Dhaka Mail Logo

মতামত

রাষ্ট্রের কণ্ঠ যত উঁচুই হোক, মানুষের স্বস্তিই বড়

২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১১ পিএম

আজ শনিবার অর্থাৎ ঘড়ির অ্যালার্মকে একটু সন্দেহ করার দিন। আর সকালের চায়ের কাপটিকে একটু বেশি গুরুত্ব দেওয়ার দিন। সপ্তাহের অন্য দিনগুলোতে মানুষ খবর পড়ে কাজে যাওয়ার জন্য; শনিবারে খবর পড়ার ফাঁকে কাজকেও একটু অপেক্ষা করানো যায়। কিন্তু পৃথিবী সে সুযোগটি দেয় না।

নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশন চলছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের কথা বলছেন-গণতন্ত্র, পুনর্গঠন, অর্থনীতি, রোহিঙ্গা ও জলবায়ু নিয়ে। রাষ্ট্রের ভাষা বেশ গুরুগম্ভীর; শনিবারের সকাল অবশ্য তাকে একটু হালকা করে শুনতে চায়।

জাতিসংঘের সেই গুরুগম্ভীর মঞ্চেই ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে বাংলাদেশের অবস্থান বেশ স্পষ্ট। স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র এবং জাতিসংঘে তার পূর্ণ সদস্যপদের পক্ষে বাংলাদেশ আবারও জোরালো আহ্বান জানিয়েছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ভাষণ দিতে উঠলে বাংলাদেশসহ বহু দেশের প্রতিনিধির সভাকক্ষ ত্যাগ করার দৃশ্যটিও বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। কূটনীতিতে কখনো কখনো বক্তৃতার চেয়ে খালি চেয়ার বেশি কথা বলে-গতকালের নিউইয়র্ক যেন তারই একটি দৃশ্যপট। সামাজিক মাধ্যমে সেই দৃশ্যের উচ্ছ্বাসও কম নয়; মানুষ প্রতিবাদের ছবি দেখতে পছন্দ করে, বিশেষ করে যখন ছবিতে কোনো লম্বা বক্তৃতা পড়তে হয় না।

কিন্তু জাতিসংঘের চেয়ার ছেড়ে বাংলাদেশের নদীর চরে এলেই পৃথিবীর ভাষা বদলে যায়। মেঘনায় ট্রলারডুবির ঘটনায় চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, একজন এখনো নিখোঁজ। ১৪ জন যাত্রী বিয়ের অনুষ্ঠানে যাচ্ছিলেন কোনো আন্তর্জাতিক সম্মেলনে নয়, একেবারে আমাদের চেনা বাঙালি আনন্দের অনুষ্ঠানে।

নদী অবশ্য নিমন্ত্রণপত্র দেখে পথ বদলায় না। এক পরিবারের জন্য আজকের সকাল তাই ছুটির দিন নয়; উদ্ধারকারী নৌকার প্রতিটি শব্দই তাদের কাছে সংবাদ। বড় রাষ্ট্রের বড় স্বপ্নের পাশে এমন ছোট ছোট ব্যক্তিগত বিপর্যয়ই মনে করিয়ে দেয়-রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনটুকু নিরাপদ রাখা।

সংসারের আরেকটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন বসে বাজারে-সেখানে চেয়ার নেই, মাইক নেই, কিন্তু প্রতিদিনই প্রশ্নোত্তর পর্ব হয়। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার অভিঘাত পরিবহন হয়ে নিত্যপণ্যের বাজারে ঢুকেছে; সবজি, মাছ, ডিম, মুরগি-সবাই যেন নিজের নিজের ভাড়ার কাগজ নিয়ে হাজির। তবে আশার কথাও আছে: সরবরাহ ভালো থাকায় কোথাও কোথাও সবজির দাম নিয়ন্ত্রণে, ইলিশও কিছুটা নেমেছে। অর্থাৎ বাজার এখনো পুরোপুরি রাগ করে বসে নেই। কিন্তু সংসারের হিসাব বড় অদ্ভুত-একটা ইলিশ সস্তা হলেই বাজেটের মুখে হাসি ফুটে না; বাসভাড়া, বাজারভাড়া, রান্নার তেল-সবাইকে একসঙ্গে রাজি করাতে হয়।

সামাজিক মাধ্যম এই দেশের আরেক অদ্ভুত সংসদ। নেতানিয়াহুর ভাষণের সময় ওয়াকআউটের ভিডিও সেখানে প্রতিবাদের প্রতীক হয়েছে, আবার একটি আবেগঘন আর্ম-রেসলিংয়ের ভিডিও মানুষের মন নরম করে দিয়েছে। একটিতে মানুষ বলে, ‘এই অন্যায়ের প্রতিবাদ চাই’; অন্যটিতে বলে, ‘আহা, মানুষ এখনো মানুষ আছে।’ এর মাঝখানে ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদকীয়টির সতর্কবাণীটি মনে রাখা ভালো-জনমনে আতঙ্ক ছড়ানোর বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা দরকার। কারণ ফেসবুকে খবরের গতি এখন এত বেশি যে সত্যটি অনেক সময় জুতা পরার আগেই গন্তব্যে পৌঁছে যায়। তাই ভাইরাল হওয়া আর সত্য হওয়া-এই দুই ভাইকে আলাদা করে চিনতে শেখা জরুরি।

রাষ্ট্রের আরেকটি পরীক্ষার খাতা খুললে পাওয়া যায় হাসপাতাল। প্রথম আলোর সম্পাদকীয়তে সরকারি হাসপাতালের অচল ও অব্যবহৃত মূল্যবান যন্ত্রপাতির যে চিত্র উঠে এসেছে, সেটি নিঃসন্দেহে অস্বস্তিকর। একটি এমআরআই মেশিন কিনে বছরের পর বছর তালাবদ্ধ রাখা উন্নয়ন নয়-এটি উন্নয়নের সঙ্গে রসিকতা। এর বিপরীতে আজ থেকে সারাদেশে ৩৪ লাখ শিশুকে হাম-রুবেলার টিকার আওতায় আনার বিশেষ কর্মসূচি শুরু হচ্ছে। একটি যন্ত্র যেন পড়ে থেকে মরিচা না ধরে, আর একটি শিশুও যেন টিকা থেকে বাদ না পড়ে-রাষ্ট্রের দক্ষতার সংজ্ঞা বোধ হয় এতটুকুই সহজ।

পৃথিবী অবশ্য শনিবার বলে ছুটি নেয়নি। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সাত দিনের একটি পরিকল্পনা দিয়েছে, যার সঙ্গে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রশ্ন জড়িত। এই সরু জলপথ দিয়ে বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের বিশাল অংশ যায়-অতএব হরমুজের ভ্রু কুঁচকালেই দূরের দেশের পেট্রোলপাম্পও একটু চিন্তিত হয়ে পড়ে। আর গাজায় যুদ্ধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে উঠছে আরও অস্বস্তিকর প্রশ্ন: মানুষ যখন যুদ্ধ করার জন্য মেশিনকে আরও বুদ্ধিমান করে তুলছে, তখন মেশিনের সিদ্ধান্তের নৈতিক দায়টি শেষ পর্যন্ত কার? প্রযুক্তি নতুন, প্রশ্নটি কিন্তু বেশ পুরোনো-মানুষের প্রাণের দাম কত?

তাই শনিবারের সকালটিকে খুব গুরুতর করে তোলার দরকার নেই। এক কাপ চা, একটু অলসতা, পত্রিকার পাতা উল্টে দু-একবার মুচকি হাসা-এসবও সভ্যতার সম্পদ। তবে খবরের শেষ পাতাটি বন্ধ করার আগে একটি কথা মনে রাখা যায়: নিউইয়র্কে বাংলাদেশ যে কথাগুলো বলে, তার আসল পরীক্ষা নিউইয়র্কে হয় না; হয় মেঘনার ঘাটে, বাজারের ব্যাগে, হাসপাতালের করিডরে, শিশুর টিকাকেন্দ্রে। বিশ্বমঞ্চে রাষ্ট্রের কণ্ঠ যত উঁচুই হোক, ঘরের মানুষের স্বস্তি যদি তার সঙ্গে তাল না মেলায়, তবে বক্তৃতার মাইক্রোফোন যত দামিই হোক-শব্দটা একটু ফাঁপা শোনায়। শনিবার বলে এইটুকু সত্যও আজ হাসিমুখে বলা যাক।

লেখক: সিনিয়র ব্যুরোক্রেট ও বিশ্লেষক