Dhaka Mail Logo

মতামত

হে আমার দেশ, তুমিই আমার অস্তিত্ব!

ঢাকা মেইল ডেস্ক

০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৪০ পিএম

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভ করার পর থেকে আমরা নিজেদের বাংলাদেশি হিসেবে গর্ব অনুভব করি। এখানে এখনো রাজনৈতিক স্বার্থের বহু দ্বন্দ্ব রয়েছে। স্বাধীনতা আন্দোলনের দাবিদার দল অন্য কাউকে কখনো ক্ষমতায় শরীক করতে রাজি নয়। তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীরা তাদের প্রতিবেশী দেশের স্বার্থ রক্ষাকারী বলে অভিযুক্ত করতে দ্বিধা করে না। কে স্বাধীনতার প্রকৃত ঘোষক, কে নয়, তা এখনও অমীমাংসিত।

জনসংখ্যা যত বৃদ্ধি পাচ্ছে দেশজুড়ে সামাজিক অস্থিরতা তত বাড়ছে। চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলের অধিবাসীরা এখনো নিজেদের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন মনে করেন। তাদের ‘বাংলাদেশি’ হিসেবে অনুভব করানোর চেষ্টা, ওইসব এলাকার উন্নয়নের জন্য বিপুল বিনিয়োগ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা সত্ত্বেও কোথায় যেন কোনো ব্যবধান রয়ে গেছে। সেজন্য তাদের অনেকের মনে হয় তারা চাপের মধ্যে আছেন, শাসিত হচ্ছেন। সবকিছু সত্ত্বেও, মোটের ওপর বাংলাদেশ একটি জাতি হিসেবে ৫৫ বছর অতিক্রম করেছে এবং আমাদের ঐক্য কখনো গুরুতর হুমকির মুখে পড়েনি।

আমি নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করি, ‘কেন আমি একজন বাংলাদেশি?’ নিজেই প্রশ্নটির উত্তর দিই, ‘আমার কোনো পছন্দ ছিল না। আমি একজন বাংলাদেশি হয়েই জন্মেছি। আমার জন্মের আগে আল্লাহ যদি আমার সঙ্গে এ বিষয়ে পরামর্শ করতেন, তাহলে আমি হয়তো এমন একটি দেশ বেছে নিতাম যা আরও সমৃদ্ধ, কম জনাকীর্ণ, যেখানে মানুষের খাদের অভাব নেই, দরিদ্র মানুষ নেই, চিকিৎসাসেবা পেতে কোনো ঝামেলা নেই, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও রাজনৈতিক বিদ্বেষ নেই, একে অন্যকে দেশের শত্রু ভেবে দোষারূপ করার সংস্কৃতি নেই।’

আমি আমার পূর্বপুরুষদের কৃতিত্বের প্রশংসা করি। কৃতিত্ব তাদেরই। আমার ক্ষুদ্র জীবনে আমাকে স্মরণে রাখার জন্য আমি নিজে কোনো অবদান রাখিনি। এটা সত্য, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক নেতারা ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার জন্য যা যা করেছেন, তা দেশকে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারেনি। আমরা আজ যা করছি, তা নিয়ে গর্ব করারও আমার তেমন কারণ নেই। কিন্তু একক নাগরিক হিসেবে আমার মাঝে দেশসেবা করার যতটুকু সামর্থ্য ছিল, আমি তা করেছি, দেশকে ভালোবাসতে এবং ‘বাংলাদেশি’ হিসেবে স্বাতন্ত্র্যের অহঙ্কার বোধ করতে কোনো ঘাটতি রাখিনি।

অনেকে আমাকে প্রশ্ন করেন, ‘আপনি এতদিন যাবত বিদেশে যাচ্ছেন, লম্বা সময় কাটাচ্ছেন, কোনো দেশে স্থায়ী হননি কেন?’ আবারও আমি বলছি, আমার পছন্দের সুযোগ খুব কম। যেসব দেশে আমি থাকতে চাইতে পারি, সেসব দেশ শ্বেতাঙ্গ অধ্যুষিত, এবং অন্য বর্ণের মানুষের প্রতি তাদের পূর্বধারণা রয়েছে। বাংলাদেশে আমি অধিক স্বচ্ছন্দ। এমনকি, যারা আমাকে পছন্দ করেন না, তাদেরও আমার আপন মানুষ বলেই মনে হয়। একজন বিদেশির সঙ্গে আমি ঝগড়া করতে পারব না, কিন্তু একজন বাংলাদেশির সঙ্গে আমি ঝগড়া করে তা মিটিয়ে ফেলে হাত মেলাতে পারব। কোনো না কোনোভাবে আমি তাদের ঘরের বা তাদেরকে আমার ঘরের মানুষ ভাবতে পারি। তাদের পুত্রকন্যা-নাতিনাতনিদের সঙ্গে আমার পুত্রকন্যাদের বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনেও আগ্রহী হতে পারি।

একথাও সত্য যে, আমার দেশের অনেক কিছুই অপছন্দ — বেশিরভাগই রাজনীতি ও সরকার সংশ্লিষ্ট। আমি জানি, সরকার এবং দেশ এক নয়। রাজনীতিবিদরা প্রাথমিকভাবে দেশ ও জনগণের স্বার্থ বিবেচনার চেয়ে নিজেদের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করার কথা ভাবেন, ক্ষমতায় গিয়ে জনগণের জন্য অতীতে কি কি করেছেন, সেসব জাবর কাটেন। বিরোধী দলকে তারা দেশবিরোধী চিহ্নিত করে তাদের ওপর জুলুম-অত্যাচার করেন। তারাও যে জনগণের অংশ, যারা ক্ষমতায় থাকে, তারা তা ভুলে যায়। জনগণের মাঝে বিভেদের প্রাচীর তৈরি করে। গত সাড়ে পাঁচ দশক ধরে এটাই চলছে। হয়তো আরও অনেকদিন এমনই চলবে। তবুও বাংলাদেশই আমার দেশ, আমার জন্মভূমি, মাতৃভূমি। ‘ইনহাস্ত ওয়াতানাম’ - ‘হে আমার দেশ, তুমিই আমার অস্তিত্ব!’ আমি আমার দেশেই মরতে চাই, আমার দেশের নরম মাটিতে মিশে যেতে চাই।

আরও পড়ুন

শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকারের ব্যবচ্ছেদ

বাংলাদেশে হিন্দুর শত্রু কে?

অবশ্যই বিদেশে যেতে এবং কিছুকাল কাটাতে আমার ভালো লাগে। উন্নত দেশে জীবন সহজ, নিরাপদ। কিন্তু শিগগিরই বিদেশে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়ি। কিছুদিন বিদেশে কাটানোর পর দেশে গিয়ে রাজধানী ঢাকায় রাস্তার পাশে মলমূত্র ও আবর্জনার স্তুপ থেকে ছড়ানো দুর্গন্ধ, ভিড়ের মাঝে গায়ে গায়ে চলা মানুষের ঘামের কটু গন্ধ,  দুর্গন্ধযুক্ত ও ময়লা জামা পরিহিত বাঙালির স্বভাবসুলভ উচ্চকণ্ঠের কোলাহলের মাঝে থাকতে এবং আঁখের রস ও আমড়ার বিক্রেতাদের ক্ষণে ক্ষণে উরুসন্ধি বা বগল চুলকানোর দৃশ্য উপভোগ করি। এসব সত্ত্বেও আমার মন কখনও বলে না যে, ‘বিদেশে থাকাই ভালো’। আমার হৃদয় বলে ‘বাংলাদেশে ফিরে যাও’।

প্রতিবার দেশে ফিরে যাওয়ার পর বিমানবন্দর থেকে বাড়ির পথে যেতে যেতে রাস্তার দু’পাশে তাকাই। প্রতিবার নতুন নতুন স্থাপনা গড়ে উঠার দৃশ্য দেখি। কেউ রাস্তার দিকে পিঠ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে-বসে প্রস্রাব করছে অথবা পাশাপাশি বসা বাচ্চারা কথা বলতে বলতে মলত্যাগ করছে — এমন দৃশ্য দেখতেও আমার ভালো লাগে। মনে হয়, আমার চোখ কতকাল এই দৃশ্য দেখার জন্য অধীর ছিল। কত অকৃত্রিম আমার দেশ!

কারও দেশপ্রেম নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুললে কি জবাব হতে পারে, নুসরত ফতেহ আলী তাঁর এক কাওয়ালিতে বলেছেন:

‘কিয়া সবুত দু তুঝে আপনি ওয়াতান পরস্তি কা এ্যয় জালিম,

পানি না হো তো অজু ভি হাম ইসি ওয়াতান কি মিট্টি সে করতে হ্যায়।’

বাংলা অর্থ: ‘ওহে নিপীড়ক, আমার দেশপ্রেমের কি প্রমাণ তোমাকে দেব?

অজুর জন্য পানি না পেলে দেশের মাটি দিয়েই আমি অজু করি।’

লেখক: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী প্রখ্যাত সাংবাদিক