Dhaka Mail Logo

মতামত

রাষ্ট্রের কাছে আরেকটি আশ্বাস নয়, চাই সমাধান

১১ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৩৩ পিএম

দুদিনের অবকাশ ঝেড়ে রাষ্ট্রযন্ত্র আজ আবার সচল হয়েছে; ফাইল খুলছে, বৈঠক বসছে, নির্দেশ যাবে, নির্দেশের জবাব আসবে কি না-সেটি অবশ্য আলাদা প্রশ্ন। তবে রোববারের সকাল আমাদের আবার মনে করিয়ে দেয়, রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কটা অনেকটা বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটের মতো-এক পক্ষ নিয়ম বানায়, অন্য পক্ষ ভাড়া দেয়; কিন্তু বাড়ির ছাদ চুইয়ে পড়লে শেষ পর্যন্ত দুজনেরই ঘুম নষ্ট হয়।

শনিবার যুব উন্নয়ন অধিদফতরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নিয়োগ পরীক্ষা প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে স্থগিত হওয়ার পর ঢাকার বিভিন্ন স্থানে চাকরিপ্রার্থীদের বিক্ষোভ হয়েছে। ২৪২টি পদের বিপরীতে তিন লাখের বেশি প্রার্থী অংশ নেওয়ার জন‍্য রাজধানীতে এসেছিলেন। পরীক্ষা ১৬ অক্টোবর পুনর্নির্ধারণের খবরও এসেছে। প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ সত্য কি না, তদন্তে তা স্পষ্ট হবে; কিন্তু চাকরিপ্রার্থীদের সময়, অর্থ ও মানসিক প্রস্তুতির যে ক্ষতি হলো, তার হিসাব কে রাখবে? প্রতিযোগিতার মাঠে বাঁশি বাজার আগেই যদি প্রশ্নের উত্তর বাইরে ঘুরে বেড়ায়, তবে মেধাবীরা দৌড়াবেন কোন ভরসায়?

রাষ্ট্রের পরীক্ষায় আস্থার প্রশ্নটি আরও বড় হয়ে ওঠে যখন মানুষের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের প্রসঙ্গ আসে। যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মানবপাচারবিষয়ক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে তদন্ত বাড়লেও দণ্ডিত পাচারকারীর সংখ্যা কমার কথা বলা হয়েছে।

২০২৩ সালে ৪০৭ জন, ২০২৪ সালে ১০৩ জন এবং ২০২৫-২৬ প্রতিবেদনের সময়কালে মাত্র ৭৬ জন দণ্ডিত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নতুন আইন হয়েছে, তদন্তও চলছে; তবু ভুক্তভোগীর সুরক্ষা ও অপরাধীর শাস্তির মধ্যে দূরত্ব থেকে যাচ্ছে। আইন বইয়ে থাকলে রাষ্ট্রের দায় কিছুটা পূরণ হয়, মানুষের জীবনে তার ফল পৌঁছালে তবেই পূরণ হয় আসল কাজটি।

বিদেশে কাজ করতে যাওয়া মানুষের স্বপ্নের সঙ্গে যখন ঋণ, দালাল ও প্রতারণা জড়িয়ে যায়, তখন বৈদেশিক মুদ্রার হিসাবের পাশে তাদের নিরাপত্তার প্রশ্নটি থেকে যায়।

এই আস্থার ভিত কতটা মজবুত, তা বোঝা যায় হাসপাতালের দরজায়, ঢাকার রাস্তায়, এমনকি একটি সরকারি দফতরের জানালার কাছেও। রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে অনুমোদনহীন ব্লাড ব্যাংক ও ক্লিনিকে রক্ত সংগ্রহ, কেনাবেচা এবং দূষিত রক্ত সরবরাহের অভিযোগ অনেকদিনের। অসুস্থ স্বজনের জন্য রক্ত খুঁজতে থাকা মানুষটির কাছে তখন রক্তের গ্রুপের চেয়েও বড় প্রশ্ন-যে রক্ত কিনছি, তা নিরাপদ তো? একই শহরে যানজট, জলাবদ্ধতা, বায়ুদূষণ ও গণপরিবহনের দূরবস্থা নিয়ে নগর পরিকল্পনার বাস্তবায়নহীনতার অভিযোগ; অন্যদিকে ক্যানসার আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধির উদ্বেগ।

আন্তর্জাতিক সংস্থা আইএআরসির উদ্ধৃত হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে নতুন ক্যানসার রোগীর সংখ্যা ২০২২ সালের ১ লাখ ৬৭ হাজার ২৫৬ থেকে ২০২৪ সালে ১ লাখ ৮৭ হাজার ২৬৩ হয়েছে। শহর ও শরীর-দুটিই অসুখের পূর্বাভাস দেয়; আমরা অনেক সময় চিকিৎসা শুরু করি অসুখটি আর উপেক্ষা করা যায় না যখন। অথচ প্রতিরোধের খরচ সাধারণত অবহেলার মাশুলের চেয়ে কম।

সামাজিক মাধ্যমের আয়নায়ও আজকাল রাষ্ট্রের মুখ দেখা যায়-কখনো পরিষ্কার, কখনো এমনভাবে বাঁকা যে আয়নাটিকেই সন্দেহ হয়। হবিগঞ্জের চুনারুঘাট থানার এক সহকারী উপপরিদর্শকের ঘুষ নিয়ে মন্তব্যের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর তাকে সক্রিয় দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং তদন্তের কথা জানানো হয়েছে।

ভিডিওতে শোনা কথাগুলোর প্রেক্ষাপট ও সত্যতা তদন্তে যাচাই হওয়া দরকার; তবে ঘটনাটি জনমনে যে প্রশ্ন তুলেছে, তা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। একইভাবে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় রাজনৈতিক আধিপত্য ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষ ও গুলিবিনিময়ের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। দেশজুড়ে বিশেষ অভিযানে প্রায় ছয় হাজার ব্যক্তিকে আটকের খবরও এসেছে। অপরাধ দমন রাষ্ট্রের দায়িত্ব, কিন্তু আটকসংখ্যা দিয়ে নিরাপত্তার সাফল্য মাপা যায় না। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়াই শেষ পর্যন্ত সেই মাপকাঠি।

সামাজিক মাধ্যম আদালত নয়, আবার কখনো কখনো এমন ঘণ্টা বাজায়, যা দপ্তরের ফাইলের ভেতর থেকে শোনা যায় না। ঘণ্টা বাজলে সেটি ভাঙার বদলে দরজা খুলে দেখা ভালো।

তবে সব খবরের রং এক নয়। বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে বেশি-এমন পরিসংখ্যান স্বাস্থ্য খাতের অগ্রগতির কথা বলে। আবার চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে অপ্রচলিত বাজারে তৈরি পোশাক রফতানি ৯.৪০ শতাংশ বৃদ্ধির খবর অর্থনীতির জন্য নতুন সম্ভাবনার জানালা খুলেছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে ওষুধ, কৃষিপণ্য ও তথ্যপ্রযুক্তির বাজারও বাড়াতে হবে। অর্থনীতির একটি মাত্র খুঁটির ওপর নির্ভর করলে ঝড়ের দিনে ঘর সামলানো কঠিন; কয়েকটি খুঁটি থাকলে অন্তত ভরসা থাকে।

একই যুক্তি প্রযোজ্য সাংবিধানিক সংস্কারেও। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা এবং ভবিষ্যতে তা বাতিলের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক গণভোটের বিধান নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রস্তাবটির ভাষা ও কার্যকারিতা নিয়ে খুঁটিনাটি বিচার জরুরি। সংবিধানে রক্ষাকবচ থাকলেই গণতন্ত্র নিরাপদ হয় না; নির্বাচন, প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতার জবাবদিহিও কার্যকর হতে হয়। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শহীদ নাজির উদ্দিন জেহাদসহ অন্য শহীদদের স্মরণে সম্পাদকীয়গুলো যে রাষ্ট্র সংস্কারের তাগিদ দিয়েছে, তার প্রকৃত মূল্যায়ন হবে প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা বদলাল, তা দিয়ে।

বাংলাদেশের কূটনীতিতেও আস্থা ও দায়িত্বের হিসাব রয়েছে। সৌদি আরবের সঙ্গে প্রস্তাবিত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা চলছে। মুসলিম বিশ্বের শান্তি ও স্থিতিশীলতায় ভূমিকা রাখার পাশাপাশি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, কূটনৈতিক ভারসাম্য ও সম্ভাব্য দায় বিবেচনায় রাখা দরকার। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে তার বক্তব্য-বাংলাদেশ অনির্দিষ্টকালের জন্য এই বোঝা বহন করতে পারে না-সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে। কথাটির পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়াতে হবে; মানবিক সংকটের দায় বাংলাদেশের কাঁধে রেখে বিশ্বসমাজের নিশ্চিন্ত থাকার সুযোগ নেই।

অন্যদিকে দিল্লির যন্তর-মন্তরে নির্বাচন কমিশনের প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন ও বিক্ষোভকারী আটকের খবর এসেছে। বিরোধীদের নির্বাচনী নিরপেক্ষতা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে, যা ক্ষমতাসীন পক্ষ ও নির্বাচন কমিশন অস্বীকার করে আসছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্বচ্ছতা দরকার।

মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনাও বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ও দামের অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে। দূরের সংঘাতের খরচ শেষ পর্যন্ত অনেক সময় ঘরের বাজারে এসে হাজির হয়-বিশ্বরাজনীতির এই অঙ্ক সাধারণ মানুষকে বুঝিয়ে দেওয়ার দরকার পড়ে না; বাজারই বুঝিয়ে দেয়।

সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে তাই রাষ্ট্রের কাছে প্রত্যাশা খুব সরল: পরীক্ষায় ন্যায্যতা, রক্তে নিরাপত্তা, আইনের প্রয়োগে সংযম, শহরে বাসযোগ্যতা, চিকিৎসায় নাগালের সুযোগ এবং অর্থনীতিতে নতুন কর্মক্ষেত্র। সংবিধান ও পররাষ্ট্রনীতির বড় সিদ্ধান্তগুলোও শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনকে ছুঁয়েই সার্থক হয়। বাড়ির ছাদ মেরামতের আগে বাড়িওয়ালা-ভাড়াটের মধ্যে কে বেশি দায়ী, তা নিয়ে সভা বসলে বৃষ্টির কিন্তু ছুটি নেই। রাষ্ট্রের কাজও তেমন সমস্যার দায় নিয়ে আলোচনা হবে, তদন্ত হবে, প্রয়োজন হলে শাস্তিও হবে; কিন্তু পাশাপাশি মেরামতের কাজটি শুরু করতে হবে। দিনের শেষে নাগরিকের দরকার আরেকটি আশ্বাস নয়, অন্তত একটি দৃশ্যমান সমাধান।

লেখক: সাবেক সিনিয়র সচিব।