Dhaka Mail Logo

মতামত

কাজী নজরুলের শতবর্ষী চিঠির নান্দনিকতা

২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:২৬ পিএম

একাদশ পর্ব

নন্দনতত্ব নিয়ে বিশ্বের অনেকেই কাজ করেছেন। তবে মৌলিক কাজ যারা করেছেন, তাদের মধ্যে প্লেটো অন্যতম। তার নন্দনতত্ব ভিন্ন আঙ্গিকের এবং কাজী নজরুলের সৌন্দর্য চেতনার সাথে অনেক অংশে মিলে যায়। প্লেটোর এই সংক্রান্ত তত্ব গুগল থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে পাওয়া যায়- He (Plato) viewed physical beauty as an imperfect reflection of perfect, eternal, and unchanging ‘Forms’ (or Ideas). Consequently, he famously viewed art as a dangerous ‘imitation of an imitation’ that prioritizes illusion over truth. এই মতবাদের অন্তর্নিহিত বিষয় হচ্ছে, বাহ্যিক সৌন্দর্য মূলত একটি বিভ্রম ও অনুকরণের অনুকরণ। অর্থাৎ, বাইরের সৌন্দর্যের চেয়ে অন্তরতম সৌন্দর্য নান্দনিকতাপূর্ণ। প্রকৃতির সব সুন্দরতা পৃথক বৈশিষ্ট্যময়। এখানে অনুকরণের কোনো চিহ্নমাত্র নেই। অর্থাৎ, পার্থিব সৌন্দর্য আর অপার্থিব সৌন্দর্য এক নয়। তবে একে অপরের সাথে অসাধারণভাবে মেলবন্ধিত ও সখ্যপূর্ণ। এমনি একটি নিগূঢ় বিষয় কবি নজরুলের পত্রালাপের এই অংশে দেখা যায়, ‘কবি চায় না দান, কবি চায় অঞ্জলি, কবি চায় প্রীতি, কবি চায় পূজা। কবিত্ব আর দেবত্ব এইখানে এক। কবিতা আর দেবতা-সুন্দরের প্রকাশ। সুন্দরকে স্বীকার করতে হয় সুন্দর যা তাই নিয়ে। রূপার দাম আছে বলেই রূপা অত হীন। হাটে-বাজারে মুদির কাছে, বেনের কাছে ওজন হতে হতে এর প্রাণান্ত ঘটল; রূপের দাম নেই বলেই রূপ এত দুর্মূল্য, রূপ এত সুন্দর, এত পূজার। রূপা কিনতে হয় রূপেয়া দিয়ে, রূপ কিনতে হয় হৃদয় দিয়ে। রূপের হাটের বেচা-কেনা অদ্ভুত। যে যত বিনা দামে কিনে নিতে পারে, সে তত বড় রূপ-রসিক সেখানে।’

কাজী নজরুলের এই বক্তব্যে প্লেটোনিক সৌন্দর্যবাদের ছায়া লক্ষ্য করা যায়। কাজী নজরুলের কাছে, সৌন্দর্য মানে সত্য, সৃষ্টি ও আত্মমুক্তি। তাই কবির লেখাতে আত্মপ্রকাশের দর্শন পুনঃপুন ফুটে উঠেছে। পত্রে কনিষ্ঠ ভগ্নিতুল্য নাহারকে তিনি বারবার কাব্য-সাহিত্য লিখতে উৎসাহ দেন। কারণ, সৃষ্টিশীলতা চিরকাল মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি। ফুল যেমন সময় এলে নিজে থেকেই ফোটে, তেমনি প্রতিভাও সঠিক পরিবেশে বিকশিত হয়। প্রকৃতি ও মানুষের জীবনের বন্ধন এই চিঠির সাংঘাতিক উল্লেখযোগ্য দিক। এটি অনাবিল সুন্দর। কারণ, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের আত্মীয়তা অত্যন্ত  গভীর। হৃদ্যতাপূর্ণ। এবং শান্ত-শীতল ও সুশৃঙ্খল সুনিবিড়। নজরুল প্রকৃতিকে শুধু উপমা হিসেবে ব্যবহার করেননি; তিনি প্রকৃতিকে মানুষের জীবনের প্রতিরূপ করেছেন। প্রকৃতির ফল-ফুল, তরুলতাকে যেমন তিনি জীবন ঘনিষ্ট করে তুলেছেন তেমনি তিনি বনের পাখিকেও মানুষের মনের পাখিতে পরিণত করেছেন। কোকিল, পাপিয়া, বনের পাখি এসবই কবির স্বপ্রতীক। পাখি যেমন মুক্ত, তেমনি কবিও মুক্ত। ফুল সৌন্দর্য, সৃষ্টি ও মুক্ত-স্বাধীন হৃদয়ের প্রতীক।

কবি বলেন, ‘গানের পাখি গান গায় খাবার পেয়ে নয়; ফুল পেয়ে আলো পেয়ে সে গান গেয়ে ওঠে। মুকুল-আসা কুসুম-ফোটা বসন্তই পাখিকে গান-গাওয়ায়, ফল-পাকা জ্যৈষ্ঠ আষাঢ় নয়। তখনো পাখি হয়তো গায়, কিন্তু ফুল যে সে ফুটতে দেখেছিল, গন্ধ সে তার পেয়েছিল-গায় সে সেই আনন্দে, ফল পাকার লোলুপতায় নয়। ফুল ফুটলে পায় গান, কিন্তু ফল পাকলে পায় খিদে; আমি পরিচয় করার অনন্ত ঔৎসুক্য নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি মানুষের মাঝে, কিন্তু ফুল-ফোটা মন মেলে না ভাই, মেলে শুধু ফল-পাকার ক্ষুধাতুর মন। তোমাদের মধ্যে সেই ফুল-ফোটানো বসন্ত, গান-জাগানো আলো দেখেছি বলেই আমার এত আনন্দ, এত প্রকাশের ব্যাকুলতা।’ অর্থাৎ, সৌন্দর্যই কবিকে সৃষ্টিশীল করে। সুন্দরের কবি করে তোলে।

এই চিঠিতে নদী, মানুষের জীবনের প্রতিরূপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। নদীর গন্তব্য সমুদ্র। আর মানুষের গন্তব্যও বৃহত্তর সত্য ও সুন্দরের রাস্তায়। সমুদ্র কবির কাছে, অসীমতা, গভীরতা ও মানবমনের প্রতীক। তাই কবি বলেন, ‘মানুষের মন সমুদ্রের চেয়েও বিপুলতর।’ অপরদিকে প্রকৃতির শান্ত-শীতল অপরূপ শিশির বিন্দু কবির রচনায় করুণা, কোমলতা ও নির্মলতার প্রতীক। আর বসন্ত মানে, নবজাগরণ, সৃজন, প্রেম, যৌবন। তিনি সৃষ্টিশীল অবগুণ্ঠিত নাহারদের মধ্যে ‘ফুল-ফোটানো বসন্ত’ দেখেছেন।

ব্যক্তিগত, সামাজিক ও প্রাকৃতিক, সবদিক বিবেচনায় এই পত্রটি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সুন্দর রোমান্টিক গদ্যরচনা। তবে এটি ব্যক্তিগত প্রেমের রোমান্টিকতা নয়; এটি সৌন্দর্যের প্রেম, মানুষের প্রেম, সৃষ্টির প্রেম, ও আত্মার প্রেম। এখানে কবির অতিকল্পনা লক্ষ্য করা যায়। যেমন: তিনি নিজেকে কখনও বলেন, ভগীরথ, রাজকুমার, আবার কখনো বনের পাখি। যদিও সাহিত্যে এসব দোষণীয় নয়। কাজী নজরুলের প্রকৃতিপ্রীতি সহজাত ধর্ম। রোমান্টিক সাহিত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্যও প্রকৃতির প্রতি আকর্ষণ। এই চিঠিতে, ফুল, পাখি, নদী, সমুদ্র, বসন্ত, শিশির বারবার ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে ফিরে এসেছে। প্রত্যেক ক্ষেত্রে ভিন্নতর ব্যঞ্জনা নিয়ে।

চিঠির ছত্রে ছত্রে নজরুলের চিরন্তন রোমান্টিক কবিসত্বা প্রস্ফুটিত হয়েছে। তবে এই রোমান্টিকতা কোন পার্থিব কামনার নয়, এটি অলৌকিক ও নান্দনিক। কবি নিজেকে রূপকথার সেই রাজপুত্রের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যিনি সোনার কাঠি ছুঁইয়ে সাত সমুদ্র তেরো নদীর পারের বন্দিনী অপরূপা রাজকন্যাকে মায়ানিদ্রা থেকে জাগিয়ে তোলেন। ঠিক একইভাবে নারীর ভেতরের অবদমিত প্রতিভা ও কান্নাকে মুক্ত করাই কবির কাজ। কবি তার ব্যক্তিসত্বাকে সূর্যের সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, কাছে এলে তা দাহ (পোড়ায়) দেয়, কিন্তু দূর থেকে দেয় আলো। তিনি চাঁদের জোছনা, ফুলের গন্ধ আর বাঁশির সুরের মতো নৈর্ব্যক্তিক হতে চেয়েছেন। তৎকালীন মুসলিম সমাজের অবরোধ প্রথা ও রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে নারীদের ‘বিদ্রোহিনী’ হতে আহ্বান জানানোও কবির রোমান্টিক বিপ্লবী চেতনারই অংশ। তাই এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, এই পত্রটির বিশেষ দিক হলো চিরয়াত সমাজ কল্যাণকর প্রগতিশীলতা। বার বার কবি নারীশিক্ষা ও নারীমুক্তির কথা বলেছেন। নারীরা ভাগ্যবিড়ম্বিত এমন মনোভাব প্রকাশিত হয়েছে। তাই এখানে নজরুলের প্রগতিশীল মনোভাব স্পষ্ট।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের মেয়েরা বড় হতভাগিনী। কত মেয়েকে দেখলাম কত প্রতিভা নিয়ে জন্মাতে, কিন্তু সব সম্ভাবনা তাদের শুকিয়ে গেল সমাজের প্রয়োজনের দাবিতে। ঘরের প্রয়োজন তাদের বন্দিনী করে রেখেছে। এত বিপুল বাহির যাদের চায়, তাদের ঘিরে রেখেছে বারো হাত লম্বা আটহাত চওড়া দেওয়াল। বাহিরের আঘাত এ দেওয়ালে বারেবারে প্রতিহত হয়ে ফিরল। এর বুঝি ভাঙন নেই অন্তর হতে মার না খেলে। তাই নারীদের বিদ্রোহিনী হতে বলি। তারা ভেতর হতে দ্বার চেপে ধরে বলছে আমরা বন্দিনী। দ্বার খোলার দুঃসাহসিকা আজ কোথায়? তাকেই চাইছেন যুগদেবতা। দ্বার ভাঙার পুরুষতার নারীদের প্রয়োজন নেই, কারণ তাদের দ্বার ভিতর হতে বন্ধ, বাহির হতে নয়। তোমারও যে কী হবে বলতে পারিনে। তার কারণ তোমায় চিনলেই তো চলবে না, তোমায় চালাবার দাবি নিয়ে জন্মেছেন যাঁরা তাঁদের আজো চিনিনি।’

কবি মনে করেন, নারীরা নিজেরাই নিজেদের মুক্ত করবে। এটি তার নারী-জাগরণ ভাবনার অসাধারণ প্রেরণাদায়ক অভিব্যক্তি। কবি আক্ষেপ করে বলেন, ‘কত মেয়েকে দেখলাম কত প্রতিভা নিয়ে জন্মাতে, কিন্তু সব সম্ভাবনা তাদের শুকিয়ে গেল সমাজের প্রয়োজনের দাবিতে। ঘরের প্রয়োজন তাদের বন্দিনী করে রেখেছে।’

অলংকার

এই চিঠিটি অলংকারে ভরপুর। একেবারে ঠাসা বলা যায়। এই পত্রের পরতে পরতে, উপমা, রূপক, অনুপ্রাস, প্রতীক ও নান্দনিকতা পুষ্পসজ্জার মতো বিছিয়ে আছে। উপমা: ‘মানুষের মন সমুদ্রের চেয়েও বিপুলতর।’ ‘গানের পাখি যারা, তারা নিরুদ্দেশ দেশের পথিক।’ রূপক: পাখি = কবি, ফুল = সৌন্দর্য, নদী = জীবন, সমুদ্র = চিরসত্য ও মহাজাগতিক সত্য। মানবায়ন; ‘ফুল হাসে’। ‘আলো গান গাওয়ায়’ এখানে জড়বস্তুকে মানবীয় গুণ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও অর্থ বা টাকা পয়সাকে কবি বলেছেন ‘লক্ষ্মীর ঝাঁপির কড়ি’ বা ‘রূপার কমল’, আর শিল্পকে বলেছেন ‘সরস্বতীর শতদল’। ‘রূপা কিনতে হয় রূপেয়া দিয়ে, রূপ কিনতে হয় হৃদয় দিয়ে।’ এখানে রূপা ও রূপের মধ্যকার বৈপরীত্য শব্দের চমৎকার ব্যবহারে ফুটে উঠেছে।

অনুপ্রাস: গদ্যের মধ্যেও কবি ছন্দের দোলা এনেছেন: ‘দেশে বিদেশে, বসন্ত-আসা বনে, ফুল-ফোটা কাননে, গন্ধ-উদাস চমনে।’ কিংবা ‘মুকুল-আসা কুসুম-ফোটা বসন্তই পাখিকে গান-গাওয়ায়...’ ‘ফুল-ফোটা বসন্ত’ [ফ, ফ] ‘গান-জাগানো আলো’ [গ, ন,] ‘গন্ধ-উদাস চমন’ [ন,ন, ধ, দ] প্রভৃতি বর্ণের অনুরণনে বা কাননে-চমনে ব্যবহারে ধ্বনিসৌন্দর্য সৃষ্টি হয়েছে।

অপরদিকে এই পত্রে প্রতীকের মাধ্যমে অনেক অনুক্ত কথা ও বাণী পাঠক সমীপে সঞচরণশীল। যেমন: ফুল= সৌন্দর্য, সৃষ্টি, পাখি= স্বাধীনতা, শিল্পী, বসন্ত= নবজাগরণ, শিশির= করুণা, নদী= জীবন, সমুদ্র= অসীমতা, আলো= জ্ঞান, অঞ্জলি =শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার প্রতীক। এই অলংকারের বিস্তৃত ব্যবহারে এই পত্রটি নান্দনিকতাপূর্ণ। এই চিঠির সবচেয়ে বড় শক্তি এই যে, এটি নান্দনিক গদ্য। এখানে, গদ্য কবিতার মতো, দর্শন সংগীতের মতো,  উপদেশ স্নেহের মতো, এবং আবেগ শিল্পের মতো। বিশেষ করে, ‘রূপা কিনতে হয় রূপেয়া [রূপিয়া] দিয়ে, রূপ কিনতে হয় হৃদয় দিয়ে।’ অথবা, ‘কবি চায় না দান, কবি চায় অঞ্জলি।’ এই ধরনের বাক্যগুলো বাংলা গদ্যের ইতিহাসে সর্বকালে সৌন্দর্যের অনন্য উদাহরণ। এছাড়াও

ব্যঙ্গ ও কৌতুক (Wit & Humor): স্ত্রীদের প্রতি স্বামীদের চিরন্তন বাধ্যতা বোঝাতে রসাত্মকভাবে ‘বেচারাম লাহিড়ী’ শব্দের ব্যবহার কিংবা চিঠি লেখার সময় বইয়ের ওপর কালি ফেলার কারণে ‘ভাবীর বকুনি’র উল্লেখ চিঠির গাম্ভীর্যের মাঝে এক টুকরো সহজ-সরল জীবনের আলো এনে দেয়। পুরো চিঠিটি বাস্তবিক অর্থেই কবির অন্তর্জগতের-ই সার্থক প্রকাশ। চিঠিতে নজরুলের গভীর জীবনদর্শন ও সৃষ্টিতত্ত্বের (Philosophy of Creation) এক অপূর্ব উন্মোচন ঘটেছে:

# রক্তের সম্বন্ধ বনাম হৃদয়ের সম্বন্ধ: কবি এক শাশ্বত সত্যের অবতারণা করেছেন, ‘রক্তের সম্বন্ধকে অস্বীকার করতে দ্বিধা নেই যার, সে-ই কখন পথের সম্বন্ধকে সকল হৃদয় দিয়ে অসঙ্কোচে স্বীকার করে নেয়।’ ঘরের টান যেখানে কর্তব্যের, বাইরের টান সেখানে প্রীতির ও মাধুর্যের।

# উপযোগবাদ বনাম সৌন্দর্যবাদ: সমাজ ‘ফল-পাকা’ জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ়ের মতো ফলপ্রসূ বা উপযোগবাদী মন খোঁজে, যা ক্ষিদে মেটায়। কিন্তু কবি খোঁজেন ‘ফুল-ফোটা মন’, যা কোন স্বার্থ ছাড়াই সুন্দরের আনন্দে বিকশিত হয়।

# ধরা পড়া বনাম ধরা দেওয়া: কবি পরাধীনতার শৃঙ্খলে বা রাজনৈতিক ফাঁদে ‘ধরা পড়া’ এবং স্বেচ্ছায় সুন্দরের কাছে বা কর্তব্যের তাগিদে ‘ধরা দেওয়া’র মধ্যে পার্থক্য দেখিয়েছেন।

# সৃষ্টির পনেরো আনা ও এক আনা তত্ত্ব: কবির দার্শনিকতার একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে সৃষ্টির অনুপাত। তিনি পলিটিক্স, বক্তৃতা বা সামাজিক কাজে তার জীবনের মাত্র ‘এক আনা’ ব্যয় করেন, আর বাকি ‘পনেরো আনা’ ঢেলে দেন স্বপ্ন, সৃষ্টি এবং সুন্দরের অন্বেষণে। নদী যেমন দু’ধারের গ্রামকে এক আনা জল দেয়, কিন্তু তার মূল লক্ষ্য পনেরো আনা জল নিয়ে সমুদ্রে মেলানো, কবির জীবনও তেমনি।

প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের জীবনের বন্ধন (Relation between Nature and Human Life): নজরুল মানুষের মনস্তত্ত্ব ও শিল্পীর জীবনকে প্রকৃতির নানা উপাদানের সাথে রূপক আকারে বেঁধেছেন:

# গানের পাখি ও নীড়: কবি নিজেকে ও সমমনা শিল্পীদের ‘গানের পাখি’ (কোকিল, বৌ কথা কও, চোখ গেল) হিসেবে তুলনা করেছেন। এরা চিরকাল নিরুদ্দেশ দেশের পথিক, এরা নীড় বাঁধে না। ধূলার পৃথিবীতে এদের পা নেই, এরা কেবল স্বর্গের প্রতিধ্বনি করে।

# সমুদ্র বনাম পুকুর: মানুষের মনকে কবি তুলনা করেছেন সমুদ্রের সাথে, যেখানে অহোরাত্রি জোয়ার-ভাটা খেলে। পক্ষান্তরে, সংকীর্ণ ও সামাজিক নিয়মাবদ্ধ জীবন হলো শান-বাঁধানো পুকুর বা ডোবা, যেখানে কাপড় কাঁচা বা ডুবে মরা চলে, কিন্তু কোন তরঙ্গের দোলা বা জোয়ার-ভাটা খেলে না, কোন জাহাজ চলে না।

# বসন্তের আগমন: কবি তরুণ ভাই-বোনের মনের বিকাশকে বসন্তের আলো এবং শিশিরের পরশের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যা মনের কুঁড়িকে বিকশিত করে।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, বেগম শামসুন্নাহার মাহমুদকে লেখা কাজী নজরুল ইসলামের এই চিঠিটি একাধারে একটি সাহিত্যিক পত্র, সুন্দরের ইশতেহার এবং একজন খাঁটি শিল্পীর আত্মকাহন। এটি প্রমাণ করে যে, নজরুল যেমন সাম্য ও বিদ্রোহের কবি ছিলেন; তেমনি সুন্দরের আরাধনায়, আধ্যাত্মিক ও মনস্তাত্ত্বিক দর্শনে এবং ভাষার ঐশ্বর্যে তিনি ছিলেন সমসাময়িক কালের অনন্য রূপকার। কারণ এই পত্রে নজরুল কেবল নাহারকে উত্তর দেননি; তিনি তার সমগ্র জীবনদর্শন ব্যক্ত করেছেন। এখানে শিল্পীর স্বাধীনতা, সৌন্দর্যের সাধনা, মানুষের হৃদয়ের বন্ধন, প্রকৃতির সংগে আত্মিক সম্পর্ক, নারীমুক্তির আহ্বান এবং সৃষ্টিশীলতার দর্শন একসূত্রে গাঁথা। পত্রপাঠে এটি উপলব্ধিযোগ্য যে, এটি কোন সাধারণ পত্র নয়; বরং সত্য-সুন্দর পুজারী কবির আত্মার স্বগতোক্তি।

লেখক: শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত গীতিকার ও নজরুল গবেষক।