বিশেষ প্রতিনিধি
১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৩৪ পিএম
হঠাৎ করে বিদেশি এবং বিদেশি শিক্ষার্থীদের ব্যাপারে কঠোর নিয়ম-কানুন চালু করায় বিপাকে পড়েছে জাপান।
জাপানি ভাষা শিক্ষার স্কুলগুলোতে বর্তমানে আসনের অভাব নেই। কিন্তু সেই তুলনায় স্কুলগুলো পর্যাপ্ত স্টুডেন্ট পাচ্ছে না। আগে যেসব স্কুল কঠিন ইন্টারভিউ নিতো, তারাও এখন ম্যাসেজ দিয়ে বলছে, সার্টিফিকেট ছাড়া এবং ইন্টারভিউ ছাড়াও স্টুডেন্ট নেবে।
পহেলা অক্টোবর থেকে ধাপে ধাপে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন নিয়ম। এই নিয়ম অনুযায়ী, স্থায়ী বসবাসের আবেদনকারীদের জাপানের গড় আয়ের চেয়ে বেশি বার্ষিক পারিবারিক আয় দেখাতে হবে।
এপ্রিল থেকে জমা দেওয়া আবেদনগুলোর ক্ষেত্রেও এই শর্ত প্রযোজ্য হবে। পাশাপাশি জাপানি ভাষায় দক্ষতার প্রমাণও দিতে হবে।
এছাড়া আবেদনকারীদের ৩০ বছরের পেনশন প্রদানের সমপরিমাণ অর্থের পেনশন সঞ্চয় থাকতে হবে। নতুন নিয়মের ব্যাখ্যায় জাপানের ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস এজেন্সি বলেছে, বিদেশিদের স্বনির্ভরভাবে বসবাস করতে হবে এবং বোঝা হয়ে পড়ার ঝুঁকি ছাড়া স্থিতিশীল জীবন নিশ্চিত করতে হবে।
জাপানে ১৪ বছর ধরে বসবাসকারী মার্কিন নাগরিক সারা নেলকিনও নতুন নিয়ম নিয়ে উদ্বিগ্ন। জাপানি অ্যানিমেশন ও ভিডিও গেমের ভক্ত নেলকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে দেশটিতে আসেন।
পরে সেখানেই বিনোদন শিল্পে ক্যারিয়ার গড়ে তোলেন। নতুন নিয়ম ঘোষণার কিছুদিন আগে স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদন করেছিলেন তিনি।
আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে জাপানের নাগরিকত্ব নেওয়ার কথা ভাবছেন তিনি। তবে এর জন্য তাকে মার্কিন নাগরিকত্ব ছাড়তে হবে, কারণ জাপান দ্বৈত নাগরিকত্ব স্বীকার করে না।
নেলকিন বলেন, জাপানেই তার পুরো যৌবন কেটেছে। যুক্তরাষ্ট্রে থাকা মায়ের সঙ্গে যোগাযোগসহ বিভিন্ন কারণে মার্কিন পাসপোর্ট ধরে রাখতে চান তিনি। তবে পরিস্থিতির কারণে শেষ পর্যন্ত মার্কিন নাগরিকত্ব ছাড়তে হতে পারে বলেও জানান।
আরও পড়ুন: জাপানে বিনা খরচে পড়াশোনার সুযোগ
জাপানের উরায়াসুর মেইকাই ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক রিসা হাগিওয়ারা বলেন, নতুন পরিবর্তনগুলো দেশটির অভিবাসন নীতিকে নির্বাচনমূলক ও শর্তসাপেক্ষ করার দিকে অগ্রসর হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। অথচ জনসংখ্যা কমে যাওয়ার কারণে শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় জাপানের বিদেশি কর্মী প্রয়োজন।
ঐতিহাসিকভাবে জাপানে অভিবাসন এখন ক্রমেই স্পর্শকাতর রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হচ্ছে। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ দেশটিতে বিদেশি বাসিন্দার সংখ্যা রেকর্ড ৪১ লাখ ২০ হাজারে পৌঁছেছে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩ শতাংশ।
অন্যদিকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত জাপানি নাগরিকের সংখ্যা ৯ লাখেরও বেশি কমেছে। দেশটির জন্মহারও দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত কম।
হাগিওয়ারা বলেন, শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় জাপান যদি বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভর করতে চায়, তাহলে তারা দেশটিতে আসার পর কী হবে, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
তার মতে, প্রশ্নটি এখন শুধু জাপানে কত বিদেশি কর্মী প্রয়োজন তা নয়, বরং বিদেশিদের সঙ্গে দেশটি কী ধরনের সমাজ গড়ে তুলতে চায় সেটিও।
জাপানের অভিবাসন নীতিতে সম্ভাব্য পরিবর্তনের আলোচনা দেশটির রাজনীতিতে ডানপন্থী প্রবণতা বাড়ার মধ্যেই সামনে এসেছে।
গত বছর রক্ষণশীল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতৃত্বের প্রচারের সময় প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বলেছিলেন, সম্পূর্ণ ভিন্ন সংস্কৃতি ও পটভূমির মানুষদের প্রবেশের সুযোগ দেওয়া নীতিগুলো আপাতত পুনর্বিবেচনা করা উচিত।
পরবর্তী সময়ে ডানপন্থী জাপান ইনোভেশন পার্টির সঙ্গে তার জোট চুক্তিতে নিয়ম ভঙ্গকারী বিদেশিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং বিদেশি জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে সম্ভাব্য সামাজিক প্রতিকূলতা মোকাবিলার পদক্ষেপের কথা বলা হয়।
বিদেশিদের নিয়ে জনমতেও পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। টোকিও ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল সায়েন্সের সাম্প্রতিক এক জরিপে ৫৬ দশমিক ৩ শতাংশ জাপানি নাগরিক আরও বেশি বিদেশি গ্রহণের বিরোধিতা করেছেন। ২০২৪ সালে এ হার ছিল ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ।
-এমএমএস