ঢাকা মেইল ডেস্ক
০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪৬ পিএম
হাল জমানায় ছবি শুধু স্মৃতির দলিল নয়; অনেকের কাছে এটি প্রভাব প্রতিপত্তি প্রদর্শন ও প্রতারণার মাধ্যমে অন্যায় সুযোগ সুবিধা অর্জনের অন্যতম মাধ্যম। বিশেষ করে কোনো মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, আলেম, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক কিংবা অন্য কোনো পরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে ছবি থাকলে সেটিকে কেউ কেউ নিজের সামাজিক অবস্থান বা প্রভাবের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করে তৃপ্তি বোধ করে থাকেন। অথচ বাস্তবতা হলো—কারও সঙ্গে একটি ছবি থাকা মানেই তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, ব্যক্তিগত পরিচয়, রাজনৈতিক যোগাযোগ কিংবা কোনো বিষয়ে বিশেষ সুপারিশ প্রদান বা ক্ষমতা থাকার প্রমাণ নয়।
এটি বড় ধরনের সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়, যখন একটি সাধারণ সাক্ষাৎ, অনুষ্ঠান, সৌজন্য সাক্ষাৎ কিংবা ছবি তোলার ঘটনাকে ইচ্ছাকৃতভাবে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যাতে অন্যরা মনে করেন ছবিতে থাকা ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। এর মাধ্যমে তিনি চাকরি, ব্যবসা, ঋণ, জমি-জমা, সরকারি কাজ, মামলা-মোকদ্দমা, নিয়োগ, পদায়ন কিংবা অন্য কোনো সুবিধা আদায় করে দিতে পারবেন। বিনিময়ে বিবিধ খরচের নামে অর্থ বা অন্য কোনও সুবিধা বাগিয়ে নেন। তখন বিষয়টি শুধু নৈতিকতার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না; পরিস্থিতি ও ব্যবহারের ধরন অনুযায়ী তা ধোঁকা ও প্রতারণার পর্যায়ে নিপতিত হয়ে যায়।
একজন পরিচিত বা প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে একই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে ছবি তোলা বর্তমানে খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। কোনো সভা, সেমিনার, সামাজিক অনুষ্ঠান, পুরস্কার প্রদান, সৌজন্য সাক্ষাৎ কিংবা জনসমাগমে অসংখ্য মানুষ একই ব্যক্তির সঙ্গে ছবি তুলতে পারেন। সেই ছবিকে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা নিম্ন রুচির পরিচায়ক এবং ক্ষেত্র বিশেষে বাস্তবতার বিকৃতিও বটে।
ছবির সীমাবদ্ধতা হলো, এটি একটি মুহূর্তকে ধারণ করে, সম্পর্কের পূর্ণ বাস্তবতাকে নয়। একটি ছবিতে দুজন মানুষ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন; কিন্তু সেই ছবি তাদের পারস্পরিক আস্থা, ব্যবসায়িক সম্পর্ক, রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা কিংবা ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাত্রা নির্ধারণ করে না।
তাই কারও সঙ্গে ছবি থাকলে সেটিকে ‘পরিচয়ের স্মৃতি’ হিসেবে রাখা এক বিষয়, আর সেটিকে ‘প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বেআইনি ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
আগে মানুষ পরিচয় দেওয়ার ক্ষেত্রে ভিজিটিং কার্ড, পদবি কিংবা পরিচিত ব্যক্তির নাম ব্যবহার করত। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই সুযোগকে আরও সহজ করেছে। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব কিংবা অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে একটি ছবি মুহূর্তেই শত-সহস্র মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে।
কেউ যদি বলেন, ‘ওই ব্যক্তির সঙ্গে আমার বিশেষ সম্পর্ক আছে’, অথচ বাস্তবে সম্পর্কটি শুধু একটি অনুষ্ঠানে সাক্ষাৎ বা ছবি তোলার মধ্যে সীমাবদ্ধ, তাহলে তিনি অন্য ব্যক্তিকে ভুল ধারণা দিতে পারেন। আরও গুরুতর বিষয় হলো, কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম ও ছবি ব্যবহার করে তাঁর অজ্ঞাতে অন্যের কাছ থেকে অর্থ, ব্যবসায়িক সুবিধা বা ব্যক্তিগত সহযোগিতা নেওয়ার কথাও শোনা যায়।
এ ধরনের আচরণ শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না; যাঁর ছবি ব্যবহার করা হচ্ছে, অনেক সময় তাঁর ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে প্রকৃত পরিচিতি ও সুসম্পর্কের মূল্যও কমে যায়।
এখানে দায়িত্ব শুধু ছবি ব্যবহারকারীর নয়। যাঁরা সামাজিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক বা ব্যবসায়িকভাবে পরিচিত, তাঁদেরও সচেতন থাকা প্রয়োজন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অনেক মানুষের সঙ্গে ছবি তোলা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই ছবি কোথায়, কীভাবে এবং কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে—এ বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি। বিনা প্রয়োজনে ছবি তোলার তেমন কোনও প্রয়োজনও নেই।
বিশেষ করে কারও সঙ্গে প্রকাশিত হলে যদি এমন ধারণার জন্ম নেয় যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কোনো প্রতিষ্ঠান বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত, অথচ বাস্তবে তা নয়-এরূপ ক্ষেত্রে ছবি তোলার অনুমতিই দেয়া উচিৎ নয়।
কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে ছবি তোলা অপরাধ নয়। কিন্তু সেই ছবির মাধ্যমে মিথ্যা প্রভাব সৃষ্টি করা, অন্যায় সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করা কিংবা অন্যকে বিভ্রান্ত করা গর্হিত অপরাধ।
প্রতারণার সুযোগ তৈরি হয় তখনই, যখন মানুষ যাচাই বাছাই না করে শুধু পরিচয়ের প্রদর্শন দেখে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়। ‘অমুকের সঙ্গে ছবি আছে’—এটিকে অনেক সময় যথেষ্ট পরিচয় হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। অথচ কোনো ব্যবসায়িক লেনদেন, আর্থিক সিদ্ধান্ত, চাকরি, নিয়োগ, সরকারি কাজ বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয়ে শুধু ছবি দেখে কাউকে বিশ্বাস করা, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
কেউ কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির পরিচয় দিয়ে সুবিধা চাইলে তাঁর দাবির সত্যতা যাচাই করা উচিত। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে নেয়া উচিত।
আরও পড়ুন
দোষ প্রমাণের আগে অপরাধী বলা গুরুতর অন্যায়
প্রতিষ্ঠান বাড়ানোর পাশাপাশি চাই শিক্ষার মানোন্নয়ন
মানুষের প্রতি মানুষের স্বাভাবিক বিশ্বাস থাকতেই পারে; তবে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বিশ্বাসের পাশাপাশি ঘটনার যাচাই বাছাই করা অতীব জরুরি।
এর সঙ্গে আমাদের সামাজিক মন মানসিকতারও একটি সম্পর্ক রয়েছে। সমাজে অনেক সময় ব্যক্তির যোগ্যতা, সততা ও কর্মের পরিবর্তে তিনি কার সঙ্গে ওঠাবসা করেন—তা দিয়ে তাঁর গুরুত্ব বিচার করা হয়। ফলে কেউ কেউ নিজের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি সংগ্রহ ও প্রচারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
এ প্রবণতা শেষ পর্যন্ত একটি অস্বাস্থ্যকর ও অরুচিকর একটি উদ্ভট সংস্কৃতির গোড়াপত্তন করতে পারে। এতে যোগ্যতার পরিবর্তে ছবি কালচার, প্রভাবশালীদের সাথে সম্পর্ক- ইত্যাদি সামাজিক ও পেশাগত মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কালক্রমে একটি অঘোষিত মানদণ্ডে পরিণত হতে পারে। অথচ একটি সুস্থ সমাজে মানুষের মর্যাদা নির্ধারিত হওয়া উচিত তাঁর সততা, যোগ্যতা, কর্ম ও আচরণের ভিত্তিতে; কারও সঙ্গে তোলা ছবির ভিত্তিতে নয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ছবি প্রকাশ করার আগে একটি সহজ প্রশ্ন করা যেতে পারে—এই ছবিটি কি সত্যকে প্রকাশ করছে, নাকি এমন একটি ধারণা সৃষ্টি করছে যা বাস্তবে সত্য নয়?
ছবির সঙ্গে মিথ্যা পরিচয়, অতিরঞ্জিত সম্পর্ক কিংবা কাল্পনিক ক্ষমতার গল্প যুক্ত হলে সেটি শুধু আত্মপ্রচারের বিষয় থাকে না; অন্যের ওপর প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে আর্থিক লেনদেন বা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে এ ধরনের বিভ্রান্তি বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
তাই ব্যক্তিগত ছবি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সত্যনিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কারও ছবি অনুমতি ছাড়া এমনভাবে ব্যবহার করাও উচিত নয়, যাতে তাঁর সঙ্গে এমন সম্পর্ক বা সমর্থনের ধারণা সৃষ্টি হয় যা বাস্তবে নেই।
সমাজে পারস্পরিক আস্থা ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান বা অর্থনীতি কার্যকরভাবে চলতে পারে না। কিন্তু আস্থা যদি ব্যক্তির প্রকৃত যোগ্যতা ও আচরণের পরিবর্তে ছবি, পদবি ও পরিচিতির প্রদর্শনের ওপর নির্ভর করে, তাহলে সেই আস্থা সহজেই অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে।
প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে ছবি তোলা কোনো সমস্যা নয়। সমস্যা হলো সেই ছবিকে মিথ্যা সম্পর্ক, প্রভাব বা ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা। একইভাবে কোনো পরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে ছবি থাকলেই তাঁকে ঘনিষ্ঠ বা ক্ষমতাবান মনে করাও সমীচীন নয়।
একটি ছবি একটি মুহূর্তের স্মৃতি হতে পারে; কিন্তু সেটিকে সত্যের বিকল্প বানানো সম্পূর্ণ নৈতিকতা পরিপন্থী।
আমাদের সামাজিক ও ডিজিটাল সংস্কৃতিতে তাই একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন—পরিচিতির মর্যাদা থাকবে, প্রভাবশালীদের সঙ্গে সৌজন্য থাকবে, ছবি তোলাও থাকবে; কিন্তু কারও নাম, পদ বা ছবি ব্যবহার করে মানুষকে বিভ্রান্ত করা কিংবা ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার সংস্কৃতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান—উভয়ের স্বার্থেই প্রয়োজন সত্যনিষ্ঠ পরিচয়, যাচাইযোগ্য তথ্য এবং দায়িত্বশীল সামাজিক আচরণ।
এ কথা ভুলে গেলে চলবেনা, শেষ পর্যন্ত মানুষের প্রকৃত পরিচয় কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির পাশে দাঁড়ানো ছবিতে নয়; অন্য কোনো ভাবে বাহাদুরি প্রদর্শনেও নয়, তার প্রকৃত পরিচয় নিজের কর্ম, সততা, যোগ্যতা ও মানুষের প্রতি আচরণেই।
লেখক: অর্থনীতিবিদ, সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তক, ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মী