Dhaka Mail Logo

মতামত

ওষুধশিল্পে আগুন, রাষ্ট্রের পরীক্ষা: ঝুঁকির প্রস্তুতি ও জবাবদিহি কোথায়?

১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০৭ পিএম

একটি ওষুধ কারখানা শুধু শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয়; সেখানে তৈরি হয় মানুষের সুস্থ হওয়ার আশা। অথচ সেই ওষুধ তৈরির স্থানেই কর্মী, উদ্ধারকারী ও আশপাশের মানুষের নিরাপত্তা যদি হুমকির সম্মুখীন হয়, তবে সেসব শুধু কারখানার অভ্যন্তরীণ বিষয় থাকে না— বরং হয়ে ওঠে জননিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় তদারকির পরীক্ষা।

১৪ অক্টোবর গাজীপুরে টঙ্গীর চেরাগ আলীতে ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ফায়ার সার্ভিসের ২১টি ইউনিট কাজ করেছে; সেনাবাহিনী ও বিজিবিও সহায়তা করেছে। ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালকের বক্তব্য উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ভবনের ভেতরের রাসায়নিক ও অ্যালুমিনিয়াম শিটের নিচে ব্যবহৃত দাহ্য রাবার আগুনকে তীব্র করেছে। ধোঁয়া ও তীব্র গন্ধে অভিযান ব্যাহত হয়েছে এবং একজন ফায়ার সার্ভিস কর্মীর শ্বাসকষ্টের চিকিৎসা নিতে হয়েছে। সেনাবাহিনীর কেমিক্যাল ডেঞ্জার ইউনিটও সহায়তা করেছে। তবে ‘ক্লোরিনের মতো’ গন্ধ কোনো রাসায়নিকের পরিচয় নিশ্চিত করে না; তা নির্ধারণে প্রয়োজন উপযুক্ত নমুনা পরীক্ষা। 

কারখানা কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক বক্তব্যে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটের সম্ভাবনার কথা এসেছে। কিন্তু ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক বলেছেন, আগুনের সুনির্দিষ্ট কারণ তখনও নির্ধারিত হয়নি। একটি প্রতিবেদনে কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে উৎপাদন ভবনে দাহ্য পদার্থ না থাকার দাবিও এসেছে, আর ফায়ার সার্ভিসের বক্তব্যে ভবনের ভেতরে রাসায়নিকের উপস্থিতির কথা বলা হয়েছে। এই পার্থক্য জনসমক্ষে পরিষ্কার হওয়া দরকার— রাসায়নিকের তালিকা, মজুতের পরিমাণ, অবস্থান ও নিরাপত্তা-তথ্যপত্র দিয়ে। তদন্তের আগে কোনো পক্ষকে দোষী বলা ঠিক হবে না; তবে প্রশ্ন করাও জরুরি।

প্রথম প্রশ্ন: শর্ট সার্কিটের ধারণার পক্ষে কী প্রমাণ আছে? বৈদ্যুতিক ত্রুটি আগুনের সূচনা করতে পারে, কিন্তু কারণ নিশ্চিত করতে উৎসস্থল, তার ও ডিস্ট্রিবিউশন বোর্ডের অবস্থা, সুরক্ষা-ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং ঘটনাস্থলের আলামত পরীক্ষা করতে হয়। সংবাদমাধ্যমে ফায়ার সার্ভিসের বরাতে আগুনের সূচনা ভবনের চতুর্থ তলায় হয়েছে বলে উল্লেখ আছে। যদি ছাদে আগুন শুরুর আলাদা দাবি থাকে, সেটিও আলামত ও নকশার সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করতে হবে। 

আগুন কীভাবে ছড়াল, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আগুনের উৎপত্তি এক জায়গায় হলেও দাহ্য আবরণ বা ইনসুলেশন, খোলা সিঁড়ি, সার্ভিস-শ্যাফট, অপর্যাপ্ত অগ্নি-প্রতিরোধী দেয়াল-দরজা, কিংবা ভবনের দুই অংশের সংযোগপথ দিয়ে তা দ্রুত বিস্তার লাভ করতে পারে। কিছু অ্যালুমিনিয়াম কম্পোজিট প্যানেলের ভেতরে দাহ্য কোর থাকতে পারে; তবে এই কারখানায় কী ধরনের প্যানেল বা আবরণ ছিল, তা পরীক্ষা ছাড়া বলা যাবে না। অ্যালুমিনিয়ামের বাইরের স্তর দেখেই কোনো স্থাপনাকে অগ্নি-নিরাপদ ধরে নেওয়া যায় না।

এখানেই সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রশ্ন আসে। অ্যালার্ম, ডিটেক্টর, স্প্রিংকলার, হাইড্র্যান্ট, পাম্প ও পানির সরবরাহ— এসব সক্রিয় ব্যবস্থা। অগ্নি-প্রতিরোধী দরজা ও দেয়াল, ফায়ার-কম্পার্টমেন্টেশন, সিঁড়িঘরের সুরক্ষা এবং পাইপ-কেবলের ফাঁক সিল করা— এসব নিষ্ক্রিয় ব্যবস্থা। কোনটি নকশায় ছিল, বাস্তবে স্থাপন করা হয়েছিল, নিয়মিত পরীক্ষা হয়েছে কিনা, আর আগুনের সময় কাজ করেছে কিনা— উত্তর দিতে হবে নথি, পরীক্ষা ও স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে। 

আগুন বড় হয়েছে বলেই সব ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছিল বলা যাবে না; কিন্তু সেগুলো যাচাই না করেও কার্যকর ছিল ধরে নেওয়া যায় না। হ্যাজম্যাট প্রস্তুতি নিয়েও নির্দিষ্ট প্রশ্ন প্রয়োজন। ঘটনাস্থলে ইনসিডেন্ট কমান্ড সিস্টেম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল কি? দায়িত্ব ও যোগাযোগ কে সমন্বয় করেছেন? ঝুঁকিপূর্ণ হট জোন, নিয়ন্ত্রিত সহায়তা ও ডিকন্টামিনেশনের ওয়ার্ম জোন এবং কমান্ড-চিকিৎসা-লজিস্টিকসের কোল্ড জোন নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল কি? প্রথম পৌঁছানো কর্মকর্তারা রাসায়নিক ঝুঁকি কীভাবে শনাক্ত করেছিলেন? প্রবেশকারী কর্মীদের PPE সম্ভাব্য রাসায়নিকের উপযোগী ছিল কি? এসব প্রশ্নের উত্তর অনুমান নয়, কার্যক্রমের নথি, রেডিও যোগাযোগ, প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম যাচাই করে দিতে হবে।

ফায়ার সার্ভিসের বিশেষায়িত হ্যাজম্যাট সক্ষমতাও পর্যালোচনা করা দরকার— নির্ধারিত দল আছে কিনা, তাদের প্রশিক্ষণ, রাসায়নিক শনাক্তকরণ সরঞ্জাম, উপযুক্ত শ্বাস-সুরক্ষা, ডিকন্টামিনেশন সুবিধা এবং দ্রুত মোতায়েনের প্রস্তুতি কেমন। সাধারণ অগ্নিনির্বাপণ পোশাক সব রাসায়নিক থেকে সুরক্ষা দেয় না; PPE নির্বাচন করতে হয় পদার্থ ও সংস্পর্শের ধরন বুঝে।

লাইসেন্স ও পরিদর্শনের ক্ষেত্রেও জবাবদিহিতা চাই। একটি কারখানার অনুমোদন বা লাইসেন্স যদি একাধিক সরকারি সংস্থার মাধ্যমে হয়, তাহলে কোন সংস্থা কোন ঝুঁকি যাচাই করেছে, সরেজমিন পরিদর্শন হয়েছে কিনা, ঘাটতি পাওয়া গেলে তা সংশোধিত হয়েছিল কিনা— এসব প্রকাশ করা উচিত। ১০–১৪টি দফতরের অনুমোদন প্রয়োজন হয়ে থাকলে, তাদের দায়িত্বের সীমানা ও পরিদর্শন-রেকর্ড স্পষ্ট করতে হবে। সব দফতরের দায়িত্ব এক নয়; জবাবদিহিতা নির্ধারিত হওয়া উচিত তাদের আইনগত দায়িত্ব, সিদ্ধান্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে।

আগুন নিভলেই ঝুঁকি শেষ হয় না। ছাই, ধোঁয়ার অবশিষ্টাংশ, দূষিত নির্বাপণ-পানি বা ক্ষতিগ্রস্ত পাত্র থেকে পরবর্তী দূষণের আশঙ্কা আছে কিনা, তা পরীক্ষা করতে হবে— অনুমান করে কোনো দূষণ ঘটেছে বা ঘটেনি বলা যাবে না। ধোঁয়া বা রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসা শ্রমিক ও উদ্ধারকারীদের পরিচয়, অবস্থান, সংস্পর্শের সময় ও উপসর্গ নথিবদ্ধ করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শে ঝুঁকিভিত্তিক স্বাস্থ্য মূল্যায়ন করাও জরুরি।

প্রতিরোধে বিনিয়োগকে অনেক সময় ব্যয় মনে হয়; কিন্তু আগুনের পর উদ্ধার, চিকিৎসা, পরিবেশ পরিষ্কার, উৎপাদন বন্ধ ও পুনর্নির্মাণের মূল্য আরও বড় হতে পারে। ‘এক শতাংশ খরচেই সব নিরাপদ’ —এমন নিশ্চয়তা নেই; প্রয়োজন প্রকৃত ঝুঁকি অনুযায়ী বিনিয়োগ ও নিয়মিত যাচাই। এই ক্ষতি শুধু মালিকের সম্পদের নয়— শ্রমিকের জীবিকা, জরুরি সেবার সক্ষমতা, পরিবেশ, উৎপাদন ও দেশের শিল্প-নিরাপত্তার ভাবমূর্তিরও।

ওষুধ মানুষের জীবন বাঁচায়। সেই ওষুধ তৈরির মানুষ, পরিবেশ এবং দেশের আস্থা রক্ষা করা রাষ্ট্র, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার যৌথ দায়িত্ব। আগুনের কারণ নির্ধারণ হোক প্রমাণে; আর আগুনের আগে নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক কার্যকর ব্যবস্থায়।

লেখক: ফায়ার, দুর্যোগ ও বিপদজনক পদার্থ বিশেষজ্ঞ

এফএ