কাছে পেশাগত নিরপেক্ষতার চেয়ে ক্ষমতাসীনদের সন্তুষ্ট রাখা বেশি জরুরি হয়ে ওঠে। কোনও বাহিনীর নাম বদলালেই তার কাজের ধরন বদলে যায় না। অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা স্বাধীন সংস্থার হাতে দেওয়া, নিয়োগে স্বচ্ছতা আনা এবং সংসদীয় তদারকি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
জুলাই সনদ ও গণভোটকে ঘিরেও এই প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সনদে বহু সাংবিধানিক প্রস্তাব থাকা সত্ত্বেও ভোটারদের সামনে মাত্র কয়েকটি সম্মিলিত প্রশ্নের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত চাওয়া হয়েছিল। সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রতিটি প্রস্তাবের তাৎপর্য বুঝে আলাদা অবস্থান জানানোর সুযোগ সীমিত ছিল। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের পাশাপাশি বিতর্কিত বিষয়ও ছিল বলে সমালোচনা উঠেছে। প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, প্রশ্নের ভাষা এবং ফলাফল নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে গণভোটের ফলকে সব প্রস্তাবের পক্ষে জনগণের দ্ব্যর্থহীন সম্মতি হিসেবে ব্যাখ্যা করা কঠিন। সাংবিধানিক পরিবর্তনের মতো গুরুতর বিষয়ে প্রয়োজন প্রস্তাব ধরে আলোচনা, প্রকাশ্য বিতর্ক এবং নাগরিকের বোঝার মতো স্পষ্ট ভাষা। রাজনৈতিক সমঝোতা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণের ওপর।
বাংলাদেশের সামনে এখন তাই প্রধান কাজ রাজনৈতিক বিজয়কে স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে রূপ দেওয়া। সাইবার নিরাপত্তা আইনের অস্পষ্ট বিধান সংশোধন, সাংবাদিকদের ওপর হামলার দ্রুত বিচার, পৃথক সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার সুরক্ষিত করা—এই পদক্ষেপগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান যত বেশি নিরপেক্ষ হবে, ক্ষমতাসীন দল তত বেশি নিশ্চিন্তে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে পারবে, যখন তার পালা আসবে। স্বাধীন প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্যও সুরক্ষা তৈরি করে। নাগরিকের অধিকার তখন সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল থাকে না।
নির্বাচন ঠিক করে কে সরকার গঠন করবে। কিন্তু সেই সরকার কতটা ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে, নাগরিক কতটা স্বাধীন থাকবেন এবং অন্যায়ের প্রতিকার কোথায় মিলবে, তা নির্ধারণ করে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে টেকসই করতে হলে এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতেই হবে। রাজনৈতিক পালাবদল আসবে, যাবে। রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার, নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতার ভিত যেন প্রতিবার নতুন করে নড়বড়ে না হয়ে ওঠে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
লেখক: কলামিস্ট, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক