১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২৯ এএম
সকালের খবরের কাগজ খুললে মনে হয়, পৃথিবীটা এক আশ্চর্য সরাইখানা। কেউ আসে আনন্দ করতে, কেউ আসে চিকিৎসা নিতে, কেউ আসে নতুন স্বপ্নের পুঁজি খুঁজতে। অথচ কারও জন্য অপেক্ষা করে আগুন, কারও জন্য হাসপাতালের দীর্ঘ সারি, কারও সামনে আবার এমন এক ব্যবস্থাপনা, যেখানে নিয়মের বই আছে, নিয়ম মানানোর লোকও আছেন-শুধু নিয়মটি ঠিক সময়ে জেগে ওঠে না। রাষ্ট্রের কাজ অবশ্য ঘুম ভাঙার পর তৎপর হওয়া নয়; বিপদ আসার আগেই চোখ-কান খোলা রাখা। কারণ, মানুষের জীবনে দুর্ঘটনা এক মুহূর্তের, কিন্তু দায়িত্বহীনতার প্রস্তুতি অনেক দিনের।
কক্সবাজারের উখিয়ার পাটুয়ারটেকে ইনানী সৈকতের কাছে তিনতলা একটি বিলাসবহুল রিসোর্টে আগুনে একই পরিবারের ছয় সদস্যসহ অন্তত ১০ পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, রিসোর্টটির বৈধ অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স ছিল না; আগেই সেটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়েছিল। খবরটি পড়তে গিয়ে ‘দুর্ঘটনা’ শব্দটির ওপর কলম থামিয়ে দিতে হয়।
ঝুঁকি আগে থেকেই জানা থাকলে, অথচ প্রতিরোধের ব্যবস্থা না থাকলে, দুর্ঘটনা আর অবধারিত নিয়তি এক কথা নয়। পাঁচ তারকা রিসোর্টে পাঁচ রকমের বিলাসিতা থাকতে পারে, কিন্তু আগুন লাগলে মানুষের প্রথম প্রয়োজন পাঁচ তারকা বিছানা নয়, বেরিয়ে যাওয়ার নিরাপদ পথ। পর্যটক সেখানে রাত কাটাতে যান, জীবন বিসর্জন দিতে নয়। এখন তদন্ত হবে, কমিটি বসবে, বিবৃতি আসবে; কিন্তু যে দশটি জীবন চলে গেল, তাদের কাছে এসবের কোনো মূল্য নেই। মূল্য আছে শুধু একটি প্রশ্নের-যে বিপদের খবর আগে থেকেই জানা ছিল, তাকে থামানো গেল না কেন? দেশের সব হোটেল ও রিসোর্টে অগ্নিনিরাপত্তা যাচাই তাই আনুষ্ঠানিক অভিযান হয়ে থাকলে চলবে না; এর ফল হতে হবে দৃশ্যমান, আর অবহেলার দায়ও হতে হবে নির্দিষ্ট।
মানুষের জীবন রক্ষার প্রশ্নটি হাসপাতালের দরজায় গিয়েও একইভাবে দাঁড়ায়। জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে প্রতিদিন বহির্বিভাগে তিন হাজারের বেশি রোগী আসেন, অথচ অস্ত্রোপচার ও ছানি অপারেশনের সক্ষমতা সেই তুলনায় কম। ফলে দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগীদের অপেক্ষা করতে হয় দীর্ঘদিন। চোখের অসুখে অপেক্ষারও একটি নিজস্ব অন্ধকার আছে-দিন যায়, দৃষ্টিশক্তি কমে, সঙ্গে কমে কাজ করার সামর্থ্য ও নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি। চিকিৎসার জন্য মানুষ রাজধানীতে আসেন চোখের আলো ফেরাতে; দীর্ঘ সিরিয়াল নিয়ে ফিরে গেলে তার সঙ্গে ফেরে আরেক ধরনের অন্ধকার।
এদিকে ডেঙ্গুতে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও সাতজনের মৃত্যু এবং ১,৮৭২ জনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খবর পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করেছে। চলতি বছরে মৃত্যুর সংখ্যা ৩৪২-এ পৌঁছেছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য জানানো হয়েছে। বাড়িঘর পরিষ্কার রাখা নাগরিকের দায়িত্ব, কিন্তু শহরের নালা পরিষ্কার, জমে থাকা পানি অপসারণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও মশার প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বও কারও না কারও আছে। নাগরিককে সচেতন হতে বলা যায় এক বাক্যে; নগরকে বাসযোগ্য রাখতে লাগে নিয়মিত কাজ। মশা অবশ্য সরকারি বিজ্ঞপ্তি পড়ে কামড়ায় না, আর ডেঙ্গুর ভাইরাসও দায়িত্ব ভাগাভাগির সভায় যোগ দেয় না।
এর মধ্যেই তরুণদের জন্য আশার একটি খবর এসেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানিয়েছেন, তরুণ উদ্যোক্তাদের নতুন ব্যবসায়িক উদ্যোগে সহায়তা দিতে সরকারি স্টার্টআপ ফান্ডের আকার প্রয়োজন হলে বাড়ানো হবে। তরুণের হাতে পুঁজি পৌঁছানো গেলে একটি ছোট উদ্যোগও একদিন কর্মসংস্থানের দরজা খুলতে পারে। কিন্তু সরকারি তহবিলের সাফল্য ঘোষণার মঞ্চে মাপা যায় না; মাপতে হয় কতজন সত্যিকারের উদ্যোক্তা সহায়তা পেলেন, কতটি ব্যবসা টিকে থাকল, কতজনের কর্মসংস্থান হলো। টাকা বরাদ্দ করা সহজ, সঠিক মানুষের হাতে পৌঁছানো কঠিন।
সরকারি কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সেই কঠিন কাজটির গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপার দরপত্রে কারসাজির অভিযোগের বিষয়টি তাই নিছক দাপ্তরিক অনিয়মের খবর নয়। একটি শিশুর হাতে সময়মতো বই পৌঁছানোর সঙ্গে রাষ্ট্রের সততারও সম্পর্ক আছে। একদিকে তরুণের স্বপ্নে বিনিয়োগ, অন্যদিকে শিক্ষার্থীর বই ছাপার টাকায় অনিয়মের অভিযোগ-দুটি খবর পাশাপাশি রাখলে বোঝা যায়, উন্নয়নের জন্য অর্থের অভাব যেমন সমস্যা, অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারাও তেমনি সমস্যা। সরকারি টাকার গায়ে কারও নাম লেখা থাকে না; কিন্তু তার অপচয়ের ক্ষত শেষ পর্যন্ত পড়ে সাধারণ মানুষের গায়েই।
হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি আবাসনসহ রাজধানীর ১৩টি স্থানে প্রধানমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শন-ছিল সারাদিন আলোচনায়। সামাজিক মাধ্যমে আজ আরেকটি ভিডিও নিয়ে তুমুল আলোচনা। ঢাকার গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানের নামে অস্ত্র হাতে মানুষকে তাড়া করতে দেখা গেছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে।
তার বক্তব্য, মাদক ব্যবসা বন্ধে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার কারণেই তিনি উদ্যোগ নিয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থলে সদস্য পাঠানো হয়েছে এবং কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভের কারণ বোঝা কঠিন নয়। মাদক একটি পরিবারকে ভেতর থেকে ভেঙে দিতে পারে, তরুণের ভবিষ্যৎ কেড়ে নিতে পারে। কিন্তু অপরাধ দমনের তাগিদে আইন প্রয়োগের নিয়মটাই যদি সরিয়ে রাখা হয়, তবে শেষ পর্যন্ত আমরা কোন ব্যবস্থার ওপর ভরসা করব?
জনপ্রতিনিধির কাজ প্রশাসনকে সক্রিয় করা, পুলিশের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, অপরাধীর বিচার চাওয়া। অস্ত্র হাতে রাস্তায় নেমে পড়লে মুহূর্তের জন্য বীরত্বের দৃশ্য তৈরি হতে পারে, কিন্তু আইনের শাসন দৃশ্যের বিষয় নয়; এটি নিয়মের বিষয়। আজকের দুটি সম্পাদকীয় প্রশ্নও এখানে এসে মেলে-ইনানীর রিসোর্টে অগ্নিনিরাপত্তার বিধি কার্যকর ছিল কি না, আর মাদকবিরোধী অভিযানে ক্ষমতার সীমা মানা হচ্ছে কি না। এক জায়গায় নিয়মের প্রয়োগ না হওয়ার অভিযোগ, অন্য জায়গায় নিয়মের বাইরে গিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার বিতর্ক। রাষ্ট্রের ভারসাম্য থাকে এই দুই বিপদের মাঝখানে। আইন যেন অপরাধীর নাগালের বাইরে না থাকে, আবার ক্ষমতাবানও যেন আইনের নাগালের বাইরে চলে না যান।
সমুদ্রপথে হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা বাড়ার খবর আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে আরও অস্থির করে তুলেছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দাবি করেছে, প্রণালি দিয়ে যাতায়াতের সময় বিপুল অপরিশোধিত তেলবাহী একটি ট্যাংকার সামুদ্রিক মাইনে আঘাত পেয়ে বিস্ফোরিত হয়েছে। ঘটনার বিবরণ ও দায় স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি। একই সময়ে সিএনএনের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ‘মাদার অব অল বোম্বস’ ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা সামনে এসেছে। এটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। তবে এমন সামরিক বিকল্প আলোচনায় আসাই সংঘাতের তীব্রতা বুঝিয়ে দেয়। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তার অভিঘাত দূরের কোনো মানচিত্রে আটকে থাকবে না।
জ্বালানি আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের পরিবহন, উৎপাদন ও নিত্যপণ্যের দামে তার আঁচ পড়তে পারে। অন্যদিকে, অধিকৃত পশ্চিম তীরের তাইবেহ গ্রামে ইউরোপীয় কূটনীতিক ও ধর্মীয় প্রতিনিধিদের ওপর মুখোশধারী ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলার খবরও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনের ভাষা যতই পরিষ্কার হোক, তার প্রয়োগে পক্ষপাত থাকলে দুর্বল মানুষের নিরাপত্তা কাগজেই থেকে যায়। আইন তখন বইয়ের পাতায় সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, আর বাস্তব পৃথিবীতে ক্ষমতার সামনে মাথা নোয়ায়।
বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের আলোচনায় যুদ্ধ, ঋণের চাপ, জ্বালানি অনিশ্চয়তা ও ভূরাজনৈতিক বিভাজনের প্রভাব গুরুত্ব পেয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্পর্কের টানাপোড়েনও যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে। বড় শক্তির কূটনীতিতে একেকটি বাক্যের ওজন অনেক; কিন্তু তার ফল বহন করেন প্রায়ই এমন মানুষ, যাদের কোনো আলোচনার টেবিলে বসার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষও বিশ্ব পরিস্থিতির বাইরে নন। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, উৎপাদন খরচ বাড়লে বাজারে চাপ পড়ে, আর বাজারের সেই চাপ গিয়ে বসে মাসের শেষ সপ্তাহের সংসার খরচে।
তাই উন্নয়নের হিসাব শুধু প্রবৃদ্ধির অঙ্কে মেলালে চলবে না; মানুষের আয়, চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে তার যোগসূত্র থাকতে হবে। দিনের খবরগুলো শেষ পর্যন্ত আমাদের একটি সহজ কথাই মনে করিয়ে দেয়: রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সাফল্য বড় ঘোষণা নয়, ছোট ছোট বিপদ থেকে মানুষকে রক্ষা করা।
একজন পর্যটক নিরাপদে বাড়ি ফিরবেন, একজন রোগী সময়মতো চিকিৎসা পাবেন, একজন তরুণ স্বচ্ছ ব্যবস্থায় পুঁজি পাবেন, আর একজন ক্ষমতাবানও আইন মেনে চলবেন-এগুলো শুনতে খুব সাধারণ প্রত্যাশা। রাষ্ট্রের কাছে সাধারণ মানুষের চাওয়া প্রায়ই এমনই সাধারণ। শুধু সেগুলো পূরণ করতেই অসাধারণ দায়িত্ববোধের প্রয়োজন হয়।
লেখক: সাবেক সিনিয়র সচিব।