Dhaka Mail Logo

মতামত

খাদ্যপণ্যের মোড়কেই থাকুক সুস্বাস্থ্যের বার্তা

ঢাকা মেইল ডেস্ক

১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৪২ পিএম

খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকার। তবে খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত হলেই জনস্বাস্থ্য পুরোপুরি সুরক্ষিত হয় না; খাদ্য হতে হয় নিরাপদ, পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত। প্রতি বছর ১৬ অক্টোবর পালিত ‘বিশ্ব খাদ্য দিবস’ আমাদের খাদ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ করে দেয়। ২০২৬ সালের বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রতিপাদ্য "Innovate today. Nourish tomorrow" বা ‘আজকের উদ্ভাবন, আগামীদিনের পুষ্টি ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ’। এই প্রতিপাদ্যের আলোকে বাংলাদেশের খাদ্য ও পুষ্টি সুরক্ষায় সবচেয়ে সময়োপযোগী একটি উদ্যোগ হতে পারে প্যাকেটজাত খাবারে ‘ফ্রন্ট অফ প্যাক লেবেলিং’ বা প্যাকেটের সামনের অংশে স্পষ্ট পুষ্টি সতর্কবার্তা চালু করা।

গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে অভাবনীয় অগ্রগতি অর্জন করেছে। ধান, মাছ, শাকসবজি ও আলু উৎপাদনে দেশ আজ বিশ্বে রোল মডেল। কিন্তু আমাদের খাদ্য ও পুষ্টির চ্যালেঞ্জ এখন আর কেবল খাদ্যের অপর্যাপ্ততা কিংবা অপুষ্টির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নগরায়ণ, দ্রুত জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং বিপণন সংস্কৃতির আগ্রাসনে মানুষের খাদ্যাভ্যাসে এসেছে মারাত্মক রূপান্তর। ঐতিহ্যবাহী ও পুষ্টিকর প্রাকৃতিক খাবারের স্থান দ্রুত দখল করে নিচ্ছে প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত খাবার, জাঙ্ক ফুড, ফাস্টফুড এবং কোমল পানীয়। সুপারশপ থেকে শুরু করে পাড়ার ছোট মুদি দোকান সবখানেই এখন এসব খাবারের ছড়াছড়ি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) এর মতে, চিপস, বিস্কুট, চানাচুর বা মিষ্টি পানীয়ের মতো প্যাকেটজাত খাবারে অতিরিক্ত মাত্রায় চিনি, লবণ (সোডিয়াম) এবং অস্বাস্থ্যকর ট্রান্স ফ্যাট বা স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে, যা নিয়মিত গ্রহণ স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রে বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল, কারণ শৈশবে গড়ে ওঠা খাদ্যাভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে তাদের সমগ্র জীবনের ওপর প্রভাব ফেলে।

বাংলাদেশের বর্তমান জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি এ বিষয়ে সতর্ক হওয়ার যথেষ্ট কারণ দেখায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশের জন্য দায়ী বিভিন্ন অসংক্রামক রোগ (এনসিডি)। হৃদ্‌রোগ, ক্যানসার, ডায়াবেটিস ও দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগের মতো অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়াতে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের অনিয়ন্ত্রিত গ্রহণ সরাসরি জড়িত। অতিরিক্ত লবণ উচ্চ রক্তচাপ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়; অন্যদিকে অতিরিক্ত চিনি ও ক্যালরিযুক্ত খাবার স্থূলতা এবং বিপাকীয় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই এসব মহামারী রোগ প্রতিরোধে কেবল চিকিৎসাসেবা নয়, বরং খাদ্যাভ্যাসের উন্নয়ন ও কার্যকর জনস্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন করা জরুরি।

এ ক্ষেত্রে প্যাকেটের সামনের অংশে পুষ্টি-সতর্কবার্তা বা (এফওপিএল) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সাধারণত প্যাকেটজাত বা প্রক্রিয়াজাত খাবারের পেছনের বা নিচের দিকে অত্যন্ত ক্ষুদ্র হরফে পুষ্টি উপাদানের যে তালিকা দেওয়া থাকে, তা সাধারণ মানুষের পক্ষে পড়া বা বোঝা অত্যন্ত দুরূহ। ফলে কেনাকাটার সময় ভোক্তারা সহজে বুঝতে পারেন না কোন পণ্যে চিনি, সোডিয়াম বা ক্ষতিকর চর্বির পরিমাণ উদ্বেগজনক। ফ্রন্ট অফ প্যাক লেবেলিং এই জটিলতা দূর করে প্যাকেটের ঠিক সামনেই সহজবোধ্য দৃশ্যমান লেবেল বা সতর্কবার্তা ফুটিয়ে তোলে। এর ফলে একজন ক্রেতা দোকানে দাঁড়িয়ে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বুঝতে পারেন পণ্যটি তার পরিবারের জন্য নিরাপদ কিনা। এটি ভোক্তাদের সঠিক তথ্য জানার বা ‘রাইট টু নো’ অধিকার নিশ্চিত করার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।

Food

সাম্প্রতিক গবেষণাও এই দাবির পক্ষে জোরালো প্রমাণ দেয়। বাংলাদেশের আটটি বিভাগের কিশোর-কিশোরী ও প্রাপ্তবয়স্কদের নিয়ে পরিচালিত একটি জাতীয় পর্যায়ের পরীক্ষামূলক গবেষণায় দেখা গেছে, প্যাকেটের সামনের অংশে সতর্কতামূলক লেবেল থাকলে অতিরিক্ত চিনি, সোডিয়াম, সম্পৃক্ত চর্বি বা ক্যালরিযুক্ত খাবার শনাক্ত করার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। সতর্কতামূলক লেবেল ব্যবহারকারীদের মধ্যে সঠিকভাবে অস্বাস্থ্যকর পণ্য শনাক্তের হার ছিল প্রায় ৬৮ থেকে ৭৩ শতাংশ, যেখানে লেবেলবিহীন নিয়ন্ত্রণ গোষ্ঠীতে তা মাত্র ১৪ থেকে ১৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ ছিল।

বিশ্ব খাদ্য দিবসের মূল চেতনার সাথে ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিংয়ের যোগসূত্র অত্যন্ত গভীর। উদ্ভাবন মানে কেবল নতুন প্রযুক্তি বা যন্ত্র নয়; বরং মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় কার্যকর জ্ঞানকে জনস্বাস্থ্য নীতিতে রূপ দেওয়াও এক ধরনের বড় উদ্ভাবন। বাধ্যতামূলক, বিজ্ঞানভিত্তিক ও সহজবোধ্য পুষ্টি-সতর্কবার্তা চালুর মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন সহজতর হতে পারে। এর জন্য বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) এবং সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রক্রিয়াজাত খাদ্য প্রস্তুতকারক বহুজাতিক বা দেশীয় কোম্পানিগুলোর বাণিজ্যিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে গিয়ে জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে। পণ্যের পুষ্টিমান অনুযায়ী স্পষ্ট সতর্কবার্তা, কার্যকর বাজার নজরদারি এবং বিধি লঙ্ঘনে জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উৎপাদকদের জন্য বাস্তবসম্মত নির্দেশনা থাকা জরুরি।

পরিশেষে বলা যায়, কেবল খাদ্য উৎপাদন বাড়িয়ে খাদ্যে পরিমাণগত স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হয় না; উৎপাদিত খাদ্য মানুষের শরীরে পুষ্টি জোগাচ্ছে নাকি রোগ বাড়াচ্ছে, তা নজরদারিতে রাখাও সমানভাবে জরুরি। বিশ্ব খাদ্য দিবস ২০২৬-এর আলোকেই আমাদের দেশে বাধ্যতামূলকভাবে ফ্রন্ট অফ প্যাক লেবেলিং নীতি আইনগতভাবে বাস্তবায়ন করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। প্যাকেটের সামনে স্পষ্ট স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই রচিত হোক এক সুস্থ, সবল ও নিরাপদ বাংলাদেশের সুদৃঢ় ভিত্তি।

লেখক: উন্নয়নকর্মী